বনহুর গভীর আবেগে নূরীকে টেনে নিল বুকে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললনূরী, তুমি এখানে কি করে এলে?
নূরী সে কথার জবাব না দিয়ে বলল—হুর, তুমি আমাকে হত্যা কর! হত্যা কর হুর। আমিই তোমার এ অবস্থার জন্য দায়ী।
নূরী!
হাঁ হুর, আমিই সেদিন কান্দাই বনে বাঁশী বাজিয়ে তোমাকে ঘর থেকে বনে নিয়ে এসেছিলাম। ভীম সেন ডাকাতের দ্বারা তোমাকে বন্দী করিয়েছি।
নূরী!
হুর, তোমাকে নির্মম শাস্তি দিতে আমিই ডাকাতদলকে বাধ্য করেছি।
বেশ, এতেই যদি তোমার শান্তি হয়, আমি তোমার সে দান মাথা পেতে নেব।
হুর! নূরী আবার লুটিয়ে পড়ল বনহুরের বুকে, আমাকে তুমি মাফ কর হুর, আমাকে তুমি মাফ কর।
বনহুর পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নূরী কেঁদে কেঁদে এক সময় শান্ত হল। বলল নূরী হুর, চলে যাও তুমি, এই মুহূর্তে চলে যাও হুর।
গম্ভীর কণ্ঠে বলল বনহুর–আর তুমি? আমি আর ফিরে যাব না।
নূরী, জানি না কেন তুমি আমার প্রতি এত অবিচার কর? কেন তুমি সেদিন বজরা থেকে অমন চুপ করে পালিয়ে গিয়েছিলে? আমাকে ব্যথা দিয়ে তুমি কি শান্তি পাও নূরী?
হাঁ, তুমি ঠিক বলেছে হুর। তোমাকে ব্যথা দিয়ে আমি আনন্দ পাই। নূরী! হুর, তুমি চলে যাও। চলে যাও!
না, তোমাকে না নিয়ে আমি কিছুতেই যাব না।
কিন্তু—
কিন্তু কি?
ভীম সেন ডাকু আমাকে নিজ কন্যার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাকে আমি ধোকা দিতে পারি না।
আর আমাকে তো তুমি ধোকা দিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছিলে নূরী? কেন আমি কি তোমায় একটুও ভালবাসি না।
হুর।
বল নূরী?
এই মুহূর্তে তুমি চলে যাও।
আর তুমি?
আমি মনিকে নিয়ে এখানেই কাটিয়ে দেব।
মনি! তোমার মনি বেঁচে আছে নূরী?
হাঁ, সে এখন অনেক বড় হয়েছে। কথা বলতে শিখেছে।
নূরী আমি তোমাকে একা ফেলে যাব না।
তুমি আমার জন্য ভেবো না হুর, আমি এখানেই ভাল থাকব।
আবার যদি আমাকে বন্দী করে নিয়ে আস?
তোমাকে বন্দী করে রেখেছি আমার মনের সিংহাসনে। তোমার বাহ্যিক দেহটার কোন প্রয়োজন নেই আমার।
নূরী! গভীর আবেগে নূরীকে টেনে নেয় বনহুর।
না, তুমি যাও, তুমি যাও।
আমি যাব না।
সেকি!
হাঁ, তোমাকে রেখে আমি যেতে পারব না। যেতে পারব না নূরী—
নূরী নিজেকে হারিয়ে ফেলে বনহুরের মধ্যে।
০৮.
বনহুর ভীম সেনের হাত ধরে শপথ করে আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না।
খুশি হয় ভীম সেন।
দস্যু বনহুরকে বশীভূত করা কম কথা নয়। ভীম সেন বনহুরের শিকল নিজ হাতে খুলে দেয়।
বনহুর আর ভীম সেন বুকে বুক মিলিয়ে একতাবদ্ধ হয়।
রঘু কিন্তু এ মিলনে খুশি হতে পারল না কেমন একটা হিংসা তার মনে জট পাকাতে লাগল। ভীম সেনের প্রিয় এবং বলিষ্ঠ জন ছিল রঘু। বয়স রঘুর খুব বেশি নয়, বনহুরের চেয়ে দু’এক বছরের বেশি হবে।
বনহুর এমন বেশে স্বচ্ছভাবে ভীম সেনের দলের সঙ্গে মিশে গেছে। ভীম সেন তাকে নিজের দলের একটা শ্রেষ্ঠ আসন ছেড়ে দিয়েছে। রঘুর এটাও একটি ঈর্ষার কারণ হলো।
বনহুর দেখল শক্তি এদের কম নেই। কিন্তু বুদ্ধির অভাব যথেষ্ট।
একদিন বনহুর ভীম সেনের দলের সঙ্গে জলপথে যাত্রা করল।
উদ্দেশ্য—কোন বজরা বা নৌকা লুট করা।
বনহুর কিন্তু ভীম সেনকে বলল–তার চেয়ে চল কোন ধনীর বাড়ি হানা দিয়ে মোটা সোনাদানা নিয়ে আসি। নৌকা বা বজরার যাত্রীদের কাছে কতই বা পাওয়া যাবে!
বনহুরের কথামত এক গ্রামে ধনবান এক মহাজনের বাড়িতে হানা দিয়ে তারা বহু অর্থ আর অলঙ্কার নিয়ে ফিরে এলো। ভীম সেন জীবনে এত অর্থ ও অলংকার এক সঙ্গে কোনদিন লুট করে আনতে সক্ষম হয়নি। আজ ভীম সেনের আনন্দ আর ধরে না।
আস্তানায় একটা উৎসবের আয়োজন করল ভীম সেন।
অনেক ছোরা, তরবারি, লাঠি খেলা দেখাল। পুরুষরা নাচও দেখাল অনেকে।
এখানে যখন ভীম সেনের দল আনন্দে মাতোয়ারা। তখন বনহুর ধীরে ধীরে সরে পড়ল সেখান থেকে। নূরীর সন্ধানে চারদিকে তাকাল।
নূরী আজ উৎসবের স্থানে নেই। ঘন বনের মধ্যে একটা পাহাড়িয়া নদী, নাম তার মন্দিনা–নূরী মন্দিনার তীরে একটা পা ঝুলিয়ে বসেছিল। জ্যোস্নাভরা আকাশ, রাত কিন্তু বেশ হয়েছে। মনি ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ।
সেদিনের পর থেকে নূরী আর বনহুরের সামনে যায়নি। রাগ না অভিমান, না অন্য কিছু—এ সে নিজেই জানে না। যতদূর সম্ভব নূরী বনহুরকে এড়িয়ে চলে। কোন সময় বনহুরকে সে দেখা দেয় না।
নূরীর এই পালিয়ে বেড়ান বনহুরের কাছে অসহ্য লাগে। এত লোকের মধ্যে থেকেও নিজেকে সে বড় একা বোধ করে। কিসের জন্য যদি না নূরীর ইংগিত থাকত এর পেছনে।
নূরীর পাশে এসে বনহুর দাঁড়াল।
নূরী তন্ময় হয়ে কিছু ভাবছিল। বনহুরের পদশব্দে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠে বলে–তুমি!
বনহুর ওর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে পড়ল–আর এখানে তুমিও বা কেন?
হুর, আমি চাই না তুমি ভীম সেনের সঙ্গে যোগ দিয়ে দস্যুতা কর।
এতে তোমার অমত কেন নূরী? বনহুর নূরীর চিবুকটা তুলে ধরে দক্ষিণ হাতে–আজ ক’দিন তোমাকে দেখিনি।
আমি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে চাই।
সে কারণেই তুমি সরে এসেছিলে বুঝি?
হাঁ।
কিন্তু আমি যদি তোমাকে–
নূরী বনহুরের মুখে হাতচাপা দেয় –চুপ কর।
নূরী নিজেকে কিছুতেই বনহুরের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে নিতে পারল না।
আকাশে চাঁদ হাসছে।
বনহুরের বাহুবন্ধনে নূরী। মৃদুমন্দ বাতাস দোলা দিয়ে যাচ্ছে নূরীর কুঞ্চিত কেশগুচ্ছতে। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ছে নূরীর চোখে মুখে। বনহুর নূরীর ললাট থেকে কেশগুচ্ছ সরিয়ে দিয়ে বলে উঠে–চল নূরী, আমরা ফিরে যাই।
