পাহারাদার দু’জন নূরীর হাত থেকে মাটির পাতিলটা নিয়ে ঢক ঢক করে এক নিঃশ্বাসে কিছুটা খেয়ে দ্বিতীয় জনের হাতে দেয়। সেও খুশিতে আত্মহারা, অল্পক্ষণেই ছোট পাতিলটা শূন্য হয়ে গেল।
ঢুলু ঢুলু করছে পাহারাদার দস্যু দু’জনের চোখ। এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’জন চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল অগ্নিকুণ্ডের পাশে।
নূরী দ্রুত হাতে পাহারাদার দু’জনের কোমর হাতরে গুহার দরজা খোলার চাবি বের করে নিল। তারপর ফিরে গেল নিজের গুহায়, দ্রুত হাতে কিছুটা খাবার নিয়ে পুনরায় ফিরে এলো, তারপর দরজা খুলে প্রবেশ করল বনহুরের অন্ধকার গুহার মধ্যে।
গুহার এক পাশে মশাল জ্বলছে। সেই আলোতে নূরী তাকিয়ে দেখলো অদূরে একটা প্রশস্ত পাথরের উপরে উবু হয়ে শুয়ে আছে বনহুর।
নূরী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়াল। বনহুর ঘুমাচ্ছে। গোটা দিন তার উপরে যে নির্মম যন্ত্রণা চলেছে সে অতি জঘন্য। নূরীর গণ্ড বেয়ে দরদর করে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। ধীরে ধীরে এগুলো নূরী বনহুরের দিকে। পাশে গিয়ে খাবারের থালাটা রাখলতারপর বসে পড়ল ওর পাশে। মশালের আলোতে দেখল, বনহুরের পিঠের চামড়া কেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। ব্যথিত দৃষ্টিতে নূরী দেখতে লাগল। বনহুরের জামাটা ছিড়ে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে। পিঠ ও দক্ষিণ হাতখানা সম্পূর্ণ বেরিয়ে পড়েছে। নূরীর দৃষ্টি হঠাৎ চলে গেল বনহুরের দক্ষিণ বাজুতে। একটা কাল জট তার সুন্দর হাতের বাজুতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নূরী চমকে উঠল এ চিহ্ন যে তার মনির বাজুতেও রয়েছে। কিন্তু ভেবে পায় না নূরী, বনহুরের সঙ্গে তার মনির এত মিল রয়েছে কেন? যাক ক্ষতগুলোর দিকে। ব্যথায় দিয়ে উঠল নূরীর হৃদয়। মোচড় নিজের ওসব ভাবনার সময় এখন তার নেই। নূরী আবার তাকাল বনহুরের পিঠে অজ্ঞাতে হাতখানা ওর পিঠে এসে পড়ল। খুব ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল নূরী।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের ঘুম ভেঙে গেল, কার কোমল হাতের স্পর্শ তার পিঠে এসে পড়েছে। বনহুর চট করে উঠে বসল কিন্তু নূরী ততক্ষণে মাথায় ঘোমটা টেনে সরে বসে।
বনহুর উঠে বসে তাকাল, কঠিন স্বরে বলল-কে তুমি?
নূরী এভাবে ঘোমটা টেনে দিয়েছিল যে তাকে চিনার কোন উপায় ছিল। নূরীর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। কোন কথা বলল না।
বনহুরের অভ্যাস নয় কোন নারীর দেহ স্পর্শ করা। সে ইচ্ছা করলেই নূরীর ঘোমটা সরিয়ে ফেলতে পারে কিন্তু সে তা করল না।
নূরী নীরবে খাবার থালাটা এগিয়ে দিল বনহুরের সামনে।
বনহুর বিস্ময়ভরা দৃষ্টি মেলে তাকাল ঘোমটা ঢাকা মুখখানার দিকে–কে এই নারী? তার প্রতি এত দরদই বা কেন? আর এই গহন বনে অজানা দস্যু-গুহায় সাধারণ মেয়ে মানুষ এলোই বা কি করে?
ক্ষুধার্ত বনহুর অবহেলা করতে পারল না। থালাখানা টেনে নিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করল।
বনহুরের খাওয়া শেষ হলে নূরী থালাটা হাতে তুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।
এরপর থেকে প্রতিদিন নূরী বনহুরের গুহায় আসত। নিজের খাবার থেকে কিছু বাঁচিয়ে বনহুরকে খাইয়ে রেখে যেত। কিন্তু সাবধান থাকত সে, কোন সময় ঘোমটা সরাত না বা কোন কথা বলত না।
অজানা নারী মনে করে বনহুরও কোন কথা বলত না—প্রশ্ন করত না কিছু।
বনহুর একা এই গুহায় প্রহর গুণত, কখন আসবে সেই নারী মূর্তি, যার নীরব মায়ায় তার হৃদয় আচ্ছন্ন হয়েছে। অজানা অচেনা এই নারী সম্বন্ধে বনহুরের অনেক চিন্তা। নারীটি কে? কি এর পরিচয়? এই বদ্ধগুহায় প্রবেশই বা করে সে কেমন করে? আর রোজ তাকে এমনি খাবার খাইয়ে যায়? বনহুর ভাবে, একদিন ওর ঘোমটা খুলে ফেলবে—দেখবে কে সে। কেনই বা আমার নিকট অমন করে নিজেকে লুকিয়ে রাখে।
পরদিন গভীর রাতে নূরী এলো অতি সন্তর্পণে ঘোমটা মুখ ঢেকে, হাতে খাবারের থালা।
বনহুর মিছামিছি ঘুমের ভান করে শুয়ে রইলো পাশ ফিরে। আজ সে কথা না বললে কিছুতেই জাগবে না বা খাবে না।
নূরী অতি লঘু পদক্ষেপে বনহুরের পাশে এসে দাঁড়াল। বনহুরকে ঘুমন্ত মনে করে খাবারের থালাটা মেঝেতে শব্দ করে রাখল।
কই, তবু তো ঘুম ভাঙল না ওর।
নূরী পুনঃ পুনঃ থালার শব্দ করল।
ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো যায়, জাগ্রত মানুষকে জাগানো যায় না। নূরী বেশ চঞ্চল হয়ে পড়ল ভয় হঠাৎ যদি কেউ এদিকে এসে পড়ে তাহলে উপায় কি হবে?
নূরী বনহুরের পাশে বসে গায়ে হাত রাখল, একটু নাড়া দিল কই, তবুও ঘুম ভাঙছে না? বনহুরের দুষ্টামি বুঝতে পারল নূরী। নিশ্চয় তাকে কথা বলাতে চায়।
নূরী খাবার রেখে বেরিয়ে যাবার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল। অমনি বনহুর উঠে নূরীর পথ রোধ করে দাঁড়াল।
থমকে দাঁড়াল নূরী, ঘোমটার ফাঁকে তাকিয়ে দেখল বনহুর তার মুখের দিকে নিস্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। এবার বলল বনহুর–আজ তোমার মুখের আবারণ খুলে ফেলতে হবে। কে তুমি?
নূরীর বুকটা ধক করে উঠলো। জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ালো সে।
বনহুর এগিয়ে এলো–তুমি যদি তোমার মুখের ঘোমটা না সরাও তবে আমি জোর করে খুলে ফেলব।
নূরী তবু নীরব।
বনহুরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে একটানে ঘোমটা খুলে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠল বনহুর নূরী!
নূরী উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠে বনহুরের বুকে মুখ লুকাল।
বনহুর বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়। যে নূরীর সন্ধানে সে বনে বনে ঘুরে ফিরছে, যে নূরীর চিন্তায় বনহুরের রাতের দ্রিার ব্যাঘাত ঘটেছে সেই নূরী তার সামনে জীবিত সে।
