আপনি এসব তার সম্বন্ধে অন্যায় উক্তি করছেন। সত্যি তিনি মহৎ মহান দস্যু হলেও তিনি একজন হৃদয়বান লোক। আপনি বলেছেন, তিনি শুধু আমাকেই উদ্ধার করেছেন, তা নয় পুলিশ যা পারেনি রাজ্য পরিচালকগণ যা করতে সক্ষম হয়নি, সেই অসাধ্য সাধন করেছেন দস্যু বনহুর। তিনি নারীহরণকারীদের শুধু সায়েস্তাই করেননি, সমূলে তাদের ধ্বংস করেছ।
মিঃ আহমদ অস্ফুট কন্ঠে ধ্বনি করে উঠলেন–কি বলিস মা।
হাঁ আব্বা, নারীহরণকারীদেরকে এক এক করে তিনি হত্যা করেছেন। তারপর যত যুবতী তাদের বন্দীখানায় ছিল, সবাইকে তিনি বোনের মত সম্মান দিয়ে যার যার আবাসে পৌঁছে দিয়েছেন। আর যাদের তিনি পৌঁছে দিতে পারেননি, তাদের থানা অফিসারদের হেফাযতে দিয়েছেন যেন ওরা স্বদেশে নিজ নিজ পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজনের নিকট পৌঁছতে সক্ষম হয়। বলুন আপনারা, তিনি এসব করে অন্যায় করেছেন?
মিঃ হারুন কোন কথা বললেন না।
মিঃ আহমদ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন কন্যার মুখের দিকে।
০৫.
ভীম সেন নূরীকে কন্যারূপে গ্রহণ করেছে। সকল অনুচরকে বলে দিয়েছে—এই তাদের রাণী। যা বলবে সে, তাই যেন ওরা করে বা শোনে। ভীম সেন নিজেও নূরীর কথা মানতো, যেখানেই দস্যুতা করতে যাক নূরীর পরামর্শ নিত, ভীম সেন নূরীর মধ্যে এমন একটা আলোর সন্ধান পেয়েছে। যা তাকে অভিভূত করে ফেলেছে। দস্যু দুহিতা নূরী নিজের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে ভীম সেনের দলের মধ্যে, নূরীর বুদ্ধি এবং কৌশলে সবাই তাকে রাণী বলে মেনে নিতে অস্বীকার করল না।
ভীম সেন যখনই জাহাজে দূরদেশে দস্যুতা করতে যেত তখনই নূরী তাদের সঙ্গে যেত, মনিও যেত তাদের সঙ্গে।
মনি এখন হাঁটতে শিখেছে, ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা বলতে শিখেছে। নূরীকে মনি মা বলে ডাকে।
দিন যায়।
নূরী এখন ভীম সেনের দলের একচ্ছত্র রাণী। ডাকু ভীম সেন এবং রঘু নূরীর কথায় উঠে-বসে, এমনকি নুরী যেদিন দস্যুতা করতে যাবার জন্য আগ্রহ দেখায় তখনই ভীম সেন দলবল নিয়ে যাত্রা করে।
ভীম সেনের দলকে নূরী নিজের বশীভূত করার পেছনে ছিল একটা গোপন অভিসন্ধি। যেদিন নূরী বজরা ত্যাগ করে চলে আসে, সেদিন যে শপথ গ্রহণ করেছিল, বনহুর তার ভালবাসার প্রতিদানে চরম আঘাত দিয়েছে—এর প্রতিশোধ সে নেবে। তার হৃদয়ে যে বিষের আগুন সে জ্বেলে দিয়েছে, সে আগুন দিয়ে বনহুরকে নূরী দগ্ধীভূত করবে। বনহুরকে চরম আঘাত দিতে পারলে তবেই হবে তার শান্তি। চৌধুরীকন্যা মনিরার সকল সাধ সে ধূলায় মিশিয়ে দেবে। বনহুরকে নূরী শিশুকাল থেকে ভালবেসে এসেছে, প্রাণের চেয়েও অধিক সে ভালবাসা, মায়া মমতা। সেই গভীর প্রেমকে বনহুর পদদলিত করে অন্য একটি মেয়েকে স্ত্রীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সব আঘাত নূরী সইতে পারে। মাথায় যদি বজ্রাঘাত হত তাতেও নূরী বিচলিত হত না যাত আঘাত পেয়েছে সে, বনহুর যখন বলেছে, মনিরাকে সে বিয়ে করেছে। না না, এ কথা নূরী ভাবতেও পারে না। হুরসে যে তার একার! ওকে ছাড়া নূরী বাঁচতে পারে না। সে বিষের জ্বালা নূরীর মনে দাউ দাউ করে জ্বলছিল। যতক্ষণ এর প্রতিশোধ সে না নিতে পেরেছে ততক্ষণ তার মনের সে আগুন নিভবে না।
আজ সেই দিন সামনে উপস্থিত।
নূরী চেয়েছিল নিজে একটা দস্যুদল গঠন করবে। তারপর বনহুরকে কেমন করে শায়েস্তা করতে হয় দেখিয়ে দেবে। দেখিয়ে দেবে তার প্রেমকে উপেক্ষা করার কি পরিণতি। তার সে ইচ্ছা অতি সহজেই পূরণ হলো–ভাগ্যই তাকে টেনে নিয়ে এসেছে ডাকু ভীম সেনের গুহায়।
নুরী মনের অভিসন্ধি মনে চেপে দিনের পর দিন নিজের দলকে অতি নিপুণভাবে তৈরি করে নিল যাতে দস্যু বনহুরকে পাকড়াও করতে তার এতটুকু বেগ পেতে না হয়।
কিন্তু দিনরাত নুরী মনের সঙ্গে দ্বন্দ করে চলল, শেষ পর্যন্ত বনহুরের নিকট তার দলের যদি পরাজয় হয়। বনহুরকে যদি পাকড়াও করতে না পারে তাহলে? কিন্তু তবু যে কোন উপায়ে, হোক ওকে সমুচিত শাস্তি না দেয়া পর্যন্ত তার হৃদয়ের জ্বালা নিভবে না। প্রতিশোধ চাই, প্রতিশোধ–
একদিন ভীম সেনকে বলল নূরী বাপু, তোমার কাছে আমি কোনদিন কিছু চাইনি, একটা কথা তোমাকে রাখতে হবে।
ভীম সেন হেসে বলল–বল, কি কথা তোমার রাখতে হবে মা! আমার জীবন দিয়েও তা রাখতে চেষ্টা করব।
বাপু, আমি জানি, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ডাকু তুমি।
হাঁ মা, একথা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। ভীম সেনের মত বিখ্যাত ডাকাত আর ত্রিভুবনে নেই। কেন মা?
বাপু, শুনেছি দস্যু বনহুর নাকি মস্ত দস্যু। কেউ নাকি তাকে কোনদিন বন্দী করতে পারে না, আমি চাই তাকে বন্দী করতে।
হাঃ হাঃ হাঃ এই কথা। দস্যু বনহুর সে আবার একজন মস্ত দ কি যে বল মা। কিন্তু হঠাৎ এ সখ কেন হলো মা?
বাপু, আমার বড় রাগ হয় যখন শুনি দস্যু বনহুর নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দস্যু। তাই ওকে বন্দী করে কিছুটা সাজা দেয়া আমার ইচ্ছা।
বেশ বেশ, তোমার ইচ্ছা আমি কি পূরণ না করে পারি?
ভীম সেন সেই দিনই তার অনুচরগণকে ডেকে বলল–তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও। আমি আজ রাতেই দস্যু বনহুরকে গ্রেফতার করতে যাব।
নূরী চমকে উঠল, কথাটা সে নিজে বলেছে সত্য, কিন্তু অপরের মুখে এ কথাটা যেন তার কানে গরম সীসা ঢেলে দিল। অনেক চিন্তা করার পর নিজেকে কঠিন করে নিল নূরী। না, সে কিছুতেই নিজেকে বিচলিত করবে না। মনকে সে পাষাণ করবে। বনহুর তার সব আশা-আকাঙ্খা-বাসনা ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে। কিছুতেই সে ওকে ক্ষমা করবে না। কিন্তু ভীম সেনের দল কি পারবে তাকে বন্দী করে আনতে? কারও সাধ্য নেই বনহুরকে বন্দী করে। শুধু নূরী—নূরী পারে তাকে বন্দী করতে। তাকে নাকানি চুবানি খাওয়াতে।
