কিন্তু—
কিন্তু কি নূরী?
তোমার মনিরাকে ছাড়তে পারবে?
অস্কুট ধ্বনি করে উঠল বনহুর মনিরা–ধীরে ধীরে আনমনা হয়ে গেল বনহুর। উদাসভাবে তাকাল দূরে–অনেক দূরে, মন্দিনা নদীর অপর পারে।
নূরীর মুখমণ্ডল বিষণ্ণ মলিন হয়ে ছিল। বুকের মধ্যে কে যেন. তপ্ত লৌহ শলাকা দিয়ে আঘাত করল।
কখন যে নূরী বনহুরের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে চলে এসেছে খেয়াল নেই। ঘুমন্ত মনিকে বুকে চেপে চোখের পানিতে বালিশ সিক্ত করে ফেলেছে। সব ব্যথা ছাপিয়ে মনে পড়ছে নূরীর একটা কথা–বনহুরকে সে কোনদিন ফিরে পাবে না।
মনিরা তার মন চুরি করে নিয়েছে।
০৯.
নকিব একখানা কাগজের টুকরা এনে মনিরার হাতে দিল–আপা মনি একজন বুড়ো মানুষ আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
বুড়ো মানুষ? মনিরা ভাজকরা কাগজখানা খুলতে খুলতে বলে।
তারপর কাগজখানায় দৃষ্টি ফেলতেই চমকে উঠে,লেখা রয়েছে শুধু মাত্র দু’লাইন—বৌ রাণী, কথা আছে।
মরিয়ম বেগম পাশে বসে একটা বই পড়ছিলেন। চশমার ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন–কে মা? কি লিখেছে?
মনিরা উঠে কাপড় ঠিক করতে করতে বললআগে নয় এসে বলব। দ্রুত চলে গেল মনিরা নিচে।
হলঘরে উদ্বিগ্নভাবে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ।
মনিরা প্রথমে চমকে উঠল–পরে নিজের মনে খেয়াল করে নিল রহমানের চেহারাটা।
মনিরাকে দেখে এগিয়ে এলো রহমান–বৌরাণী।
রহমান খবর কি? ও কেমন আছে?
নতমুখে জবাব দিল–সেই খবর নিয়েই এসেছি।
উৎকণ্ঠাভরা গলায় বলল মনিরা শিগগির বল কি খবর রহমান?
রহমানের চোখ অশ্রু ছলছল করছে–ধরা গলায় বলল—
সর্দার আজ কদিন হলো নিরুদ্দেশ হয়েছেন।
নিরুদ্দেশ হয়েছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে মনিরা। তারপর পুনরায় বলে ওঠে–কোথায়? কবে? কি করে?
আমরা কিছুই জানি না বৌরাণী। একদিন ভোরে আমরা সর্দারের কক্ষে প্রবেশ করে দেখি তিনি নেই—বিছানা শূন্য।
তোমাদের না বলে কোথায় গেল?
তিনি যেখানেই যান আমাকে না বলে কোথাও যান না। তা ছাড়া সর্দার নিরস্ত্রভাবে কোথাও যাবেন না, এটা আমরা জানি।
তার মানে?
সর্দার তার কোন অস্ত্রই সঙ্গে নিয়ে যাননি। এমনকি তার রিভলবার খানাও টেবিলে যেমন রেখেছেন, তেমনি আছে।
এ তুমি কি বলছ রহমান!
হাঁ, বৌরাণী, আমরা সবাই বড়ই চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। সর্দার কোনদিন আমাদের না জানিয়ে কোথাও যান না। আর গেলেও নিরস্ত্রভাবে যান না–
তবে কি হলো রহমান?
কেমন করে বলব বৌরাণী। আজ কদিন তার প্রতীক্ষায় অপেক্ষা করে তবে এসেছি আপনাকে কথাটা জানাতে।
এ তুমি কি সংবাদ আনলে রহমান! একটু থেমে বলল মনিরা আর তোমরা সবাই চুপ করে বসে আছো?
রহমান গম্ভীর কণ্ঠে বলল—না, আমরা চুপ করে বসে নেই বৌরাণী, আমাদের বিভিন্ন দল দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি নিজেও বহু জায়গায় সন্ধান নিয়েছি, এমনকি পুলিশ অফিসেও খোঁজ নিয়ে জেনেছি সর্দার কোথাও বন্দী হয়েছেন কিনা। আজ তাহলে চলি। আবার ঝিন্দে যাব। যদি সেখানে কোন কারণে গিয়ে থাকেন।
আচ্ছা যাও। হতাশভরা কণ্ঠে রহমানকে বিদায় জানাল মনিরা। রহমান চলে গেল। মনিরা ফিরে এলো বিষণ্ণ মলিন মুখে।
মরিয়ম বেগম মনিরাকে বিষণ্ণ মুখে ফিরে আসতে দেখে চিন্তিত হলেন, বললেন—কে এসেছিল মা মনিরা?
মনিরা মামীমার পাশে এসে বসল, বলল–রহমান।
রহমান! সে আবার কে?
তোমার ছেলের সহকারী।
মনিরের সহকারী? কি সংবাদ ওর? আমার মনির তো ভাল আছে?
সেই সংবাদই তো নিয়ে এসেছে সে।
কি সংবাদ ব মা, দেরী করিসনে।
তোমার ছেলে নিরুদ্দেশ হয়েছে। তাকে ক’দিন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
আর্তনাদ করে উঠলেন মরিয়ম বেগম–আমার মনিরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
না।
এ তুই কি বলছিস মনিরা?
হাঁ মামীমা, আজ ক’দিন নাকি তার কোন সন্ধান নেই।
মরিয়ম বেগম ললাটে করাঘাত করলেন–হায়, একি হলো। আমি এই রকম একটা ভয়ই করছিলাম। কি হবে মা এবার?
মনিরার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রুধারা। সত্যিই তার যদি কিছু হয় বা হয়ে থাকে, তাহলে মনিরা, বাঁচবে কাকে নিয়ে। কার পথের দিকে তাকিয়ে প্রহর গুণবে।
মনিরা ছুটে গেল নিজের ঘরে। তার আর শিশু বনহুরের ফটোখানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ফটোখানা খুলে নিয়ে চেপে ধরল বুকের মধ্যে, আপন মনেই বলে উঠল–তুমি কোথায়? ওগো তুমি কোথায়? আমার জীবনের একমাত্র প্রদীপ তুমি। আমার জীবনের একমাত্র সম্বল।
কেঁদে কেঁদে মনিরার দু’চোখ রাঙা হয়ে উঠল।
চৌধুরী বাড়িতে নেমে এলো এক দুর্যোগময় ঘটনা। বাড়ির সরকার আর নকিব ছাড়া কেউ জানল না এ বাড়িতে কি ঘটেছে, যার জন্য, মরিয়ম বেগম এবং মনিরার অশ্রু শুকাচ্ছে না।
কেঁদে কেটে আকুল হলেন মরিয়ম বেগম, কিন্তু কোন উপায় নেই যাতে তার সন্তানের খোঁজ পাবেন।
সরকার সাহেব অনেক সান্ত্বনা দিতে লাগলেন কিন্তু কিছুতেই প্রবোধ মানলেন না মরিয়ম বেগম।
মনিরার মনের অবস্থাও তাই।
চৌধুরী বাড়িতে যখন বনহুরকে নিয়ে চিন্তার অবধি নেই, তখন বনহুর ভীম সেনের দলে শ্রেষ্ঠ আসন দখল করে বসেছে।
ভীম সেন সব সময় বনহুরকে নিজের পাশে রেখে কাজ করে। তারই পরামর্শে চলে।
রঘুর হিংসা দিন দিন বেড়ে চলল। যাকে বন্দী করে নিয়ে আসা হলো সে এখন সর্দারের সহকারী। গোপনে সে নিজের দল গঠনে লেগে পড়ল এবং সুযোগ খুঁজতে লাগল কেমন করে বনহুরকে হত্যা করবে।
