হাঁ সর্দার, তাজ আর দুলকী এতদিনে কান্দাই পৌঁছে গেছে। সর্দার, বজরা ভাসান হবে না?
না। যতক্ষণ নূরীকে খুঁজে না পাই ততক্ষণ বজরা এখানেই থাকবে। রহমান, তুমি প্রস্তুত হয়ে নাও, এখনই যাব নূরীকে খুঁজতে।
রহমান আর বনহুরের মধ্যে যখন কথাবার্তা হচ্ছে, তখন মনিরা এসে দাঁড়াল সেই ক্যাবিনে। মনিরা বনহুরের মুখোভাব লক্ষ্য করে বেশ বুঝতে পারল তার মনোভাব স্বাভাবিক নেই। ইতোমধ্যে গত রাতের মেয়েটি-যে তাদের বন্দী করেছিল সে উধাও হয়েছে কথাটা তারও কানে গিয়েছিল। রাতের অন্ধকারে মেয়েটিকে সামান্য দেখে মনিরা তাকে চিনতে পারেনি, কারণ তার শরীরে ছিল পুরুষের পোশাক। আজ সকালে একজন অনুচরের মুখেই শুনতে পেয়েছে, সেই যুবক পুরুষ নয়-নারী। এবং এটাও মনিরা জানতে পেরেছিল—তার নাম নূরী। সেই থেকে তার মনের কোণে যন্ত্রণার কাঁটা বিঁধছিল। তাই মনিরা ছুটে এসেছে, কিন্তু এসে স্বামীকে গম্ভীর ভাবাপন্ন বিষণ্ণ দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়াল।
রহমান বেরিয়ে গেল ক্যাবিন থেকে।
মনিরা স্বামীর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল—এই গহন বনে নামবে তুমি?
হাঁ মনিরা।
কিন্তু…
উপায় নেই।
আমিও যাব তোমার সঙ্গে।
তা হয় না।
কেন?
এসব বন অতি ভয়ঙ্কর স্থান। জানি না নূরী এতক্ষণ বেঁচে আছে কিনা, তাছাড়া তার কোলে শিশু মনি আছে।
বনহুরের কথায় মনিরার কুঞ্চিত হল, নূরীর পরিচয় সে জানত। কান্দাইয়ের পোডড়াবাড়িতে নূরীর সঙ্গে একবার তার দেখাও হয়েছিল, তা ছাড়া এ নামটা বনহুরের মুখেও দু’এক দিন শুনেছিল মনিরা। আর এটাও মনিরা জানত, নূরী বনহুরকে ভালবাসে শুধু ভালবাসে নয়, প্রাণ দিয়ে সে চায় ওকে। সেই নূরীর কোলে শিশুসন্তান–মনিরার মনে সন্দেহের দোলা লাগে।
বনহুর ততক্ষণে নিজের কাল দস্যু ড্রেস পরতে শুরু করেছে।
মনিরা নিৰ্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে দেখতে লাগল। কতদিন সে স্বামীকে এই ড্রেসে দেখেনি। বড় সুন্দর লাগছে বনহুরকে। স্বামীর বুকে মাথা রাখার জন্য মনিরার মন হাহাকার করে উঠল। কিন্তু এখন বনহুরের মনোভাব সম্পূর্ণ অন্য রকম। কোনদিকে যেন তার খেয়াল নেই। নূরী আর তার কোলের শিশুটাই যেন তার একমাত্র লক্ষ্য। অভিমানে ভরে উঠল মনিরার মন।
বনহুরের পোশাক পরা হয়ে গেছে। রাইফেলটা হাতে তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল—মনিরা, তোমরা সাবধানে থাকবে। যতক্ষণ না ফিরে আসি বজরার বাইরে কেউ বের হবে না। একবার মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে বনহুর দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
রহমান তার ড্রেস পরে রাইফেল হাতে কক্ষের বাইরে প্রতীক্ষা করছিল।
রহমান আর বনহুর বজরার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নদীতীরে নেমে গেল। মনিরা ছুটে এসে বজরার মুক্ত জানালায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
বনহুর আর রহমান গহন বনের মধ্যে অদৃশ্য হতেই মনিরা ছুটে এসে লুটিয়ে পড়ল বনহুরের শূন্য বিছানায়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। আজ মনিরার মনে নানা কথা উদয় হচ্ছে। তার নারী জীবনে কি এতই বিড়ম্বনা ছিল। স্বামী-সন্তান নিয়ে সবাই সুখের ঘর বাঁধে, ছোট একটা পরিচ্ছন্ন সংসার গড়ে তোলে, আর তার জীবনটা এসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। স্বামীভাগ্য তার সত্যি অতি অদ্ভুত, যা কোন নারীর ভাগ্যে হয় না। দস্যু বনহুরকে স্বামীরূপে পাওয়া—এ চরম, সার্থক নারী জীবনের পরম উপলব্ধি। কোন মেয়ে যা কোনদিন কল্পনা করতে পারে না বা পারেনি, বজরার জীবনে সেই কল্পনা বাস্তবে পরিণত হয়েছে সেই দুর্লভ রত্ন সে লাভ করেছে এর চেয়ে আর কি সে কামনা করতে পারে। কিন্তু তবুতো মনিরার জীবন আজ অভিশপ্ত, এত পেয়েও না পাওয়ার হাহাকারে তার অন্তর জর্জরিত, নিষ্পেষিত। এর চেয়ে না পাওয়াটাই ছিল তার জীবনের সান্ত্বনাময় একটি দিক। এখন পেয়ে না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাসের জ্বালা বড়ই অসহ্য তীক্ষ্ণ। মনিরা ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে।
গোটা রাতের ঝড়-ঝঞার ঝাপটায় সুফিয়ার শরীর ক্লান্তি আর অবসাদে ভরে উঠেছিল, অঘোরে ঘুমাচ্ছিল সে। ঘুম ভাঙতেই মনিরাকে না দেখে উঠে বসে বিছানায়।
বজরার জানালাপথে তখন ভোরের সূর্যের আলো মেঝেতে এসে পড়েছে। সুফিয়ার মনে গত রাতের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে ভেসে উঠল। মনে পড়ল মনিরার কথাগুলো, বিনয় সেন মনিরার স্বামী কাল রাতে মনিরা তার কাছে সব কথাই খুলে বলেছে। তবে কি আজ ভোর হতে না হতেই মনিরা তার স্বামীর কক্ষে গিয়েছে? হয়তো তাই, বহুদিন পর স্বামীর সন্ধান পেয়েছে বেচারী, তদুপরি যা তা স্বামী নয়! পুরুষের মত পুরুষ বটে বিনয় সেন। মনিরার স্বামীভাগ্য অতি গৌরবময়।
সুফিয়ার মনে একটা অতৃপ্ত কামনা উঁকি দিয়ে গেল। শিহরণ জাগল তার হৃদয়ে। নিশ্চয় এখন তার স্বামীর বুকে মাথা রেখে অনাবিল শান্তি অনুভব করছে। স্বামীর বাহুবন্ধনে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তার নারীজীবন সার্থক করে তুলেছে। এ দৃশ্য না জানি কত মধুর, স্বর্গীয়, সুফিয়া উঠে দাঁড়াল, চুপি চুপি পাশের মুক্ত জানালার পাশে গিয়ে উঁকি দিল। কক্ষে দৃষ্টি পড়তেই সুফিয়ার কল্পনাজাল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হলো –একি, কোথায় সেই মহাপুরুষ–মনিরাই বা বিছানায় লুটিয়ে অমন করে কাঁদছে কেন?
সুফিয়া কিছুক্ষণ নির্বাক পুতুলের মত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অতি লঘু পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করে ডাকল—মনিরা।
