নূরী চাপাকণ্ঠে বলল–দস্যু বনহুর নিশ্চয়ই আসবে, অতি সাবধানে তাকে ধরে ফেল তোমরা। দেখো যেন আঘাত করোনা। আবার নূরী বাঁশীতে ঠোঁট রাখল। অপূর্ব সুরের মুর্ঘনায় অন্ধকার বনভূতি মুখর হয়ে উঠল।
পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট–কই সে তো আসছে না। নূরীর বাঁশীর সুরে আরও জোরে ঝঙ্কার উঠল।
ঐ তো শুকনো পাতায় মানুষের পদশব্দ শোনা যাচ্ছে। নূরীর বাঁশীর সুর লক্ষ্য করে কে যেন এগিয়ে আসছে।
ভীম সেন রঘুকে ইংগিত করল।
পদশব্দ আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ওইতো সামনে এগিয়ে আসছে, কে। রঘু শিস্ দিল।
সঙ্গে সঙ্গে ভীম সেনের দল ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মুহূর্তে থেমে গেল নূরীর বাঁশীর সুর।
প্রচণ্ড ধস্তাধস্তির শব্দ। পরমুহূর্তে ভীম সেনের কঠিন গম্ভীর কণ্ঠস্বর–খবরদার, নড়ো না।
নূরী একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখল—একজনকে প্রায় পঞ্চাশ জন লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘিরে ধরেছে। নিশ্চয়ই বনহুর ছাড়া অন্য কেউ নয়। কেমন জব্দ করেছে নূরী তাকে।
ভীম সেন দস্যু বনহুরকে পাকড়াও করার জন্য শিকল সঙ্গে এনেছিল, ওকে মজবুত করে বেঁধে ফেলা হলো। তারপর সবাই মিলে নিয়ে চলল তাকে।
০৬.
হঠাৎ এ অবস্থার জন্য বনহুর একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। গভীর রাতে যখন সে বিছানায় শুয়ে নানা কথা চিন্তা করছিল–মা, মনিরা নূরী–পর পর সকলের কথা ভেসে উঠছিল তার মনের পর্দায়। কিছুতেই ঘুম আসছিল না তার চোখে, এমন সময় তার কানে ভেসে আসে সেই সুর–যে সুর তার অতি পরিচিত। বহুদিন বনহুর এই সুরের আকর্ষণে ছুটে গেছে বন হতে বনান্তরে। নূরী কোন গোপন স্থানে লুকিয়ে বাঁশী বাজাত। বনহুর তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যেত। নূরী লুকিয়ে থেকে হাসত খিল খিল করে। আজ সেই বাঁশির সুর বনহুরকে তন্দ্রাচ্ছন্নের মত করে ফেলে। বনহুর জানে নূরী হারিয়ে গেছে। রাগ বা অভিমান করে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। তবে কি নূরী ফিরে এসেছে? সেই পরিচিত সুরে তাকে আহ্বান জানাচ্ছে? বনহুর কিছু চিন্তা না করে নিরস্ত্রভাবে ছুটে বেরিয়ে এসেছিল? ভুলে গিয়েছিল সেখানে কোন বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে।
বুদ্ধিমান দস্যু বনহুর নূরীর চিন্তায় গভীরভাবে মগ্ন হয়ে পড়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে নূরীর বাঁশীর সুর–বনহুর ভুলে গিয়েছিল নিজের অস্তিত্ব প্রবল একটা আকর্ষণে ছুটে এসেছিল সে এখানে–নইলে তাকে বন্দী করা এত সহজ ছিল না। শুধু নূরীর বাঁশীর সুরই তাকে এই পরাজয়ের মালা পরিয়ে দিল।
দস্যু বনহুরকে বন্দী করে এ সাধ্য ছিল না ভীম সেন বা তার দলের। যতবড় ডাকাত বা দস্যু হোক, কিছুতেই ওকে বন্দী করতে সক্ষম হত না, যদি নূরী কৌশল অবলম্বন না করত। নূরীর বুদ্ধি ও চতুরতায় বন্দী হলো দস্যু বনহুর।
বনহুরকে শিকলে বেঁধে নৌকায় তুলে নেয়া হলো। বনহুর জানল, না কে তাকে এভাবে বন্দী করল। আর কোথায়ই বা তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
কয়েক দিন অবিরত চলার পর ভীম সেনের আস্তানায় পৌঁছল তারা।
বনহুরকে পূর্বের ন্যায় শিকলাবদ্ধ অবস্থায় এখানে আনা হলো পাহাড়ের একটি গুহায় আবদ্ধ করে রাখা হলো। ক্রুদ্ধ সিংহ বন্দী হলে তার যেমন অবস্থা হয়, তেমনি হলো দস্যু বনহুরের।
ক’দিন সম্পূর্ণ অনাহারে রয়েছে সে।
কিছু মাংস আর রুটি তাকে নৌকায় খেতে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু বনহুর তা খায়নি শুধু পানি খেয়েছিল মাঝে মাঝে।
অন্য নৌকায় থাকলেও নূরী এ খবর পেয়েছিল। যতই কঠিন হতে যাক সে, তবু পারছিল না। মনের মধ্যে ব্যথার কাঁটা খচখচ করে বিঁধছিল। যার এতটুকু কষ্ট তার কোন দিন সহ্য হয় না, যার মলিন ব্যথাভরা মুখ দেখলে নূরীর হৃদয় ডুকরে কেঁদে উঠে, যার জন্য নূরী প্রাণ দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে না, সেই হুর আজ ক’দিন সম্পূর্ণ অনাহারে রয়েছে। নূরীর অন্তরটা গুমড়ে কেঁদে মরলেও কিছু বলতে বা করতে পারছিল না। কারণ বন্দীর প্রতি অনুরাগ দেখান শোভা পায় না তার। তাছাড়া ভীম সেন এতে সন্তুষ্ট হবে না। নূরী এখন তীব্র জ্বালায় মরছে। না পারছে বনহুরের কষ্ট সহ্য করতে, না পারছে তার প্রতি কোন দরদ দেখাতে। নূরী নিজে ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে লাগল। কাউকে মনের কথাও বলবে না বা বলার সাহসও নেই নূরীর। বনহুরকে বন্দী করে আনতে ভীম সেনের দলকে যা দারুণ কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তা বলার নয়। এত করার পর বন্দী সম্বন্ধে সহানুভূতি দেখান তার পক্ষে সমীচীন হবে না। ভীম সেন ডাকাত–কঠিন প্রাণ মানুষ। হয়ত হিতে বিপরীত হতে পারে। হয়ত ভুল বুঝতে পারে। মনের কোণে দারুণ ব্যথা নীরবে সহ্য করে চলল নূরী।
একটা অন্ধকার গুহায় বনহুরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছে। গুহার এককোণে একটা মশাল দপ দপ করে জ্বলছে। গুহার দরজায় দু’জন ভীষণ চেহারার দস্যু সুতীক্ষ্ণ বর্শা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
গুহার সামনে অগ্নিকুণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে।
ভীম সেনের আস্তানা আজ ঝিমিয়ে পড়েছে। গত কদিনে অবিশ্রান্ত পরিশ্রম আর জাগরণের পর সবাই বিশ্রামের জন্য শয্যা গ্রহণ করেছে।
কিন্তু নূরীর চোখে ঘুম নেই।
বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে সে। পাশে ঘুমন্ত মনি। নূরী শয্যা ত্যাগ করল, নিজের খাবার সে অতি যত্নে ঢেকে রেখেছে। তার হুর আজ ক’দিন উপবাস রয়েছে আর সে খাবে কোন মুখে। খাবারের থালা হাতে দরজার পাশে এসে উঁকি দিল, কোন রকমে যদি একবার ওর মুখে একটু খাবার তুলে দিতে পারত। কিন্তু উপায় নেই। নূরী ভেবেছিল, বনহুরকে কঠিন শাস্তি দিলে তার মনে শান্তি আসবে। কই, তা তো হলো না। বরং ওকে বন্দী করে নূরীর হৃদয়ের জ্বালা আরও দশগুণ বেড়ে গেছে। নূরী খাবারের থালা হাতে ফিরে এলো কুঠরির মধ্যে। পাথরের খণ্ডটার উপরে খাবারের থালা রেখে বসে পড়ল হতাশায় ভরে উঠল তার মন।
