সুফিয়ার কণ্ঠস্বরে মনিরার কান্নার বেগ যেন আরও বেড়ে গেল। বাঁধভাঙা স্রোতধারার মত বাধা বন্ধনহীনভাবে নেমে এলো মনিরার অশ্রু।
সুফিয়া মনিরার পাশে এসে বসল, সস্নেহে পিঠে হাত রেখে ডাকল–মনিরা, কি হয়েছে বোন?
মনিরা কি বলবে, বলার মত কিছুই যে নেই। অন্তরে যে না পাওয়ার বহ্নিজ্বালা অহরহ ধিকধিক করে জ্বলছে তা বলার নয়। নারীর স্বামীই যে একমাত্র সম্বল।
সুফিয়া পুনরায় জিজ্ঞেস করলমনিরা কি হয়েছে তোমার ভাইজানই বা কোথায়?
মনিরা এবার মুখ তুলে তাকাল। দু’চোখে তার অশ্রুধারা ঝরে পড়ছে। অন্তরের ব্যথা পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে তার কোমল সুন্দর মুখমণ্ডলে।
কতদিন কত সাধনার, কত প্রতীক্ষার পর দেখা পেয়েছিল মনিরা তার অবাধ্য দেবতার। পেয়েছিল ক্ষণিকের জন্য সমস্ত অন্তরের অনুভূতি দিয়ে তাকে উপলব্ধি করার সময়ও পায়নি মনিরা! যতই পেয়েছে ততই ভয় হয়েছে এই বুঝি হারাই।
মনিরার দুশ্চিন্তা সত্যে পরিণত হলো—রাত্রি অবসানের সঙ্গে সঙ্গেই এক মহাবিচ্ছেদের দাবানল তার অন্তরকে জ্বালিয়ে দিল অগ্নিদগ্ধ লৌহ-শলাকার মত। সেই বিচ্ছেদের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠল বুকের ভেতরটা। এই অজানা-অচেনা গহন বনের কোণে অশরীরী আত্মার অদৃশ্য হাতছানি তার সমস্ত কামনাকে চূর্ণ করে দিল! নূরী-নূরীই তার সমস্ত পাওয়াকে মুছে নিয়ে চলে গেছে।
মনিরা বলল—সে চলে গেছে!
সুফিয়ার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল চলে গেছে! ভাই জান গেছে কোথায়, কেন?
মনিরা সোজা হয়ে বসে বলল—ঐ যুবকবেশী নারী অন্য কেউ নয়—সে নূরী। নূরী চলে গেছে, তারই সন্ধানে গেছে সে।
নূরী! কে এই নারী?
ওর পরিচয় আমি জানি না, সুফিয়া। এইটুকু জানি, সে আমার স্বামীকে ভালবাসে।
ভাইজানকে সে ভালবাসে।
হাঁ।
কিন্তু সে যে তোমার।
আমার স্বামী, কিন্তু তাকে ধরে রাখার সামর্থ আমার নেই। ধূমকেতুর মত ক্ষণিকের জন্য তাকে কাছে পাই, আবার কোথায় মিলিয়ে যায় কোন স্বপ্নরাজ্যের মায়াময় জগতে। সুফিয়া, আমি বড় হতভাগিনী।
সুফিয়া মনিরাকে নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে। সেও তো নারী নারীর হৃদয়ের ব্যথা তার অন্তরেও নাড়া দেয়। যদিও সে স্বামী কি জিনিস আজও তা উপলব্ধি করেনি, কিন্তু বুঝতে তো পারে। মনিরার অন্তরের ব্যথা তাই সুফিয়ার মনে এক অভিনব দোলা জাগায়। বলে সে মনিরা, একদিন, তোমার পাওয়া সার্থক হবে। আর সে চলে যাবে না তোমার পাশ থেকে,
সেদিন তুমি ওকে অক্টোপাশের মত সর্বক্ষণ ঘিরে থেক।
কিন্তু সেদিন বুঝি কোনদিন আমার জীবনে আসবে না, আমি বুঝি কোনদিন ওকে তেমন করে পাব না সুফিয়া।
ছিঃ এত অবুঝ হলে কেন মনিরা? সে গেছে হয়তো এক্ষুণি ফিরে আসবে। তছাড়া ঐ যে নূরী না কে বললে, এলোই বা সে তার সঙ্গে, কিন্তু তার কি অধিকার আছে তোমার স্বামীর উপর? সে হয়তো তাকে ভালবাসে, তাই বলে স্ত্রীর দাবী নিয়ে কোন সময় তার পাশে এসে দাঁড়াতে পারবে না।
সুফিয়ার কথায় মনিরা সান্ত্বনা খুঁজে পায় না, একটা অজ্ঞাত ব্যথা গুমরে ফেরে তার মনের কোণে। মনিরা জানে নূরী বনহুরের আস্তানায় থাকে। বনহুরকে নিজের করে পাবার জন্য নূরীর চেষ্টার ত্রুটি নেই। নানাভাবে নানা কৌশলে বনহুরকে সে বশীভূত করার চেষ্টা করছে। বনহুর মুখে না বললেও সে দিন কান্দাই বনের পোড়োবাড়ির ঘটনাতেই বেশ অনুমান করে নিয়েছে যে নূরী বনহুরের জন্য উন্মাদ। নিশ্চয়ই নূরী ওকে পাবার জন্য সদা ব্যাকুল থাকে। পুরুষ কতক্ষণ সংযত রাখতে সক্ষম হবে? তবে কি নূরীর কোলে শিশুসন্তান সে তারই…স্বামীর না না, এই চিন্তা তাকে পাগল করে ফেলবে। মনিরা সব বলতে পারে কিন্তু, স্বামীর সম্বন্ধে এ কথাটা কি করে সুফিয়ার কাছে বলবে? অসম্ভব।
সুফিয়া বলে উঠল-কোন চিন্তা করো না। তোমার স্বামী অদ্ভুত শক্তিশালী পুরুষ। তার কাছে বন্য জন্তুর শক্তিও হার মানে। নিশ্চয়ই এসে যাবে। চলো আমরা কক্ষে যাই।
উঠে দাঁড়ায় মনিরা, আঁচলে অশ্রু মুছে বলে চলো।
০২.
গহন বন।
চারদিকে হিংস্র জন্তুর গর্জন আর ভয়াবহ থমথমে ভাব। নূরী শিশুমনিকে বুকে আঁকড়ে ধরে এগুচ্ছে। কোন বাধাবিঘ্নই আজ তার পথ রোধ করতে সক্ষম হচ্ছে না।
সূর্য প্রায় মাথার ওপর।
বেলা অনেক হয়েছে।
নূরী ক্ষুধায় কাতর হলেও তেমন কিছু আসে যায় না। মনির জন্য যত ভাবনা। মনি ক্ষুধায় বার বার নড়েচড়ে উঠছে। লক্ষ্মী ছেলে বলে এখনও তেমনি নীরব রয়েছে। মনি দুষ্ট হলেও বেশ ধীর শান্ত ছেলে, হাজার ক্ষুধা পেলেও সে চিৎকার করে কাঁদত না। ক্ষুধার সময় একটা অদ্ভুত শব্দ করত মনি, আর মাঝে মাঝে দু’হাতের মুঠি দিয়ে চোখ ঘষতো।
নূরীর অজানা ছিল না এসব।
ছোট্ট নাদুস নুদুস কচি কচি হাত দু’খান দিয়ে মনি যখন নাকমুখ ঘষে একটা অস্ফুট ভাঙ্গা শব্দ করতে থাকে, তখন নূরীর মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। নিজের জন্য তার চিন্তা হচ্ছে না, চিন্তা তার মনিকে নিয়ে।
ঘন বনের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলেছে নূরী। পাতার ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের আলো পড়ায় ঘন বনের জমাট অন্ধকার কিছু কিছু হালকা হয়ে এসেছে।
একটা গাছের তলায় এসে বসল নূরী।
মনি তখন বেশ অস্থির হয়ে পড়েছে। হবে না কেন, মনি তো কচি শিশু। হঠাৎ নূরীর কানে আসে একটা জলধারার ক্ষীণ শব্দ। নূরী উঠে দাঁড়ায় মনিকে বুকে নিয়ে সেই শব্দ লক্ষ্য করে এগুতে থাকে। কিছুদূর এগুতেই নূরীর নজর পড়ে অদূরে ঘন বনের মাঝখান দিয়ে একটি পাহাড়িয়া ঝর্ণা কুল কুল করে বয়ে চলেছে।
