রঘু নতমস্তকে কুর্ণিশ জানিয়ে বলল–দস্যু দুহিতা।
দস্যু দুহিতা! কি রকম?
এ পুরুষ নয়-নারী।
তা এখানে কি করে এলো?
পথ ভুল করে আন্দামানের বনে এসে হাজির হয়েছিল।
আর তুমি তাকে ধরে এনেছ?
রঘু মস্তক অবনত করে রইল।
ভীম সেন পুনরায় হুংকার ছাড়ল—তা ওর কাছে কি পেলে?
রঘু এবারও নত মস্তকে রইল কোন জবাব দিল না।
ভীম সেন বজ্রকঠিন কণ্ঠে বলল—জান এখানে নারীর প্রবেশ নিষেধ?
চোখ তুলে তাকাল রঘু, নিজের ভুল বুঝতে পেরে হকচকিয়ে গেল, বললো—আমার কোন দোষ নেই সর্দার। এই মেয়েটি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিল।
তাই তুমি নিয়ে এলে? এত সাহস তোমার! এ জন্য তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো।
রঘু আর্তনাদ করে উঠল—সর্দার!
নূরী তখন কেমন যেন সংজ্ঞাহারার মত হয়ে পড়েছে। একি হলো! রঘু ডাকু তার জন্য মৃত্যুবরণ করবে। একটা প্রাণ যাবে তার জন্য?
নূরী নিশ্চুপ ছিল এতক্ষণ, হঠাৎ বলে উঠল-বাবা, আমি নারী হলেও তোমাদের কোন অন্যায় বা ক্ষতি করব না। আমাকে তুমি মেয়ে বলেই জেন।
হঠাৎ নূরীর কণ্ঠে বাবা সম্বোধন ভীম সেনের কঠিন হৃদয়ে আলোড়ন জাগাল। নিঃসন্তান ভীম সেন জীবনে কোনদিন বাবা ডাক শুনেনি। আজ এ ডাক তাকে অভিভূত করে ফেলল। কিছুক্ষণ ভীমসেন নির্বাক নয়নে তাকিয়ে রইল নূরীর দিকে–শিশু মনি তার কোলে, ক্ষুধায় কাতর মনি ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ।
ভীম সেন এবার বলে উঠল—বাবা! কে তোমার বাবা?
তুমি।
না, আমার কোন সন্তান নেই।
নূরী করুণ কণ্ঠে বলল আমি তোমার সন্তান, দয়া কর বাবা, আমার জন্য রঘুকে হত্যা কর না। তার চেয়ে তুমি আমাকেই হত্যা কর।
ভীম সেন কি যেন ভাবতে লাগল। ডাকাত হলেও সে তো মানুষ! তার দেহেও তো রক্ত-মাংস রয়েছে। নূরীর কথাগুলো ভীম সেনের অন্তরে সাড়া জাগাল।
ভীম সেন চিন্তা করছে।
রঘু মৃত্যুভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে।
নূরী ব্যাকুল আগ্রহে তাকিয়ে আছে ভীম সেনের মুখের দিকে। দু’চোখে তার করুণ অসহায় চাহনি। নূরীর কোলে ঘুমন্ত শিশু মনি।
ভীম সেন এবার বলে উঠল—মা, আমি তোমার কথায় রঘুকে ক্ষমা করে দিলাম। জীবনে ভীম সেন কাউকে ক্ষমা করেনি, এই তার প্রথম ক্ষমা।
রঘু মুখ তুলে তাকাল।
নূরীর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে জেগে উঠলো মনি। ক্ষুধায় কেঁদে উঠল সে।
ভীম সেন কোনদিন শিশু দেখেনি, মনির অপরূপ চেহারা তাকে মেহকাতর করে তুলল। বলল ভীম সেন-রঘু, ওদের নিয়ে যাও। শিশুর ক্ষুধা পেয়েছে, খাবার ব্যবস্থা কর।
রঘুর দু’চোখে আনন্দের ছটা ফুটে উঠল। সর্দারকে রঘু জানে তার কঠিন আদেশের নড়চড় নেই। নিশ্চিত মৃত্যু থেকে মুক্তি পেল রঘু! নূরীকে লক্ষ্য করে বলল সে–চলো।
রঘুর পেছনে পা বাড়াল নূরী।
এই নির্জন বনে নিঃসঙ্গ অসহায় অবস্থায় যে কোন আশ্রয়ই তার কাছে খোদার দান বলে মনে হলো।
০৩.
গোটা বন তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বনহুর ও রহমান নূরী আর শিশু মনিকে পেল না। শক্তিমান বনহুর আর বলিষ্ঠ হৃদয় রহমান এক সময়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
বনহুরের সুন্দর মুখমণ্ডল বিষণ্ণ, মলিন হলো। ললাটে ফুটে উঠল গভীর চিন্তারেখা—তবে সে গেল কোথায়? বাঘ-ভালুকে কি তাকে খেয়ে ফেলেছে? কিন্তু তাহলেও তার জামাকাপড়ের কোন চিহ্ন পাওয়া যেত। রক্তমাংসের দাগ দেখতে পেত। নূরী কি তবে বেঁচেই আছে। কিন্তু কোথায় সে অদৃশ্য হয়েছে? ক্লান্তকণ্ঠে বলল বনহুর রহমান, নূরীকে বুঝি আর আমরা ফিরে পাব না!
রহমান নতমস্তকে ব্যথাভরা কণ্ঠে বলল সর্দার, হতাশ হবার কিছু নেই। নূরী সাধারণ মেয়ে নয়—সে দস্যু কন্যা, তার ধমনিতে প্রবাহিত হচ্ছে দস্যুরক্ত। এত সহজে সে নিজেকে বিলীন হতে দেবে না।
কিন্তু এই গহন বনে, এক, নিরস্ত্র, একটি শিশু তার কোলে, কি করে সে নিজেকে রক্ষা করবে বা করতে পারে? এ বনে নানা হিংস্র জন্তুর আনাগোনা রয়েছে। বনহুরের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ভীষণ গর্জন ভেসে এলো—বাঘের ভীম গর্জন।
বনহুর আর রহমান তটস্তভাবে উঠে দাঁড়াল। সামনে ঝোপটার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠল, রহমানকে লক্ষ্য করে বলল বনহুর——ঐ দেখ।
রহমান সেদিকে চেয়ে দেখল-একটা ভয়ঙ্কর বিরাট বাঘিনী ঝোপটার পাশে শুয়ে আছে। পাশে কয়েকটা বাচ্চা খেলা করছে।
রহমান মুহূর্তে রাইফেল উদ্যত করে ধরল।
বনহুর রহমানের রাইফেলের মাথাটা হাত দিয়ে নত করে দিয়ে বলল, মের না রহমান।
সেকি সর্দার। মনে মনে আশ্চর্য হলো রহমান। যে সর্দার মানুষের বুকে রাইফেল ছুড়তে দ্বিধাবোধ করে না, আজ সেই সর্দার একটা হিংস্র জন্তুর বুকে গুলি ছুড়তে বারণ করছে? অবাক না হয়ে পারল না রহমান।
বনহুর রহমানের মনোভাব বুঝতে পেরে বলল কি হবে ওকে মেরে। অযথা কতগুলো অসহায় বাচ্চার কষ্ট হবে।
রহমান কোন জবাব দিতে পারল না।
বনহুর বলল-চল রহমান, সাবধানে এখান থেকে সরে পড়ি। এখন বাঘিনী তার বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দ উপভোগ করছে। হাঁ, একেই বলে মায়ের প্রাণ।
বনহুর আর রহমান অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলল। কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারল না। একটা বন্য শুকর সুতীক্ষ্ণ ধারাল দাঁত বিস্তার করে তীর বেগে ছুটে এলো।
মুহূর্তে রহমানকে ঠেলে দিয়ে বনহুর রাইফেল উদ্যত করে গুলি করল—অব্যর্থ লক্ষ্য বনহুরের, শুকর ছুটে আসতে গিয়ে গুলির আঘাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। পড়ে গিয়ে আবার উঠতে গেল কিন্তু ততক্ষণে বনহুরের রাইফেলের আর একটা গুলি শুকরের পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে চলে গেল। আর সে উঠতে পারল না।
