উচ্ছ্বসিত আনন্দে কালু খাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দু’হাত প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরল বালক বনহুরকে বুকের মধ্যে।—সাবাস বেটা! সাবাস!
কালু খাঁ যখন বনহুরকে বুকে টেনে আদর করছিল তখন তার একজন অনুচর এসে দাঁড়াল—সর্দার দলবল এসে গেছে।
কালু খাঁ বনহুরকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল, বলল—চল।
যতক্ষণ কালু খাঁ আর বনহুরের লড়াই হচ্ছিল ততক্ষণ একটা পেয়ারা গাছের ডালে পা দুলিয়ে পেয়ারা খাচ্ছিল আর গুরুশিষ্যের খেলা দেখছিল। নূরী। গলায় দুলছিল তার একটা বনফুলের মালা।
কালু খাঁ তার অনুচরদের সঙ্গে চলে যেতেই নূরী লাফ দিকে গাছ থেকে নেমে ছুটে এলো বনহুরের পাশে, তৃপ্তির হাসিতে তার মুখ উজ্জ্বল। নিজের গলা থেকে মালাটা খুলে নিয়ে পরিয়ে দিল বনহুরের গলায়—হুর তোমার জয় হয়েছে—সে জন্য এটা আমি তোমাকে উপহার দিলাম।
বনহুর নূরীর দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর মালাটা নেড়ে দেখল।
এমনি আরও কত কথা, কত দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল বনহুরের চোখের সামনে।
ঝর্ণার পানিতে সাঁতার কাটছিল বনহুর ও নূরী।
কিশোর বনহুর আর কিশোরী নূরী। উচ্ছল হাসিতে মেতে উঠেছে দু’জন। সাঁতার কাটতে কাটতে এ-ওর দিকে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছিল। তাদের পাশে নদীর বুকে সাঁতার কাটছিল শুভ্র রাজহংসীর দল। হঠাৎ একটা বাচ্চা হাঁস ভেসে চলে গিয়েছিল স্রোতের টানে। নূরী হাঁসটাকে ধরার জন্য এগিয়ে যায়, কিন্তু সে নিজেও স্রোতের মুখে পড়ে হাবুডুবু খায়। এই ডুবে যায়, আর কি!
বনহুর লক্ষ্য করে দ্রুত এগিয়ে গেল। প্রখর স্রোত ধারায় অতি কষ্টে নূরীকে সেদিন বাঁচিয়ে নিল বনহুর। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে নূরীর আনন্দ আর ধরে না। কি দিয়ে যে সে বনহুরকে কৃতজ্ঞতা জানাবে। দু’হাতে বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরে নিস্পাপ নূরী দুটো চুম্বনরেখা এঁকে দিয়েছিল ওর গণ্ডে ৭ হেসে বলেছিল নূরী আমার জীবনের বিনিময়ে কি দেব তোমাকে তাই–
নূরীর স্বাভাবিক স্বচ্ছ হাসির সঙ্গে সেদিন তাল মিলিয়ে হেসেছিল বনহুর। আজ বারবার সেই দিনগুলোর স্মৃতি ভেসে উঠতে লাগল বনহুরের মানসপটে।
নূরীর জন্য আজ বনহুরের হৃদয় হাহাকার করে কেঁদে উঠল। মনিরার ঘুমন্ত মাথাটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখল নিজের বালিশের ওপর। তারপর উঠে দাঁড়াল, অতি সন্তর্পণে ক্যাবিনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে।
জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন সমস্ত বজরাখানা।
কয়েকজন পাহারাদার নীরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল। মাঝিদের দাড়ের ঝুপঝাপ শব্দ হচ্ছে।
বনহুর বজরার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল, অদূরে দাঁড়িয়ে রহমান। গুলিভরা রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছে।
বনহুর ডাকল—রহমান!
রহমান এগিয়ে এলো অন্ধকারে—সর্দার!
তাদের অলক্ষ্যে অদূরে অন্ধকারে এসে দাঁড়াল একটা ছায়ামূর্তি। নিঃশব্দে ওদের কথাবার্তা শুনতে লাগলো।
বনহুর বলছে-নূরী কি সত্যই বেঁচে নেই রহমান।
ঐ হিংস্র জীবজন্তু ভরা ভয়ংকর জংগলে বেঁচে না থাকাই স্বাভাবিক।
কিন্তু আমার মন বলছে সে বেঁচে আছে।
কিন্তু গোটা বন তো আমরা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি সর্দার?
এমন কোন জায়গায় সে আছে যেখানে আমরা যেতে পারিনি বা যাইনি।
হাঁ তা হতে পারে সর্দার।
রহমান!
বলুন সর্দার।
আমরা সেই বন ছেড়ে কতদূর এসেছি বলতে পার?
পারি সর্দার। দশ মাইলের বেশি হবে।
দশ মাইল!
তারও বেশি হবে।
ভোর হলে আবার আমরা ফিরে যাব।
কিন্তু তা সম্ভব নয়।
কেন?
বহুদিন সবাই বাড়িছাড়া, মাঝিরা কেউ আর ফিরে যেতে চাইবে না।
আমার হুকুম, বজরা ফিরাতেই হবে।
সর্দার!
হাঁ রহমান।
নিজের ক্যাবিনে প্রবেশ করতেই চমকে উঠল বনহুর, মনিরা নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে।
বনহুর ফিরে তাকাতেই মনিরা দৃঢ়কণ্ঠে বললনা, এ বজরা আর ফিরবে না।
বনহুর অস্ফুট কণ্ঠে বলল—মনিরা!
সবাই তোমার দাপটে ভীত হতে পারে, কিন্তু আমি নই, তোমরা সবাই ফিরে যেতে পার কিন্তু আমাকে এই মাঝনদীতে নামিয়ে দিয়ে যেতে হবে।
মনিরা!
হাঁ। আমি শপথ করেছি, এই নদী থেকে আমি কিছুতেই পেছনে ফিরে যাব না। আমার জীবনের সব মুছে নিয়ে গিয়েছিল ঐ সিন্ধি নদী, ঐ মনসা-ঐ যোগিনী নদী। না, না, আমাকে আজ তোমরা পেছনে নিয়ে যেতে পারবে না। হয় মনিরাকে বিসর্জন দেবে, নয় নূরীকে।
মনিরা!
সব আমি সইতে পারি কিন্ত আকুলভাবে কেঁদে ওঠে মনিরা।
বনহুর এ দৃশ্য সহ্য করতে পারে না। দস্যুপ্রাণ হলেও মনিরার ব্যথা তাকে অস্থির করে তোলে, এগিয়ে গিয়ে মনিরাকে টেনে নেয় কাছে।
মনিরা স্বামীর প্রশস্ত বুকে মুখ লুকিয়ে উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে ওঠে—জান, তোমার জন্য আজ আমি সর্বহারা। পিতা-মাতা, মামা-মামী, আত্মীয়স্বজন, আমার একমাত্র নয়নের মনি নূরকেও আমি হারিয়েছি শুধু তোমার জন্য–শুধু তোমার জন্য—আর আমি কোন ব্যথা সহ্য করতে পারব না। এই নদীতে নিজেকে সঁপে দিয়ে তোমাকে আমি মুক্তি দেবো। যাও, যেখানে খুশি চলে যেও, কেউ থাকবে না তোমাকে বাধা দেবার জন্য।
বনহুর গভীর আবেগে মনিরাকে টেনে নিল বুকের মধ্যে। কোন কথা বলতে পারল না সে।
কেঁদে কেঁদে মরিয়ম বেগম শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। আগে যা একটু সংসার দেখতেন এখন তাও দেখেন না। ঝি-চাকর নিজেরাই যতটুকু পারে গুছিয়ে নিয়ে করে। নকিব পুরোন চাকর–সেই মাতব্বর হয়ে সবাইকে চালনা করে, আদর করে।
