সঙ্গে সঙ্গে নূরীর অনুচরগণ ঘুমন্ত যুবতীদ্বয়ের মুখে রুমাল চাপা দিয়ে হাত পা মজবুত করে বেধে ফেলল, তারপর নিয়ে গেল নিজেদের বজরায়।
অতি অল্প সময়ে এ সব হলো।
যুবতীদ্বয় অন্য কেউ নয়–মনিরা ও সুফিয়া।
এ বজরাখানি দস্যু বনহুরের।
এত কাণ্ড যখন হচ্ছে তখন বনহুর গভীর নিদ্রায় মগ্ন।
বহুদিন সে এমন নিশ্চিন্তে ঘুমায়নি, আজ তাই আরানে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের ঘোরে একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখছিল সে–নীল তারাভরা আকাশ, মাঝখানে চাদ হাসছে। একটা সুন্দর বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সে একা। তার শরীরে সাদা ধবধবে মূল্যবান পোশাকে মণি মাণিক্য আর জরির কাজ করা। জ্যোস্নার আলোতে তার দেহের পোশাকগুলো ঝকঝক করছে। মাথায় পাগড়ী, পায়ে জরির বুটিতোলা নাগরা। বাগানের মধ্যে ফুর ফুরে হাওয়া বইছে। নানা রকম ফুলের সুবাস ভেসে আসছে বাতাসে। তার দেহের পোশাক হাওয়ায় উড়ছে, অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে।
বনহুর এত সুখেও শান্তি পাচ্ছে না। বড় একা একা লাগছে। চারদিকে তাকাচ্ছে সে কারও অম্বেষণে। না, কোথাও কেউ নেই। বনহুর ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। জ্যোস্নার আলোতে ফুলগুলো দূলে দুলে যেন হাসছে, হাতছানি দিয়ে যেন ডাকছে বনহুরকে। সুন্দর অপূর্ব এ দৃশ্য। বনহুর হঠাৎ দেখল তার অদূরে একটা ক্ষুদ্র নৌকা ভেসে চলেছে চমকে উঠল বনহুর, নৌকায় একটি তরুণী দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাথায় কাঁকড়ানো এলো চুল, শরীরে সুন্দর ঝকঝকে শাড়ি। ডাগর ডাগর দুটি চোখ বনহুর ভাল করে তাকাল এ যে তার মনিরা। কোথায় যাচ্ছে মনিরা! বনহুর ছুটে গেল মনিরা হাসছে, নৌকাখানা আপনা-আপনি এগিয়ে এলো তার দিকে। মনিরা হাত বাড়াল বনহুর ওর হাত ধরে উঠে পড়ল নৌকাখানায়।
বনহুর মনিরাকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করল।
মনিরা নিজেকে সপে দিল বনহুরের বাহুবন্ধনে। তারাভরা আকাশে আলোর বন্যা। বনহুর আর মনিরা নৌকায় বসে হাসছে, হাওয়ায় দুলছে তাদের নৌকাখানা। মনিরা নদীর স্বচ্ছ পানি তুলে নিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে বনহুরের চোখে-মুখে।
হাতের পিঠে চোখে-মুখে পানি মুছে ফেলে হাসছে বনহুর। মনিরাকে পেয়ে আনন্দ তার ধরছে না।
বনহুর আর মনিরা যখন মনের খুশিতে দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে দু’জনের আনন্দোচ্ছ্বাস, তখন হঠাৎ একটা কুমীর ভেসে উঠল বনহুর তাকিয়ে দেখল কুমীরটার পিঠে দাঁড়িয়ে নূরী। হাতে তার ভোলা তরবারি। চোখে যেন আগুন ঝরে পড়ছে। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নূরী, তাদের দিকে।
বনহুর কিছু বলতে যাচ্ছে, বুঝাতে চেষ্টা করছে; কিন্তু পারছে না। নূরী তারবারি বাগিয়ে আসছে তাদের দিকে। মনিরা ভয়ে বনহুরকে আঁকড়ে ধরছে।
বনহুরও ওকে ধরে রয়েছে।
নূরী হঠাৎ তার তরবারি দিয়ে আঘাত করল ওদের দুজনকে।
বনহুর হাত দিয়ে ধরে ফেলল নূরীর অস্ত্র। আশ্চর্য, বনহুরের হাত নূরীর অস্ত্রে দ্বিখণ্ডিত হলো না। নূরী তখন ক্রুদ্ধ হয়ে পুনরায় আঘাত করল, এবারও বনহুর নূরীর অস্ত্র থেকে বাঁচিয়ে নিল মনিরাকে।
নূরী যতই আঘাত করছে, বনহুর ততই তার আঘাত নীরবে রোধ করে যাচ্ছে। এবার হাসছে বনহুর, স্বপ্নঘোরেই হাসছে সে।
বনহুর যখন স্বপ্ন দেখছে ঠিক সে মুহূর্তে নূরী দলবল নিয়ে প্রবেশ করল তার ক্যাবিনে।
ক্যাবিনের স্বল্পালোকে দেখল নূরী, একটা লোক শয্যায় শুয়ে আছে, মুখটা তার ওদিকে ফেরান রয়েছে।
নূরী কথা না বলে ইংগিত করল ওকে বেঁধে ফেলতে।
নূরীর সঙ্গে কায়েসও দাঁড়িয়েছে, হাতে গুলিভরা বন্দুক।
কায়েসই প্রথম এগিয়ে এলো শয্যার পাশে। বন্দুকের নলের আগা চেপে ধরল ঘুমন্ত দস্যু বনহুরের পিঠে।
মুহূর্তে ঘুম ভেঙ্গে গেল বনহুরের, ফিরে তাকাল সে।
সঙ্গে সঙ্গে কায়েস বিস্ময়ভরা অস্ফুট শব্দ করে উঠল–সর্দার। কায়েসের হাত থেকে খসে পড়ে গেল বন্দুকটা। ভূয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠল ওর মুখমণ্ডল।
নূরী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্যান্য অনুচর ভীত হয়ে দৃষ্টি নত করে দাঁড়িয়ে রইল। সকলেরই ব্রাহি ত্রাহি ভাব।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল। বনহুরের চোখে মুখেও বিস্ময় ভাব, এগিয়ে গেল নূরীর দিকে। নূরীর শরীরে পুরুষ ড্রেস থাকায় চট করে চিনতে পারল না। নিকটে এসে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে হেসে উঠল হাঃ হাঃ হাঃ করে, তারপর বলল-নূরী তুমি!
নূরীর মুখ দিয়ে চট করে কোন কথা বের হলো না। চিত্রাপিতের ন্যায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বনহুরের মুখ থেকে তখনও মৃদু হাসির রেখামুছে যায়নি। বলল বনহুর–কদিন হলো কাজে নেমেছ?
নূরী একবার নিজের অনুচরদের মুখের প্রতি দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে তাকাল বনহুরের মুখের দিকে, তারপর শান্তকণ্ঠে বলল—হুর, আমি জানতাম না এটা তোমার বজরা।
সাবাস নূরী, দস্যু বনহুরের বজরায় হানা দিয়ে তাকে বন্দী করতে চেয়েছিলে, এটা কম সাহসের পরিচয় নয়।
বনহুর এবার কায়েস ও অন্যান্য অনুচর যারা একটু পূর্বে তাকে বন্দী করার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছিল, তাদের দিকে তাকাল–গম্ভীর কন্ঠে বলল–বেরিয়ে যাও।
মুহূর্তে সবাই কক্ষ ত্যাগ করল।
বনহুর এবার আংগুল দিয়ে নূরীর নাকের নিচ থেকে সরু গোঁফ জোড়া খুলে নিল। তারপর হাত দিয়ে ওর মাথার পাগড়ীটা ঠেলে ফেলে দিল পেছনে। সঙ্গে সঙ্গে একরাশ কোঁকড়ান চুল ছড়িয়ে পড়ল নূরীর পিঠে।
