সুফিয়া তাড়াতাড়ি কাণজখানা হাতে তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করল।
“বোন সুফিয়া, তোমার মঙ্গলই আমার কামনা। তোমার নিস্পাপ পবিত্র জীবন চিরসুন্দর এবং সুখের হোক।”
তোমার ভাইয়া
–দস্যু বনহুর।
মিঃ আহমদ কক্ষে প্রবেশ করে বললেন—ও কই—
কে?
যে তোমাকে চুরি করে নিয়ে ফেরত দিয়ে গেল।
আব্বা! তুমি ভুল বুঝেছ।
সুফিয়া, দস্যু কোনদিন সাধু হয় না। তোমার নারীজীবন কলঙ্কময় করে এসেছে তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে সাধুগিরি দেখাতে!
এই দেখ সে মানুষ নয়—ফেরেস্তা।
সুফিয়া!
হাঁ, তুমি এই কাগজের টুকরাখানা পড়লেই সব বুঝতে পারবে। সে আমাকে নিজের বোনের মত মনে করত। তাছাড়া তার চেষ্টাতেই আমি নিজেকে ফিরে পেয়েছি। রক্ষা করেছেন তিনি আমাকে, রক্ষা করেছেন নারীর অমূল্য সম্পদ সতীত্ব। তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমান।
মিঃ আহমদ কন্যার হাত থেকে কাগজের টুকরাখানা নিয়ে তুলে ধরলেন চোখের সামনে।
ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবেশ করলেন মিঃ হারুন ও তার পেছনে পুলিশ ফোর্স। সকলের হাতে উদ্যত রাইফেল। মিঃ হারুনের হাতে রিভলবার।
ব্যস্তকণ্ঠে বললেন মিঃ হারুন—স্যার, কোথায় সেই নরপিচাশ?
মিঃ আহমদ বললেন—পালিয়েছে!
মিঃ হারুন সুফিয়াকে দেখে চোখমুখে বিস্ময় এনে বললেন–ইনি।
মিঃ আহমদ ছোট্ট কাগজের টুকরাখানা মিঃ হারুনের হাতে দিলেন–পড়ে দেখুন।
হিঃ হারুন চিরকুটখানা পড়ে পরপর কয়েকবার তাকালেন বনহুরের লেখা চিঠিখানা ও সুফিয়ার মুখের দিকে, তারপর বললেন আশ্চর্য!
সুফিয়া গম্ভীর কণ্ঠে বলল–আশ্চর্য নয়, সবই সত্য। আপনারা বসুন, আমি সব ঘটনা বলছি।
মিঃ আহমদ বললেন হাঁ, এখনও সুফিয়ার মুখে কোন কথাই আমাদের শোনা হয়নি।
মিঃ হারুন পুলিশ ফোর্সকে ইংগিতে বাইরে যেত বললেন।
পুলিশ ফোর্স তৎক্ষণাৎ কক্ষত্যাগ করল।
মিঃ আহমদ বললেন–বসুন। নিজেও আসন গ্রহণ করলেন আহমদ সাহেব।
সুফিয়া নিজে একটা আসনে বসে বলতে শুরু করল–আব্বা আমাকে যখন গুণ্ডাদল কৌশলে হাত-পা-মুখ বেঁধে তাদের গোপন আস্তানায় নিয়ে গেল, তখন আমি মনে করেছিলাম, নিশ্চয়ই আমি দস্যু বনহুরের কবলে পড়েছি এবং আমি ভয়ে মুষড়ে পড়লাম, কেঁদে কেটে অস্থির হলাম। এমন কি ওরা যত টাকা চায় তাই দেবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম।
তারপর? বললেন মিঃ হারুন?
সুফিয়া তখনও বলে চলেছে–তবু আমাকে ওরা মুক্তি দিল না। আমাকে এমন এক কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়েছে যে কক্ষে আরও কয়েকজন যুবতী ছিল। তাদের সঙ্গে আমিও সেই অন্ধকার কক্ষে বন্দী অবস্থায় রইলাম। তারপর গভীর রাতে আমাদের কয়েকজনকে হাত-পামুখ বেঁধে একটা নৌকায় উঠান হলো।
মিঃ আহমদ অস্ফুট ধ্বনি করলেন নৌকায়?
হাঁ, আব্বা, সেই নৌকা অবিরত কয়েকদিন চলার পর অজানা-অচেনা এক শহরে গিয়ে পৌঁছল। সেখানেও গভীর রাতে আমাদের পূর্বের মতই অবস্থা করে একটা ঘোড়ার গাড়িতে উঠান হলো। তারপর গাড়িখানা উঁচুনীচু পথ বেয়ে চলতে লাগল। আমাদের শরীরে সে ঝাঁকুনির ব্যথা অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে উঠল। তবু সহ্য করতে বাধ্য হলাম। তাছাড়া কোন উপায়ও ছিল না।
উঃ! শয়তান নরপিচাশের দল–আহমদ সাহেব দাঁতে দাঁত পিষে বললেন।
মিঃ হারুন বলে উঠলেন–দস্যু বনহুরের কাজ ছাড়া এ কারও কাজ নয়। আমরা জানি, সে যেমন হৃদয়হীন দস্যু তেমনি নারী
সুফিয়া কঠিন কণ্ঠে বলে উঠলআপনি ভুল করছেন। তাঁর মত হৃদয়বান দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই—
মিঃ হারুন হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন—মিস সুফিয়া, আপনি তার উপরের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। কিন্তু তার
না, আপনি চুপ করে শুনুন—তারপর বলবেন।
মিঃ আহমদ বলেন, হাঁ ইন্সপেক্টার, আগে ওর কথা শোনা যাক, তারপর সাব বুঝা যাবে। আচ্ছা তুমি বল মা।
আব্বা, আমি এক নারীহরণকারী গুণ্ডাদলের হাতে পড়েছিলাম যারা ঐ ব্যবসায়ে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করছিল।
বল মা, তারপর কি হলো?
হাঁ আব্বা, আমাকে একটা পুরানো বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। শুধু আমাকে নয়, আমার সঙ্গিনীগণকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। সে বাড়ি নারী ব্যবসায়ী এক মহিলার। আপনাদের বুঝিয়ে বলতে পারব না সে কি রকম স্থান। সেই মহিলার চেহারা মনে হলে আজও হৃদয় ভয়ে শিউরে ওঠে। ভীমকায়, বিরাটদেহী এক মহিলা। যার প্রভাব গোটা দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে রয়েছে। ওই মহিলার অনুচরগণ বিভিন্ন দেশ থেকে নারী এবং শিশুদেরহরণ করে নিয়ে যেত সেখানে। সেখান থেকে চালান হত বিভিন্ন জায়গায়। আমাকে সেই মহিলা একটি বিরাট কক্ষে বন্দী করে রাখল। সেখানে আমার মত আরও কত যে যুবতী ধরে এনে আটকে রাখা হয়েছে, তার শেষ নেই। প্রতি রাতে ওই মহিলার কাছে লোক আসত। যাকে পছন্দ হত উচিত মূল্য দিয়ে ক্রয় করে নিয়ে যেত। আমিও একদিন বিক্রি হলাম। ঝিন্দের রাজকুমারের এক গুণ্ডা অনুচর আমাকে কিনে নিয়ে গেল।
অবশ্য এ কথা আমি পরে জানতে পেরেছিলাম। মাতাল ঝিন্দ রাজকুমারের জঘন্য মনোবৃত্তি থেকে সেদিন আমার উদ্ধার ছিল না, যদি এই মহান ব্যক্তি আমাকে বাঁচিয়ে না নিতেন, সুফিয়া আনমনা হয়ে পড়ল।
মিঃ আহমদের চোখ-মুখেও ভাবের উদয় হলো, তিনি কন্যার অন্তরের কথা হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করলেন।
কিন্তু মিঃ হারুনের মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল, বললেন—দস্যু বনহুরের এটাও মস্ত অভিনয়। নইলে এতগুলো যুবতীকে নারীহরণকারীদের হাতে রেখে শুধু আপনাকে সে উদ্ধার করত না, আপনি যদি পুলিশ সুপারের কন্যা না হতেন। পুলিশ সুপারের মেয়েকে উদ্ধার করে তার পিতার নিকটে ফিরিয়ে দিয়ে দস্যু নিজেকে সাধু বানাতে চেয়েছিল।
