পাশের ক্যাবিনে ঘুমিয়ে পড়েছে দস্যু বনহুর। বিনয় সেনের অন্তর্ধান হয়েছে। মনিরার নিকটে আত্মগোপন করার জন্যই সে এই বেশে বজরায় অবস্থান করত। আজ অনাবিল এক আনন্দে বনহুরের হৃদয় পরিপূর্ণ। বহুদিন পর আজও সে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
২১.
দূরবীক্ষণ চোখে লাগিয়ে বজরার ছাদে দাঁড়িয়ে দূরে লক্ষ্য করছে দস্যু দুহিতা নূরী। পাশে দাঁড়িয়ে দস্যু বনহুরের অনুচর কায়েস।
বজরার মধ্যে অঘোরে ঘুমাচ্ছে শিশুমনি।
অন্যান্য অনুচর সজাগভাবে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যার যার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে নূরীর শরীরে পুরুষের ড্রেস। পিঠের সঙ্গে গুলিভরা রাইফেল ঝুলছে।
বজরাখানা মাঝনদী দিয়ে এগুচ্ছিল। শান্ত নদীর বুকে একটা জীবন্ত জীবের মত ঝুপঝুপ শব্দ করে চলেছে বজরাখানা।
হঠাৎ নূরী বলে উঠল–কায়েস, দেখ মনে হচ্ছে একটা বজরা এদিকে এগিয়ে আসছে।
কায়েস বলে ওঠে বজরা–
হাঁ, কায়েস, বজরা বলেই মনে হচ্ছে। নূরী চোখে দূরবীক্ষণ লাগিয়ে দূরে লক্ষ্য করে কথাটা বলল।
নূরীর হাত থেকে কায়েস দূরবীক্ষণ নিয়ে দেখল সত্যি একখানা বজরা এগিয়ে আসছে এদিকেই। কায়েস বলল–আমার মনে হচ্ছে কোন যাত্রীবাহী বজরা।
নূরী চাপাকণ্ঠে বলে উঠল—আমারও তাই মনে হচ্ছে কায়েস। তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও আমরা এই বজরায় হানা দেব। নূরীর দু’চোখে খেলে গেল বিদ্যুতের চমকানি।
কায়েস নূরীর কথায় খুশি হল–এটাই তো কাজ। সর্দার না থাকায় আজকাল বনহুরের অনুচরগণ বেশ ঝিমিয়ে পড়েছে, কেমন যেন একটা শিথিলতা দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে। সর্দারের অবর্তমানে অনুচরগণ হাঁপিয়ে উঠেছিল, আজ নূরীর কথায় আনন্দে নেচে উঠল কায়েসের মন। দস্যুবৃত্তিভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠল ধমনীর রক্তে।
নূরীর আদেশে কায়েস তার দলবলকে সম্মুখস্থ বজরায় হানা দেবার জন্য প্রস্তুত হবার নির্দেশ দিল।
সঙ্গে সঙ্গে অনুচরগণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল! নূরী নজেও রাইফেল বাগিয়ে বজরার সম্মুখে এসে মাঝিদের নির্দেশ দিতে লাগল।
অতি সন্তর্পণে মাঝিরা দাঁড় চালিয়ে এগুতে লাগল। সম্মুখস্থ বজরার সবাই যে দ্রিামগ্ন এটা বেশ বুঝতে পারল তারা। কারণ, বিপরীত বজরার গতি অতি মন্থর ছিল। মাত্র দু’তিনজন দাড় টেনে এগুচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
নৃরীর বজরার দস্যুগণ প্রবল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে প্রবল বজরাখানা নিকটবর্তী হলেই তারা আক্রমণ চালাবে।
নূরীর জীবনের একটি অদ্ভুত কাহিনী আছে। নূরী তখন সবে আট ন’ বছরের ছোট বালিকা। পরনে ঘাগড়া, পায়ে মল, হাতে বালা, গলায় ফুলের মালা, ছোট্ট কাঁকড়ান একরাশ চুল। একদিন নূরী তীর-ধনু নিয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বনহুর তখন পনের-ষোল বছরের কিশোর বালক, সেও নূরীর পাশে ছিল। হঠাৎ তারা গভীর বনের মধ্যে এসে পড়ল, এমন সময় একটা চিতাবাঘ আক্রমণ করল তাদের দুজনকে। বাঘটা আচমকা বনহুরকেই আক্রমণ করে বসল। বনহুর যদিও হঠাৎ এমনভাবে চিতাবাঘের কবলে পড়বে বলে আশা করেনি, তবু নিজে তীর ধনু নিয়ে বাধা দিতে গেল কিন্তু ব্যর্থ হলো সে, পড়ে গেল মাটিতে। কিশোর বালক বনহুর একটা চিতাবাঘের সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল, নূরী এই বিপদমুহূর্তে হতভম্ব হলো না, সে নিজের তীর দিয়ে বিদ্ধ করল চিতাবাঘকে। সঙ্গে সঙ্গে চিতাবাঘটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল কিছুক্ষণ ছট ফট করে মরে গেল বাঘটা। কারণ তীর-ধনুতে ছিল বিষ মাখান।
নূরীর জন্যই সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল বনহুর।
তা ছাড়াও নূরীর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে যা তাকে করে তুলছে দুর্দান্ত-দুঃসাহসী।
আজ নূরীর ধমনীতে দস্যুরক্ত উষ্ণ হয়ে উঠেছে। সমস্ত দস্যু অনুচরদের নিয়ে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে নূরী। সম্মুখস্থ বজরাখানা মন্থর গতিতে এগিয়ে আসছে।
নূরী আর একবার বজরার মধ্যে প্রবেশ করে ঘুমন্ত মনির মুখে চুমু দিয়ে দাসীকে বলল–খুব সাবধানে ওকে রাখবে। যতক্ষণ আমি বজরায় ফিরে না আসি, ততক্ষণ তুমি মনিকে নিয়ে বাইরে যাবে না। কথাগুলো বলে বেরিয়ে গেল নূরী।
ততক্ষণে ঐ বজরাখানা অনেকটা এগিয়ে এসেছে।
আকাশে চাঁদ না থাকলেও অন্ধকার খুব জমাট ছিল না। বজরাখানা স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও বেশ বুঝা যাচ্ছিল।
নূরী আর তার দলবল অস্ত্র নিয়ে বজরায় পেছন দিকে লুকিয়ে রইল।
নূরীর ইঙ্গিতে তাদের বজরাখানাও সম্মুখস্থ বজরার দিকে অগ্রসর হতে লাগল। অতি নিকটে পৌঁছে গেছে।
এবার নূরীর বজরার গতি বেড়ে গেল, দ্রুত এগিয়ে গেল সামনের বজরার দিকে। যেইমাত্র দুটি বজরা পাশাপাশি হয়েছে অমনি নূরী দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বজরাখানার উপরে।
বজরার সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল, নূরীর দল মাঝিদের বুকে রাইফেল চেপে ধরতেই তারা চুপ হয়ে পড়ল। বজরার ছাদে ছিল দু’জন, তাদের বুকেও রাইফেল ধরা হলো। কেউ কোন শব্দ করতে পারল না। অনুচরগণ অন্ধকারে ঘুমন্ত লোকজনদের মজবুত করে বেঁধে ফেলল।
নির্জন নিস্তব্ধ নদীবক্ষে দু’খানা বজরার মধ্যে চলেছে একটা অদ্ভুত কার্যকলাপ। নূরীর অনুচরগণ বজরার সবাইকে বেঁধে ফেলল।
নূরীর আদেশে কয়েকজন প্রবেশ করলো সামনের ক্যাবিনে। দেখল দুটি যুবতী, অঘোরে ঘুমাচ্ছে। নূরী নির্দেশ দিল এদের দুজনকে ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে রুমাল বেঁধে আমাদের বজরায় উঠিয়ে নাও।
