বনহুর আবার হাসল।
নূরী তাকাল ওর মুখের দিকে লজ্জা, সঙ্কোচ আর দ্বিধাভরা ভাব নিয়ে। কিছু বলতে গেল, ঠোঁট দুখানা কেঁপে উঠল–
বনহুর বলল–কি বলতে চাও?
আমি ভুল করেছি হুর, তুমি আমাকে মাফ করে দাও।
ভুল তুমি করনি নূরী, ঠিকই করেছ। আমার অনুপস্থিতকালে তুমি আমার অনুচরদের মনে খোরাক দিচ্ছ, নাহলে ওরা হাঁপিয়ে পড়বে যে।
তুমি আমার সংগে ঠাট্টা করছ।
মৃদু হেসে বলল বনহুর নূরী, ঠাট্টা আমি করিনি। সত্যই তুমি দস্যু দুহিতা। তোমার সাহস দেখে আমি খুশি হয়েছি নূরী।
হুর, তোমাকে হঠাৎ এভাবে পাব ভাবতেও পারিনি। নূরী বনহুরের জামাটা আঁকড়ে ধরে বুকে মাথা রাখল—হুর, তুমি জান না অমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারি না? কেন তুমি এতদিন ধরে আমাকে ছেড়ে দূরে রয়েছ?
বনহুর নূরীর চিবুকটা ধরে বলল—কত কাজ ছিল আমার, তাইত এত বিলম্ব হলো।
কাজ-কাজ–সব সময়ই তোমার কাজ। ঝিন্দে তোমার কি কাজ ছিল হুর?
সব কান্দাইয়ে ফিরে গিয়ে বলব।
ওরা কে হুর? ওরা?
কাদের কথা বলছ নূরী?
অভিমানভরা কন্ঠে বলল নূরী–ঐ যুবতী দু’জন?
তাহলে তাদের সন্ধান পেয়েছ?
কেন, আমার কাছে গোপন করে রাখতে চেয়েছ বুঝি?
না।
তবে যে ওকথা বলছ?
বলছি তুমি তাদের—
হাঁ, আমি ওদের দু’জনকে বন্দী করেছি।
বন্দী করেছ।
হাঁ হুর! দৃঢ় কণ্ঠস্বর নূরীর।
কিন্তু জান ওরা কে?
জানার কোন দরকার নেই, তবে এটুকু জানি ওরা তোমার বান্ধবী।
হাসল বনহুর–তোমার অনুমান ঠিক নূরী।
ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফোঁস করে উঠল নূরী–যেখানেই যাও, নারী নিয়ে তোমার কাজ।
গর্জে উঠল বনহুর-নূরী!
আমি মিথ্যা বলিনি, তার প্রমাণ ঐ যুবতী দু’জন।
নূরী, তুমি সত্যই জানতে চাও ওদের পরিচয়?
বল, আমি শুনতে চাই কে ওরা?
তবে শোন, একজন কান্দাইয়ের পুলিশ সুপারের কন্যা মিস সুফিয়া আর দ্বিতীয় যুবতী তোমার পরিচিত।
না, ওকে আমি চিনি না।
ভাল করে লক্ষ্য করলেই চিনতে পারতে।
আমি তোমার মুখেই শুনতে চাই হুর যুবতীর পরিচয়।
তবে শোন নূরী, দ্বিতীয় যুবতী চৌধুরী কন্যা মনিরা।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠল নূরী–মনিরা।
বলল বনহুর–চমকে উঠলে কেন? নূরী, আমি তাকে বিয়ে করেছি। সে আমার বিবাহিতা স্ত্রী।
উঃ! একটা আর্তনাদ করে দু’হাতে মাথাটা টিপে ধরল নূরী, তারপর তাকাল অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে বনহুরের মুখের দিকে–সত্যি বলছ?
হ্যাঁ নূরী। আমি তাকে দু’বছর আগে বিয়ে করেছি।
অস্ফুট কণ্ঠে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল নূরী—দু’বছর আগে হ্যাঁ।
হ্যাঁ।
আমাকে–তুমি বলনি কেন?
আমি জানি তুমি সহ্য করতে পারবে না, তাই বলিনি নূরী–
নূরী, আমি জানতাম তুমি সহ্য করতে পারবে না। বনহুর নূরীকে দু’হাতে টেনে নিল বুকের মধ্যে, গভীর আবেগে ডাকল নূরী। নূরী পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে গেছে। দু’চোখে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। তার দেহে প্রাণ আছে কি নেই বুঝা যাচ্ছে না। বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিয়ে মুখখানা তুলে ধরল–আমি জানি তুমি আমাকে কত ভালবাস। তোমার প্রাণের চেয়ে তুমি আমাকে বেশি ভালবাস নূরী আর আমি-আমি তোমাকে পরিহার করে চলি—
বনহুরের অশ্রু ফোটা ফোটা নূরীর মাথায় ঝরে পড়তে লাগল। বনহুর আবার ডাকল নূরী নূরী।
নূরী নির্বাক-নিশ্চল পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকে।
১.১২ দস্যু দুহিতা
০১.
ভোরের শীতল হাওয়া শরীরে লাগতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল দস্যু বনহুরের। হাই তুলে শয্যায় উঠে বসল সে। গত রাতের ঘটনাগুলো একেরপর এক মনে পড়তে লাগলো–সর্বপ্রথম স্মরণ হলো নূরীর কথা, না জানি সে ঘুমোতে পেরেছে কিনা—
হঠাৎ বনহুরের চিন্তাজালে বাধা পড়ল ক্যাবিনের দরজায় এসে দাঁড়াল রহমান-সর্দার–
বনহুর তাকে ডাকল–ভেতরে এসো রহমান
রহমান ক্যাবিনে প্রবেশ করতেই বনহুর বলল–এবার বজরা ছাড়ার আয়োজন কর।
রহমান মুখ তুলল, বিমর্ষ মলিন তার মুখ, বেদনাভরা গলায় বলল সে–সর্দার নূরী নেই।
চমকে উঠলো বনহুর বিস্ময়ভরা আরষ্ঠ কণ্ঠে বললো–নূরী নেই।
কখন যে নূরী বজরা থেকে চলে গেছে আমরা জানি না।
বনহুর ব্যস্তভাবে শয্যা ত্যাগ করে নেমে দাঁড়াল, রহমানকে লক্ষ্য করে বলল–দুটো বজরাই খুঁজে দেখেছ?
হ্যাঁ সর্দার, দুটো বজরাই খুঁজে দেখা হয়েছে।
এমন সময় দ্বিতীয় বজরায় নূরীর দাসী কাঁদতে কাঁদতে এসে দাঁড়াল সেখানে—হুজুর, মনি নেই। ওকে খুঁজে পাচ্ছি না।
চিত্রার্পিত্রের ন্যায় দাঁড়িয়ে বনহুর প্রতিধ্বনি করে উঠল—মনিও নেই।
দাসী ক্রন্দনজড়িত কণ্ঠে বললনা।
বনহুরের চোখের সামনে সীমাহীন চিন্তাজাল জট পাকাতে শুরু করল। নুরী যখন গত রাতে তার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল তখন তাকে অতি বিষণ্ণ মলিন দেখাচ্ছিল। নূরী তারপর একটি কথাও বলতে পারেনি তাকে। বনহুর নূরীকে সান্ত্বনা দেবার অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে সে। নূরীর মুখে বনহুর কিছুতেই হাসি ফোটাতে পারেনি।
নূরীকে তার বজরায় বনহুর নিজে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল। তারপর সবকিছু ঠিকঠাক করে রাতটুকুর মত কোন নির্জন স্থান দেখ বজরা বাঁধার নির্দেশ দিয়েছিল সে নিজে। তখন কি বনহুর ভেবেছিল যে, নূরী পালিয়ে যাবে। তাহলে কিছুতেই সে বজরা বাঁধার আদেশ দিত না।
আজ নূরীর অভাব বনহুরের হৃদয়ে প্রচন্ডভাবে আঘাত করল। বনহুর কিছুক্ষণ স্তব্ধভাবে চিন্তা করে বলল—তাজকে নিয়ে কায়েস বোধ হয় কান্দাই পৌঁছে গেছে।
