বৃদ্ধ সরকার সাহেব বাইরের যত দেখাশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি না থাকলে আজ বুঝি চৌধুরী বাড়ির অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ত।
মরিয়ম বেগম নিজে কিছুই দেখেন না, দেখার চেষ্টাও করেন না। কত টাকা আসছে, কত টাকা ব্যয় হচ্ছে সব, সরকার সাহেব হিসেব রাখেন। একদিন সরকারের অনুপস্থিতিতে মরিয়ম বেগম কোন কাজে সিন্দুক খুললেন। সিন্দুকের তালা খুলে বেগম সাহেবার চক্ষুস্থির! সিন্দুকে টাকা আর ধরছে না। ব্যাংকেও তাদের প্রচুর টাকা জমা রয়েছে, জানেন তিনি। আবার সিন্দুকেও টাকা রাখার জায়গা নেই
এত টাকা, আনন্দ হবার কথা কিন্তু মরিয়ম বেগমের খুশির বদলে দু’চোখে অশ্রু ভরে উঠেছিল। আছে অনেক কিন্তু খরচ করার লোক নেই।
একদিন মরিয়ম বেগম সরকার সাহেবকে ডেকে বলে দিলেন, আবর্জনাগুলো সিন্দুকে জমা করে রেখে কি হবে সরকার সাহেব, তার চেয়ে কিছু বিলিয়ে দিন দিন-দুঃখীদের মধ্যে যারা না খেয়ে আছে তারা বাঁচবে।
সরকার সাহেব নতমুখে বলেছিল সেদিন—চৌধুরীবাড়ি থেকে কোনদিন কোন দীন-দুঃখী রিক্তহস্তে ফিরে যায় না বেগম সাহেবা। যা দেবার, যা তাদের প্রয়োজন, আমি দিয়ে দেই।
তবে অতসব হলো কি করে?
বেগম সাহেব, এ সংসারে খানেওয়ালা তো মাত্র আপনি আর ঐ চাকর-বাকরের দল। খরচ তো তেমন কিছু হয় না। ড্রাইভারকে মাসে তার পাওনা মিটিয়ে দিচ্ছি। বাগানের ফুলগাছ আর নতুন করে লাগান হয় না, তবু মালীকে তার মাসিক টাকা ঠিকভাবেই বুঝিয়ে দেই।
বুঝেছি, আমার সংসারে ডুমুর ফুল এসেছে।
সত্যি তাই বেগম সাহেবা।
সেদিন রাত হয়ে গেছে। মরিয়ম বেগম নিজের ঘরের দাওয়ায় একটা আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে শুয়েছিলেন। পাশে অনতিদূরে একটা চেয়ারে বসে সরকার সাহেব। সংসার সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা চলছিল। একথা-সে কথার মাঝে রাত বেড়ে আসে।
নবিক এসে বলে-বেগম সাহেবা ঠাণ্ডা পড়ে গেছে, ঘরে চলুন। বাতের ব্যথাটা আবার বেশি হবে ক্ষন।
হবে না হবে না। তোরা আমার জন্য এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন, আমাকে আরও বাঁচিয়ে রাখতে চাস?
সরকার সাহেব বলে উঠলেন–না বেঁচে যে কোন উপায় নেই বেগম সাহেবা-যতদিন আপনার মনির ফিরে আসে ততদিন আপনাকে এ বোঝ বইবার জন্য বেঁচে থাকতেই হবে।
কিন্তু বেঁচে থাকা কি আমার নিজস্ব ইচ্ছা সরকার সাহেব?
যদিও নয়, তবু আপনাকে সাহসে বুক বাঁধতে হবে।
তারপর কি হবে?
মনির ফিরে আসুক।
সে কি কোনদিন মানুষ হয়ে ফিরে আসবে!
আসবে সরকার সাহেবের কথা শেষ হয় না। গম্ভীর মধুময় একটা কষ্ঠস্বর শোনা যায়-মা!
কে—কে–আমার মনি, আমার মনি!
ততক্ষণে বনহুর মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। মনিরা তার পেছনে। মনিরা অস্ফুট আর্তনাদ করে মরিয়ম বেগমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে-মামীমা!
আমার মা মনিরা! কোথায় ছিলি মা এতদিন?
মনিরা মামীর বুকে মুখ গুঁজে ছোট বালিকার মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। এতদিনের জমানো ব্যথা আজ অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে তার দুচোখে।
নকিব এমনভাবে প্রকাশ্যে কোনদিন বনহুরকে দেখেনি। আজ বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল বনহুরের দিকে। খুশিতে নকিবের দু’চোখে আনন্দের বান বয়ে যায়। যেমন মা তেমনি তার সন্তান। তাই তো বেগম সাহেব সর্বদা এমন হা হুতাশ করেন।
মনিরাকে ফিরে পেয়ে বাড়িতে খুশীর ফোয়ারা বইল। ঝি-চাকর সবাই যেন তাদের হারানো ধন ফিরে পেয়েছে।
মরিয়ম বেগম কিছুতেই পুত্রকে ছেড়ে দিলেন না।
রাতে নিজের পাশে বসিয়ে বললেন—মনির, এবার তোর সংসার তুই বুঝে নে। আয় দেখবি আয়-পুত্রের হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন মরিয়ম বেগম সিন্দুকের পাশে। ডালা খুলে বললেন দস্যুতা আর তোকে করতে হবে না। নিয়ে যা, আমাকে রেহাই দে মনির।
মা!
না না, তোর কোন কথাই আমি শুনতে চাই না। বল, তুই আমাকে রেহাই দিবি কি না?
মা, তুমি কি মনে কর আমি অর্থের লালসায় দস্যুবৃত্তি করি?
তা না হলে তুই কি চাস? রক্ত! রক্ত চাস? নে, আমার বুকের রক্ত তুই চুষে নে। আমার বুকের রক্ত নিয়েও যদি তুই ক্ষান্ত হোস। দেয়ালে মাথা ঠুকে চলেন মরিয়ম বেগম।
বনহুর শক্ত হাতে ধরে ফেলল——মা, মা, মাগো।
না, আমি কোন কথাই শুনব না।
মনিরা এতক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখছিল সব। নীরবে দেখা ছাড়া কিইবা করার আছে তার। মনিরা জানে, কোন বাধাই তার স্বামীকে ধরে রাখতে পারে না। বাধা বন্ধনহীন জলস্রোতের মত তার গুতি।
মরিয়ম বেগমের ললাট কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
মায়ের এই দৃশ্য বনহুরকে বিচলিত করে তুলল। মায়ের পদ তলে বসে পড়ে বলল–মা, তুমি আমাকে ক্ষমা করো মা। শত শত অসহায় দীন হীন জনগণ। যারা এখনও তোমার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দিনের পর দিন প্রতীক্ষা করছে। বল কোনটা আমাকে করতে বল? সংসার না দেশ মাতার সেবা?
কেন, দেশ ও দশের সেবা করার কি অন্য কোনো উপায় নেই? কাঁদতে কাঁদতে বললেন মরিয়ম বেগম।
আছে কিন্তু তোমার অর্থে কদিন কুলাবে মা?
তাই বলে তুই অন্যায়ভাবে টাকা সংগ্রহ করে—
মা?
জানি তুই কি বলতে চাস?
মা, তোমার সন্তান কোনদিন অন্যায়ভাবে কারও টাকা কেড়ে নেয়নি, নেবেও না। যাদের অসৎ পথে উপার্জিত অর্থে সিন্দুক কেঁপে ওঠে, তাই আমি হালকা করে দেই। তাদের অপ্রয়োজনীয় অর্থগুলোর সৎগতি করি। এতে তাদেরও কোন ক্ষতি হয় না। আর যারা দিনের পর দিন না খেয়ে তিলে তিলে শুকিয়ে মরছে, যারা লজ্জা নিবারণের জন্য একখণ্ড বস্ত্র সংগ্রহ করতে অক্ষম, যাদের রুক্ষ চুলে মাসের মধ্যে একটি দিন তেল পড়ে না, আমি তাদের হাতে তুলে দেই সেই অর্থ–এতটুকু উপকার যদি হয় তাদের? মা বল, একি আমার অন্যায়?
