মনিকে কোলে করে নূরী ঝর্ণার পাশে এসে দাঁড়াল। নির্মল স্বচ্ছ জলধারা। মনিকে হাঁটুর উপরে বসিয়ে নূরী ঝর্ণার পানি দক্ষিণ হাতে তুলে ওর মুখে ধরল। পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েছিল মনি, প্রাণভরে পানি খেল। নূরী নিজেও ঝর্ণার শীতল স্বচ্ছ পানি খেয়ে ক্লান্তি আর তৃষ্ণা দূর করলো।
পানি পান শেষ করেই ফিরে দাঁড়াল নূরী, সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে চমকে উঠল। একদল ভীমকায় লোক তার চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। সকলের হাতেই শরকি, বল্লম আর তীর ধনুক।
নূরীর মুখমণ্ডল মুহূর্তে ফ্যাকাশে বিবর্ণ হলো। ওরা যে কোন দস্যুদল এটা সহজেই অনুমান করে নিল নূরী। কারণ এ পোশাক এবং এ ধরনের লোকজন তার অপরিচিত নয়। শিশু মনিকে বুকে আঁকড়ে ধরে ভীতকণ্ঠে বলল—তোমরা কে? কি চাও?
একজন ঐ দলের সর্দার বা দলপতি হবে সে এগিয়ে এলো নূরীর পাশে, নূরীর শরীরে পুরুষের ড্রেস অথচ তার নারী কণ্ঠ শুনে কিছুটা আশ্চর্য হলো, বলল, তুমি কে?
নূরী চট করে বলল—আমি দস্যু দুহিতা।
লোকটার চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। অচেনা-অজানা একটা গহন বনের বাসিন্দা হলেও দলপতি যে তার কথাটার মর্ম বুঝতে পারল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। মনে মনে খুশিই হলো দলপতি, বলল এবারদস্যু দুহিতা মানে দস্যুকন্যা।
হাঁ, আমি দস্যুকন্যা।
এ বনে কোথা থেকে এলে তুমি?
পথ ভুলে।
ও তোমার কে?
আমার….আমার সন্তান।
এবার দলপতি কঠিন কণ্ঠে বলল-জান এ বনের একচ্ছত্র অধিপতি ডাকু ভীম সেন।
নূরী হেসে নিজেকে স্বচ্ছ করে নিতে চাইল, ভয় পেলে এখন তার চলবে। সেও যে সে মেয়ে নয়, দস্যুরক্ত তার ধমনিতেও প্রবাহিত। গম্ভীর কণ্ঠে বলল সে–তুমিই বুঝি ডাকু ভীম সেন?
না, আমরা ডাকু ভীম সেনের অনুচর। আমি এই দলের নেতা।
ও, তুমি ভীম সেন নও। হাসবার চেষ্টা করল নূরী, বলল তোমাদের দলপতির কাছে নিয়ে যাবে আমাকে?
যে এতক্ষণ নূরীর সঙ্গে আলাপ করছিল, সে ভীম সেনের প্রধান অনুচর রঘু ডাকু।
রঘু বলল—তোমার সাহস দেখে আমি মুগ্ধ হলাম দস্যু দুহিতা। যে ভীম সেনের নাম শুনে মানুষের হৃদকম্প শুরু হয়, সমগ্র আন্দামান রাজ্যের মানুষ যার ভয়ে তটস্থ, সেই ভীম সেনের সঙ্গে তুমি সেচ্ছায় দেখা করতে চাও? সত্যি তুমি সাহসী রমণী। তারপর নিজের দলের দিকে তাকিয়ে বলল রঘু ডাকু—একে সঙ্গে করে নিয়ে চলো আমাদের আখড়ায়।
নূরী ভেতরে ভেতরে যে, ভীত না হয়েছে তা নয়, কিন্তু মুখোভাবে সে ভয়ের চিহ্ন ফুটতে দিল না ডাকাত দলের সঙ্গে এগিয়ে চলল নূরী। পুরুষদের তালে তালে পা ফেলে এগুতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তার, তবু মনিকে বুকে আঁকড়ে ধরে চলতে লাগল।
কত বন, জঙ্গল আর ছোট ছোট নদীর মত ঝর্ণা পেরিয়ে এগুলো তারা।
গহন বন ছাড়িয়ে তারা একটা পাহাড়িয়া জঙ্গলায় এসে পৌঁছল। সন্ধ্যার ঝাপসা আলো তখন পৃথিবীর বুকে নববধুর মত ঘোমটা টেনে দিয়েছে।
মস্তবড় একটা গুহার সামনে এসে দাঁড়াল রঘু ডাকু ও তার দলবল।
রঘু তিন বার হাতে তালি দিল।
সঙ্গে সঙ্গে মেঘ গর্জনের মত একটা শব্দ হলো। নূরী বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল সম্মুখস্থ গুহার মুখের প্রকাণ্ড পাথরখণ্ড ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। পাহাড়টা যেন কোন অদৃশ্য ইংগিতে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
অল্পক্ষণেই গুহার মুখ একটা সুড়ঙ্গপথে পরিণত হলো। রঘু তার দলবল নিয়ে প্রবেশ করল সুরঙ্গপথে। নূরীও রয়েছে তার সঙ্গে।
দস্যু বনহুরের সঙ্গিনী নূরী, নিজেও সে দস্যু দুহিতা—কিন্তু এসব যেন তার কাছে নিজেদের আস্তানার চেয়ে আরও ভয়ঙ্কর বলে মনে হলো।
নূরী রঘু ডাকুর সঙ্গে এগুচ্ছে।
পেছনে ডাকাতদল সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে আসছে।
নূরীর হৃদয়ে ভয়-ভীতি আর দুশ্চিন্তা জোট পাকাচ্ছিল। সে নারী-এতগুলো পুরুষের সঙ্গে একা। না এসে কোন উপায় ছিল না, জোর করেই ওকে ধরে আনত, কাজেই স্বেচ্ছায় এসেছে সে। এখন কৌশলে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হবে। নারী হলেও সে অন্যান্য মেয়ের মত দুর্বল প্রাণ নয় এত সহজেই ভীত হলে তার চলবে কেন?–
নূরী মনিকে কোলে নিয়ে রঘু ডাকুর সঙ্গে এগুচ্ছে।
পাথর কেটে যেন সুড়ঙ্গপথটা তৈরি করা হয়েছে।
কিছুটা এগুনোর পর রঘুর অনুচরগণ দু’দলে বিভক্ত হয়ে সুড়ঙ্গের দু’পাশে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। নূরী অবাক হয়ে তাকাল পেছনে।
রঘু ডাকু বলল—এরপর আর যাওয়া চলবে না, শুধু তুমি চলো আমার সঙ্গে।
নূরীর মনে কেমন একটা ভয় দোলা দিয়ে গেল। যা হোক, এতগুলো লোক থাকায় তবু একটু সাহস ছিল তার মনে। কেমন যেন দুর্গম পথ। গাঢ় অন্ধকার কিছুটা দূরীভূত করেছে সুড়ঙ্গের মাঝে মাঝে জ্বলন্ত মশালের আলো।
রঘু ডাকু আর নূরী, কোলে তার শিশু মনি, দু’জনেই এগুচ্ছে।
বেশ কিছুটা চলার পর সামনে তাকিয়ে হঠাৎ চমকে, শিউরে উঠল নূরী। সুউচ্চ পাথরাসনে ভয়ঙ্কর জমকালো একটা লোক বসে রয়েছে। তার দু’পাশে দু’জন ঐ রকম চেহারা লোক সুতীক্ষ্ণধার বল্লাম হাতে দণ্ডায়মান।
দেয়ালের দু’পাশে দুটো মশাল দপ দপ করে জ্বলছে। মশালের আলোতে ডাকাত দলপতি ভীম সেনের জমকালো চেহরার জমাট পাথরের মূর্তি বলেই মনে হচ্ছে। মাথায় কঁকড়া চুল। মস্ত একজোড়া গোঁফ। চোখ দুটো যেন আগুনের ভাটার মত জ্বলছে।
নূরী দস্যু দুহিতা হলেও এই ভীষণ চেহারার লোকটার সামনে ভীত হয়ে পড়ল।
রঘু ডাকু কিছু বলার পূর্বেই গর্জন করে উঠল ভীম সেন–এ কে?
