রাত ভোর হলো, গাছে গাছে পাখি পাখা ঝাপটে জেগে উঠল বিছানায় জেগে উঠল মনি। নূরী তখনও খাবার থালার সামনে বসে অশ্রু বিসর্জন করছে।
মনি বিছানার পাশে নূরীকে না দেখে আধো ভাঙ্গা কণ্ঠে ডাকল মাম্মা। মাম্মা। কই।
নূরী তাড়াতাড়ি চোখ মুছে উঠে আঁড়াল, ফিরে তাকিয়ে দেখল মনি বিছানায় বসে দু’হাত প্রসারিত করে তাকে আহ্বান জানাচ্ছে। সুন্দর ছোট্ট ফুটফুটে মুখে এ কিসের আকুলতা। ওর ঐ মুখখানা কেন নূরীকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় তার হুরের কথা। সেই নাক, সেই মুখ, সেই গভীর নীল দুটি চোখ। নূরী এগুতে গিয়ে এগুতে পারে না। সুন্দর ছোট ললাটে কুঞ্চিত একগোছা চুল ঠিক তার হুরের মত। নূরী ছুটে এসে বুকে তুলে নেয়, আদর করে ডাকে মনি, আমার মনি, বাপ আমার—
মনি নূরীর গলা জড়িয়ে আনন্দে স্কুট ধ্বনি করে ওঠে–মাম্মা! মাম্মা! তুমি ঘুমোওনি?
সুন্দর ভাঙা ভাঙা অস্ফুট ধ্বনি নূরীর কানে মধু বর্ষণ করে।
নূরী বলে—না বাপ, আমি ঘুমাইনি।
কেন আম্মা?
নূরী তার কোন জবাব দিতে পারল না।
মনির ফুটফুটে নধর শরীরে তখন কোন জামা ছিল না। নূরী মনির দক্ষিণ হাতখানা নিয়ে বারবার দেখতে লাগল। মনির দক্ষিণ বাজুতে একটা জট রয়েছে। নূরী মাঝে মাঝে এই জট অবাক হয়ে দেখত, সুন্দর ফর্সা হাতে একটি কায়লা সঙ্কেতচিহ্ন।
নূরী মনিকে নিয়ে বনহুরের কষ্টের কথা ভুলতে চেষ্টা করল। কিন্তু যখন শুনল, বনহুরকে পাথরে বেঁধে চাবুকের আঘাত করা হবে, তখন নূরী কিছুতেই নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। একে আজ কদিন অনাহারে কাতর সে, তারপর এই নির্মম শাস্তি না না, কিছুতেই এ হতে পারে না। ভীম সেনকে বলে সে এই আদেশ রদ করবে।
নূরী ছুটে গেল ভীম সেনের গুহায়, কিন্তু তার পূর্বেই বনহুরকে পাথরখণ্ডের সঙ্গে দু’হাত বেঁধে চাবুক দিয়ে মারা হচ্ছে। অন্ধকার গুহায় মশালের আলো দপ্ দপ্ করে জ্বলছে। গুহায় পাথরের ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখল নূরী। একজন জমকালো লোক চাবুক নিয়ে বনহুরের দেহে আঘাতের পর আঘাত করে চলেছে। ভীম সেন সামনে দণ্ডায়মান। সকল অনুচর অস্ত্র হাতে দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রঘু ডাকু ভীম সেনের পাশে একটা ছোরা হাতে দণ্ডায়মান।
আঘাতের পর আঘাত পড়ছে বনহুরের শরীরে। দেহের জামা ছিড়ে একপাশে ঝুলে নেমেছে। দেহের কতক অংশ বেরিয়ে পড়েছে। কয়েক জায়গা কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
নূরী দু’হাতে চোখ ঢেকে ফেলল। একি নির্মম দৃশ্য। কেন সে এমনভাবে প্রতিশোধ নিতে গেল কেন সে এমন ভুল করল।
বনহুরের শরীরে আঘাত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নূরী নিজের শরীরে সেই আঘাত যেন অনুভব করতে লাগল। বিকৃত হলো তার মুখমণ্ডল।
দু’হাতে বুক চেপে ধরে ছুটে গেল। নিজের গুহায়। মনিকে বুকে তুলে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেদে উঠল। চোখের সামনে ভাসতে লাগল বনহুরের প্রতি
সেই নির্মম যন্ত্রণার করুণ দৃশ্য। নূরী উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠল।
বহু চেষ্টা করেও নূরী বনহুরকে উদ্ধার করার উপায় খুঁজে পেল না।
নূরীকে কাঁদতে দেখে মনির মনের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। কিছুতে ভেবে পাচ্ছে না তার মা এমন করে কাঁদছে কেন?
মনি অস্ফুট কন্ঠে বলল–আম্মা, তুমি অমন করে কাঁদছ কেন?
নূরী কি বলবে, কি জবাব দেবে শিশু মনির প্রশ্নের? কি করে বলবে যাকে ধরে আনা হয়েছে সে অপর জন নয়, সে তার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়। কেমন করে এ কথাটা কচি মনিকে বুঝিয়ে বলবে।
নূরী নীরবে কাঁদে।
আজও গোটা দিন নূরী কিছু মুখে দিল না। সেই মর্মস্পর্শী হৃদয় বিদারক দৃশ্যটা বারবার মনের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল। দেয়ালের সাথে হাত দুটো শিকলে বাঁধা—বনহুরের শরীরে চাবুকের আঘাত করা হচ্ছে তার সুন্দর দেহ কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মুখোভাবে ফুটে উঠেছে দারুণ যন্ত্রণার চিহ্ন। অথচ নীরব সে। একটি শব্দও সে করছে না। যতই সে দৃশ্যের কথা ভাবে নূরী, ততই তার মনে বেদনার কাটা শেল হয়ে বিদ্ধ হয়। নূরী কি জানত বনহুরের কষ্ট ব্যথা তারই হৃদয়ে এসে আঘাত করবে।
আজও বনহুর জানে না, কেন এভাবে বন্দী করে আনা হয়েছে। কেন তার ওপর এই নির্মম কশাঘাত করা হচ্ছে। কার অদৃশ্য ইংগিত রয়েছে এর পেছনে, কিছুই জানে না সে।
বনহুর জানে নূরী বেঁচে নেই।
আর বেঁচে থাকলেও সে কোথায় আছে, কেমন আছে, কে জানে?
০৭.
গভীর রাত।
নূরী শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল। ওপাশ থেকে একটা মাটির ছোট্ট পাতিল তুলে নিল হাতে, তারপর বেরিয়ে এলো গুহা থেকে। অদূরে আর একটা গুহার মুখে দু’জন ভীম চেহারার দস্যু সুতীক্ষ্ণ ধারাল বর্শা হাতে পাহাড়া দিচ্ছে। সামনে অগ্নিকুণ্ড দাউদাউ করে জ্বলছে।
নূরী মাটির ছোট্ট পাতিল হাতে চারদিক সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগুলো। নিস্তব্ধ বনভূমির জমাট অন্ধকার অগ্নিকুণ্ডের আলোতে যদিও কিঞ্চিত আলোকময় হয়ে উঠলো, তবুও বেশ অন্ধকার বোধ হচ্ছিল। নূরী অতি সতর্কতার সঙ্গে ভীম চেহারার পাহারদার দু’জনের পাশে এসে দাঁড়াল।
নূরীকে দেখে বিস্ময় ফুটে উঠল পাহারাদারদের চোখেমুখে। বলল একজন—রাণীমা, তুমি!
নূরী ফিস্ ফিস করে বলল তোমাদের জন্য একটু তাল রস রেখেছিলাম, এনেছি খাবে?
পাহারাদার দু’জনের চোখ খুশিতে উজ্জ্বল হলো।
তালরস পেলে এরা সব ভুলে যায়। তাছাড়া রাণীমা যখন নিজ হাতে নিয়ে এসেছে—কম কথা নয়।
