বনহুর আর রহমান বনে বনে আরও সন্ধান করল, কিন্তু নূরীর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
রহমান লক্ষ্য করল, তার সর্দারকে আজ বড় বিষণ্ণ, বড়ই উদাসীন মনে হচ্ছে। নূরীর ব্যথা তাকে অস্থির করে তুলেছে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো এক সময়!
ঘন বনের মধ্যে চারদিক থেকে শোনা যাচ্ছে হিংস্র জন্তুর গর্জন। রহমান বলল—সর্দার!
জানি তুমি কি বলতে চাচ্ছ। কিন্তু নূরীকে এই গহন বনে একা রেখে আমি যাব কোন্ প্রাণে?
সর্দার, রাত হয়ে আসছে। এখানে বিলম্ব করা মোটেই উচিত হবে না। নূরীর সন্ধান করে তাকে পাওয়া এখন দুরাশা।
হাঁ, দুরাশাই বটে। গহন বন। অন্ধকার রাত। কোথায় আমি তাকে খুঁজব রহমান?
খুঁজে আর ফল হবে না সর্দার। ওর অদৃষ্টে যা ছিল তাই হয়ে গেছে।
নূরী তবে নেই বলতে চাও?
না, কারণ এই হিংস্র জন্তু ভরা গহন বনে তার বেঁচে থাকাটা অসম্ভব সর্দার।
রহমান!
হাঁ সর্দার, নূরী আর বেঁচে নেই।
বনহুরের মুখমণ্ডল সন্ধ্যার অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা না গেলেও এটা বেশ বুঝতে পারল রহমান, তার সুন্দর দীপ্ত মুখমণ্ডল কাল হয়ে উঠেছে। সর্দার নূরীকে কতখানি ভালবাসে, রহমান হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে অনুভব করল।
বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে নিজেকে সংযত করে নিল বনহুর। তারপর বলল। চল রহমান।
সর্দার।
হাঁ চল, আর বিলম্ব করে লাভ নেই।
বনহুরের প্রতীক্ষায় মনিরা ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া বজরার সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মন নিয়ে অপেক্ষা করছিল সর্দারের। সন্ধ্যা ঘনিয়ে যখন রাতের অন্ধকার নেমে এলো তখন সবাই হতাশ হয়ে পড়ল। এই অজানাঅচেনা গহন বনে শুধুমাত্র দুটি প্রাণী কি করে এতক্ষণ হিংস্র জন্তুর কবল থেকে বাঁচতে পারে।
মনিরা কায়মনে খোদাকে স্মরণ করতে লাগল। মনিরার ব্যথাকরুণ অবস্থা দেখে সুফিয়ার চোখেও পানি এলো। সান্ত্বনা দিতে গেল, কিন্তু তার কণ্ঠও রোধ হয়ে এলো? সত্যি যদি আর ওর স্বামী ফিরে না আসে।
কিন্তু যখন বনহুর বজরায় ফিরে এলো তখন দু’টি বজরার সব লোকই খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ল। কিন্তু নূরী ফিরে না আসায় সবাই মর্মাহত হলো।
ছুটে এলো মনিরা আর সুফিয়া।
সুফিয়া থমকে দাঁড়াল, আজ প্রথম সে বনহুরকে কাল ড্রেসে সজ্জিত দেখল—অপরূপ সুন্দর লাগছে বনহুরকে। সুফিয়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল বনহুরের সুন্দর মলিন-বিষণ্ণ মুখখানার দিকে।
মনিরা ছুটে গিয়ে বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরল-কেন তুমি এত বিলম্ব করলে?
বনহুর মনিরার প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারল না। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেল সে অতি সাবধানে।
স্বামীর মুখোভাব লক্ষ্য করে মনিরার হৃদয় গুমড়ে কেঁদে উঠল। কি করে ঐ মুখে হাসি ফুটাবে ভাবতে লাগল সে।
সুফিয়া ধীরে ধীরে সরে পড়ল সেখান থেকে।
এ সময় এখানে থাকা তার উচিত হবে না।
বেশ কিছুক্ষণ মৌন থাকার পর বলল বনহুর—নূরীকে খুজে পাওয়া গেল।
মনিরা হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল—সে চলে গিয়েছিল কেন?
জানি না।
আচ্ছা, একটা কথা তুমি আমায় বলবে?
বল।
ওর সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ…
মনিরার কথা শেষ হয় না, রহমান এসে দাঁড়ায় দরজার বাইরে সর্দার!
বনহুর বলে এসো।
রহমান ক্যাবিনে প্রবেশ করে বললসর্দার, যা হবার হয়ে গেছে। এখানে বিলম্ব করা আর উচিত হবে না।
একথা আমিও চিন্তা করেছি রহমান, বজরা ছাড়ার আদেশ দেব কিনা ভাবছি।
সর্দার, একে অজানা-অচেনা দেশ, তারপর এসব বন রাত্রিকালে আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। নানা হিংস্র জীবজন্তুর আবির্ভাব ঘটা অস্বাভাবিক নয়।
আচ্ছা, তুমি বজরা ছাড়তে বল।
রহমান কুর্ণিশ জানিয়ে বেরিয়ে যায়।
মনিরা তাকায় বনহুরের মুখের দিকে। সে মুখ যেন বিষাদে ভরা। মুক্ত জানালা দিয়ে দূরে অন্ধকারে নদীবক্ষে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বনহুর। বুকের মধ্যে তার একটা প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যাচ্ছে, এটা বুঝতে কষ্ট হলো না মনিরার।
মনিরা কোন কথা বলতে পারল না বা বলার সাহস পেল না, এ সময় বনহুরকে বিরক্ত করতেও তার মন চাইনা।
মনিরা চলে যাবার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল, বনহুর ডাকলমনিরা!
মনিরা থমকে দাঁড়াল। কোন কথা বলল না। বনহুর মনিরাকে টেনে নিল কাছে, বলল—তুমি কি প্রশ্ন করেছিলে না?
না, কিছু না! আমি যাই এখন।
মনিরা, তুমি যেও না। আরও ঘনিষ্ঠভাবে মনিরাকে টেনে নিল বুকের মধ্যে বনহুর।
আগে এবং পেছনে দু’খানা বজরা এগিয়ে চলেছে।
মনসা নদী পেরিয়ে যোগিনী নদীর বুক চিরে এগুচ্ছে বনহুরের বজরা দু’খানা।
স্বামীর বুকে মাথা রেখে মনিরা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। দু’ফোঁটা অশ্রু তখনও চিকচিক করছে মনিরার চোখের কোণায়। মনিরা ঘুমিয়ে গেলেও দস্যু বনহুরের চোখে ঘুম নেই। ধীরে ধীরে মনিরার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সে? এখনও তার হাতখানা সম্পূর্ণ থেমে যায়নি। অতি মৃদু সঞ্চারণ হচ্ছিল মনিরার চুলে! বনহুর গভীর চিন্তায় মগ্ন। ফিরে গেছে সে অতীতে তলিয়ে যাওয়া একটা দিনে–বালক বনহুর অস্ত্রশিক্ষা করছিল দস্যু কালু খাঁর কাছে। অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে অস্ত্রচালনা করেছিল বনহুর। বৃদ্ধ কালু খাঁর দু’চোখে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্ন। হাস্য-উচ্ছলতায় মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত, মাঝে মাঝে অস্কুটধ্বনি করছে সে-সাবাস! সাবাস বেটা! সাবাস!
বালক বনহুরের শিরায় শিরায় তখন উষ্ণ রক্তের প্রবাহ, হৃদয়ে অফুরন্ত উন্মাদনা। চোখমুখ প্রতিভাদীপ্ত, তীব্র উত্তেজিত। অস্ত্রশিক্ষার প্রচণ্ড পিপাসা তাকে উম্মাদ করে তুলেছে। বালক বনহুরের হাতের প্রচণ্ড আঘাতে এক সময় কালু খাঁর অস্ত্র ঝন ঝন করে খসে পড়ল।
