মরিয়ম বেগম কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ভাবেন, পুত্রের কথাগুলোই বুঝি তার মনের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে! শত শত দীন-দুঃখীর ব্যথাকরুণ মুখ ভেসে উঠেছে বুঝি তার মনের গহনে। দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
বনহুর উঠে দাঁড়িয়ে নিজের রুমালে মায়ের অশ্রু মুছিয়ে দিয়ে বলল তোমার চোখে অশ্রু আমাকে পাগল করে ফেলবে। মা, তুমি যা বলবে তাই আমি করব। বল, বল আমাকে তুমি কোনপথে যেতে বল?
মরিয়ম বেগম ধ্যানগ্রস্তের মত নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। এদিকে তাঁর সোনার সংসার-পুত্র, পুত্রবধু, তাদের সন্তান-সন্ততি, আর এক দিকে দেশের শত শত দীন হীন অসহায় জনগণ কোন দিকটা তিনি চান, কোন দিকটাকে তিনি মনের মনিকোঠা থেকে গ্রহণ করবেন।
কোন জননী না চায় পুত্র, পুত্রবধু তাদের সন্তান সন্ততি নিয়ে সংসার বাঁধতে? কিন্তু বিবেকের কাছে পরাজিত হন মরিয়ম বেগম। নিজের দিকে দেখতে গিয়ে দেশের অসহায় জনগণের কথা ভুলে যাবেন কোন মুখে, কোন প্রাণে? একমাত্র পুত্রের বিনিময়ে তিনি যদি শত শত পুত্রের দুঃখব্যথা মুছে ফেলতে পারেন তাহলে তাঁর মত সুখী কে! কি হবে তার একার সুখ আর আনন্দ দিয়ে দেশের অগণিত নর-নারী যদি ক্ষুধায় মরে যায়, তাদের হাহাকারে দেশ যদি অশান্তিময় হয়ে ওঠে, তবে সে সুখ কাম্য নয় মরিয়ম বেগমের।
তিনি বলে উঠলেন—মনির, যা যা তুই, আমি তোকে ধরে রাখতে চাই না।
মা, তুমি রাগ করেছ?
না, রাগ আমি করিনি করতে পারি না। তোকে আমি পেটে ধরলেও তুই আমার একার সন্তান নস্। শত শত মায়ের ছেলে হয়ে জন্মছিস। তোকে কি আমি ধরে রাখতে পারি।
মা, মাগো। বনহুর মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ছোট্ট শিশুর মত আনন্দধ্বনি করে উঠল।
০৪.
মনিরাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলো বনহুর তার বজরায়। একটা দিকে নিশ্চিত হলো বনহুর। এবার সুফিয়া। পুলিশ সুপার আহমদ সাহেবের আধুনিক কন্যা সুফিয়া। তাকে তার পিতামাতার নিকটে পৌঁছে দিয়ে তবে নিশ্চিত হবে সে। কিন্তু মনিরাকে যত সহজে পৌঁছে দিতে পেরেছে তত সহজ নয় সুফিয়াকে পৌঁছান। অনেক চিন্তা করে তবেই এ কাজ সমাধা করতে হবে। এতদিন পর সুফিয়া যদি সহজভাবে বাড়ি ফিরে যায়, নিশ্চয়ই তাকে সমাজ সহজে গ্রহণ করবে না। পিতামাতার মনেও একটা সন্দেহের দোলা খোঁচা দেবে। হয়তো নিস্পাপ সুফিয়ার জীবনটা ব্যর্থ হয়ে যাবে। সুফিয়াকে শুধু তার পিতামাতার নিকটে পৌঁছানই বড় কাজ নয়—সুফিয়া যে সত্যিই একটা সতী মেয়ে, সে কথাও স্পষ্ট বুঝিয়ে দিতে হবে তাদেরকে।
এ-কথা সুফিয়াই বলেছিল মনিরার কাছে। বলেছিল, মনিরা তুমিতো যাচ্ছ, তোমার স্বামী তোমাকে যাচাই করে নিয়েছেন। সকল সন্দেহ থেকে তুমি মুক্ত। আর আমি, যদিও আমি মা-বাবার নিকটে যাচ্ছি বা যাব কিন্তু তারা কি আর আমাকে আগের মত স্বচ্ছ মন নিয়ে গ্রহণ করতে পারবেন? আমি কেমন করে সবাইকে বুঝাব আমি নিস্পাপ নিষ্কলঙ্ক।
মনিরা সব বলেছিল বনহুরের কাছে, এ কথাও বলেছিল–সুফিয়াকে শুধু পৌঁছে দেবার দায়িত্বই তোমার নয়, ওর জীবনে যেন কোন কলঙ্কের কালিমা লেপন না হয়, একাজও তোমাকে করতে হবে।
কাজেই সুফিয়াকে শুধু পৌঁছে দেওয়াই নয় ওর বিরাট একটা পরিণতি নির্ভর করছে দস্যু বনহুরের ওপর। লোকসমাজ জানে—দস্যু বনহুর শুধু দুর্দান্ত দস্যুই নয়, সে লম্পট নারীহরণকারী।
বনহুর আধুনিক যুবকের বেশে সুফিয়াসহ পুলিশ সুপারের বাড়ির গেটে হাজির হলো।
নতুন ছোট্ট কুইন গাড়িখানা গেটে পৌঁছতেই সেলুট করে সরে দাঁড়ালো পাহারাদারগণ।
গাড়ি-বারান্দায় গাড়ি পৌঁছতেই সুফিয়া নেমে ছুটে গেল অন্দরমহলে। একমাত্র কন্যার অন্তর্ধানে মিঃ আহমদ ও মিসেস আহমদ একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। মিসেস আহমদ একরকম প্রায় শষ্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। সুফিয়া ছুটে গিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে ডাকল—আম্মা! আব্বা!
মুহূর্তে মিঃ আহমদ ও মিসেস আহমদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠল। আকাশের চাঁদ যেন ফিরে পেলেন তাঁরা।
সুফিয়া পিতার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল–আব্বা। আব্বা।
মিঃ আহমদ কন্যাকে সস্নেহে বুকে আঁকড়ে ধরে বললেন মা কোথায় কোথায় গিয়েছিলি?
আব্বা, সব বলব–সব শুনবে। সুফিয়া আবার মায়ের বুকে মুখ লুকায়, কতদিন পর আজ সে মাকে পেয়েছে। সুফিয়া তারপর বলেআব্বা, তুমি বাইরে যাও। আমার রক্ষাকারী যিনি তিনি গাড়ি-বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।
বলছিস কি মা? তাকে গাড়ি-বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিস? চল দেখি–বেরিয়ে যান আহমদ সাহেব।
হঠাৎ সুফিয়ার নজর চলে যায় পিতার বিছানার একপাশে। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকাখানা পড়ে রয়েছে সেখানে। একটা ছবিতে দৃষ্টি পড়তেই বিস্ময়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল সুফিয়া। এ যে মনিরার স্বামীর ছবি! যিনি তাকে এইমাত্র পৌঁছে দিতে এসেছেন। সুফিয়া তাড়াতাড়ি পত্রিকাখানা হাতে তুলে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরল একি! সুফিয়ার চোখ ছানাবড়া হলো।
মিসেস আহমদ বললেন সুফিয়া, তোকে হরণ করার অপরাধে দস্যু বনহুরের নামে
সুফিয়া অস্কুট ধ্বনি করে উঠল–মা!
কি হলো, কি হলো সুফিয়া?
সুফিয়া মায়ের কথার কোন জবাব না দিয়ে ছুটে গেল। কিন্তু কয়েক পা এগুতেই কানে ভেসে এলো পাশের কক্ষে পিতার চাপা কণ্ঠস্বর, ফোনে আলাপ করেছন তিনি। মিঃ হারুন এই মুহূর্তে পুলিশ ফোর্স নিয়ে চলে আসুন। আমার হলঘরে দস্যু বনহুর–এরপর আর শোনার অপেক্ষা করল। ছুটে গেল হলঘরে, কিন্তু একি, হলঘর শূন্য। ব্যস্তভাবে চারদিকে তাকাল সুফিয়া। কই কোথাও তো তিনি নেই। হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল সোফার দিকে। ভাঁজ করা একটা কাগজ পড়ে রয়েছে সোফার ওপর।
