নূরী গোপনে ভীম সেনের কানে কিছু গোপন কথা বলে নিল। যা বলল, তাতে দস্যু বনহুরকে বন্দী করা মোটেই কঠিন হবে না।
কয়েকখানা বড় নৌকা নিয়ে ভীম সেনের দল নদীপথে রওয়ানা দিল। নূরী এবং মনিও চলল তাদের সঙ্গে। পথে যাতে নূরী ও তার শিশুর কোন কষ্ট না হয় সেজন্য ভীম সেনের লক্ষ্য কম ছিল না। দিনের বেলায় নৌকাগুলো নদীর কোন জঙ্গলময় স্থানে লুকিয়ে রাখা হত, আর গোটা রাত ধরে চলত তাদের পথচলা। কয়েকদিন অবিরত চলার পর কান্দাই বনের অদূরে শম্ভ নদীর একটা গোপন স্থানে তারা নৌকা রাখল। জায়গাটা জঙ্গলে ঘেরা একটা বাঁক। সহসা কারও নজরে পড়বে না নৌকা। নূরী বহুদিন বনহুরের সঙ্গে শম্ভু নদীতীরে ঘোড়ার চড়ে বেড়াতে এসেছে। কাজেই এসব পথ তার অতি পরিচিত।
নূরী ভীম সেনের অনুচরদের নিয়ে নৌকা থেকে নেমে পড়ল। একে অন্ধকার রাত তদুপরি ভীম সেনের জংলী অনুচরগণের জমকালো চেহারা। কাল রাতের অন্ধকারে ওদের কাল দেহ মিশে যেন এক হয়ে গেল।
সবাই অস্ত্র নিয়ে নূরীকে অনুসরণ করল।
নূরী নৌকা থেকে নেমে পুনরায় একবার সবাইকে বলল–তোমাদের কাছে আমার বারবার অনুরোধ, দস্যু বনহুরকে তোমরা জীবন্ত পাকড়াও করবে, ভুল করেও যেন তার শরীরে আঘাত কর না।
রঘু বলল–যদি সে আক্রমণ করে?
নূরী কিছু বলার পূর্বেই বলল ভীম সেন–তোমরা শুধু নিজেদের রক্ষা করবে।
নূরী, ভীম সেন ও রঘু চলল আগে, আর তাদের দলবল চলল পেছনে।
অন্ধকার রাতে চলা ডাকাত বা দস্যুদের কষ্টকর কিছু নয়। এসব তারা অভিজ্ঞ ও অভ্যস্ত। কাজেই ভীম সেনের দল নূরী ও সর্দারের পদশব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে চললো।
যে পথে নূরী অগ্রসর হলো সে পথ অতি গোপনীয়। এ পথের সন্ধান আর কেউ জানে না—একমাত্র বনহুর আর নূরী ছাড়া। আর জানে রহমান।
নূরী বনহুরের আস্তানার নিকটবর্তী হয়েই ভীম সেন ও তার দলবলকে বলল–আমি গোপনে আস্তানার মধ্যে প্রবেশ করছি, যতক্ষণ ফিরে না আসব ততক্ষণ তোমরা এই বনের মধ্যে ঝোপঝাড়ের আড়ালে অতি সাবধানে লুকিয়ে থাকবে—দেখ কোনরকম যেন শব্দ না, হয় আমি এসে বাঁশীতে ফুঁ দেব। সেই বাঁশী টেনে আনবে বনহুরকে।
ভীম সেন বলল বাশী। বাঁশী তুমি কোথায় পাবে মা?
সে অনেক কথা–বলব পরে।
ইতোমধ্যে নূরী যখন ভীম সেনের দলকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছিল তখনও একবার ভীম সেন প্রশ্ন করেছিল—এসব পথ তুমি কি করে চিনলে মা?
নূরী বলেছিল, বাপু, একদিন সব তোমাকে খুলে বলব আজ তুমি কিছুই জানতে চেওনা।
ভীম সেন বাশী সম্বন্ধে প্রশ্ন করে একটু লজ্জা পেল। নূরী চলে গেছে ততক্ষণে।
ভীম সেন দলবল নিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হলো। এসব ব্যাপার তার কাছে এমন কোন নতুন নয়। ভীম সেন নূরীকে নিয়ে সতর্ক রইলো কখন নূরী ফিরে আসে।
নূরী আসার সময় মনিকে নৌকায় ঘুমপাড়িয়ে রেখে এসেছে। দু’জন অনুচরকে তার পাহারায় রেখে এসেছে সে। কাজেই নূরী মনির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। নূরী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আস্তানায় প্রবেশ করল। যে পথে নূরী আস্তানায় প্রবেশ করল এ পথ অত্যন্ত গোপন পথ। কাজেই এদিকে বনহুরের কোন অনুচর পাহারায় থাকত না। নূরী অতি সতর্কতার সঙ্গে কৌশলে এগিয়ে চলল। অনেক দিন আগে ছেড়ে যাওয়া তার নিজের কক্ষের দিকে।
নূরী নিজ কক্ষের পাশে এসে থমকে দাঁড়াল। ঐ স্থান থেকে বনহুরের কক্ষ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কক্ষে আলো জ্বলছে তখন। নিশ্চয়ই আজ বনহুর আস্তানা ছেড়ে বাইরে যায়নি। এটাই নূরী চেয়েছিল, মনে মনে খুশি হলো সে।
অতি কৌশলে নিজের কক্ষে প্রবেশ করল নূরী। কক্ষ শূন্য। কক্ষে কোন আলো না থাকায় কিছুই সে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু আজও নূরীর মানসপটে কক্ষের প্রতিটি স্থান ও তার নিজ হাতে রাখা জিনিসপত্রের অস্তিত্ব অনুভব করল। নূরী হাতড়িয়ে এগুলো। পূর্বধারে তার বিছানা পাতা ছিল। হাঁ, ঠিক সে ভাবেই রয়েছে। একপাশে আলনায় তার জামা কাপড়গুলো সাজান ছিল—হাঁ, সেগুলোও ঠিক তেমনি আছে। কোন জিনিস নড়চড় হয়নি। নূরী এবার দেয়াল হাতড়িয়ে তাক খুঁজে দেখতে লাগল। হাঁ পেয়েছে ছোট্ট একটা লম্বা বাক্স। নূরী অন্ধকারেই বাক্সটা চেপে ধরল বুকে। এ বাক্সে রয়েছে তার অতি প্রিয় বাঁশী, যে বাঁশীর সুর শুধু কান্দাই বনের গাছের শাখায় শাখায় দোলা জাগায়নি, বনের প্রতিটি পশুপক্ষী সে সুরে তন্ময় হয়ে গেছে। তন্ময় হয়েছে বনহুরের অনুচরগণ। স্তব্ধ হয়ে গেছে কান্দাই বনের আলো-বাতাস।
নূরী যখন ঝর্ণার পাশে বসে বাঁশী বাজাত তখন দস্যু বনহুর যেখানেই থাক বাঁশীর সুর কানে পৌঁছামাত্র আত্মহারা হয়ে ছুটে আসত তার পাশে। এমন কোন শক্তিই ছিল না যে শক্তি বনহুরকে বাধা দেয়।
আজ নূরী সেই যাদুকাঠি তুলে নিল হাতের মুঠায়। তার দু’চোখে আজ প্রতিহিংসার তীব্র জ্বালা। অতি সন্তপর্ণে নূরী নিজ কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো।
এত সহজে সে আস্তানা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে ভাবতে পারেনি। নূরী, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো কিন্তু একটা আশঙ্কা বারবার জাগতে লাগল তার হৃদয়ে। বুকটা টিপ টিপ করছে।
নূরী এসে দাঁড়াতেই ভীম সেন আর রঘু বেরিয়ে এলো। ভীম সেন বলল–কি হলো মা? খবর ভাল?
হাঁ। গলাটা কাঁপলো নূরীর। রঘু বলল, দস্যু বেটা আজ তাহলে বাইরে যায়নি?
নূরী কম্পিত ঠোঁটে বাঁশীখানা চেপে ধরল। বহুদিন পর আজ আবার সেই সুর। নূরীর ঠোঁটে বাঁশীর সুর কেঁপে কেঁপে উঠল। বনের শাখায় শাখায় পাখিগুলো পাখা ঝাপটা দিয়ে উঠল, স্তব্ধ বাতাসে জাগল স্পন্দন। দোলা লাগল পাতায় পাতায়।
