মনিরা স্বামীকে তাড়াতাড়ি তুলে নিল হাত ধরে। যত রাগ অভিমান মুছে গেল নিমিষে। করুণ ব্যথাভরা কন্ঠে বলল-একি করছ। তুমি আমার স্বামী, কেন তুমি আমাকে অপরাধী করছ।
মনিরার কথায় আড়ালে দাঁড়িয়ে চমকে উঠল সুফিয়া। বিস্ময়ের ওপর বিস্ময় জাগল তার মনে স্বামী, মনিরার স্বামী এই যুবক? তবে কি বিনয় সেন রূপে অন্য কেউ যার পরিচয় সে এখনও জানে না। সুফিয়ার হৃদয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জাগতে লাগল।
সুফিয়া পুনরায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ক্যাবিনের মধ্যে। এবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারল না, অপূর্ব স্বর্গীয় সে দৃশ্য–যুবকের বাহু বন্ধনে মনিরা, যুবকের ঠোঁট দু’খানা মনিরার মুখের ওপর ঝুকে পড়েছে।
এমন সময় বজরার সিঁড়িতে পদশব্দ শোনা গেল। সুফিয়া আর দাঁড়াল হঠাৎ যদি কেউ দেখে ফেলে তখন কি হবে। সুফিয়া এবার নিজের ক্যাবিনে ফিরে এলো। শয্যা গ্রহণ করলো বটে, কিন্তু মনের অস্থিরতা কমলো না। কে এই যুবক যে এতদিন বিনয় সেনের রূপ ধরে তাদের মধ্যে রয়েছে। এভাবে তার আত্মগোপন করার অর্থই বা কি? একসঙ্গে নানা প্রশ্ন ধাক্কা দিয়ে চলল সুফিয়ার মনে।
রাত বেড়ে আসছে।
এতক্ষণও মনিরা ফিরে আসছে না, অস্বস্তি বোধ করে সুফিয়া—ভয় হয় হঠাৎ যদি বজরার কেউ ওদের এই মেলামেশা দেখে ফেলে। ছিঃ ছিঃ কি কেলেঙ্কারিটাই না হবে। মনিরার প্রতিও ঘৃণায় মন বিষিয়ে উঠল সুফিয়ার। লুকিয়ে লুকিয়ে কবে সে ছদ্মবেশী বিনয় সেনকে স্বামীরূপে গ্রহণ করেছিল। ভেতরে ভেতরে মেয়েটা নষ্ট চরিত্রা। ছিঃ ছিঃ ছিঃ সুফিয়ার নাসিকা কুঞ্চিত হয়ে উঠল ঘৃণায়।
এমন সময় মনিরা অতি সন্তর্পণে ক্যাবিনে প্রবেশ করল। সুফিয়া ঘুমিয়ে আছে মনে করে নিজে ওর পাশে শুয়ে চাদরটা টেনে নিল গায়ে। মনে তার অফুরন্ত আনন্দ, কতদিন পর আজ–সে স্বামীকে ফিরে পেয়েছে। এখন মনিরার মত সুখী কে! শত ব্যথা-কষ্ট নিমিষে মুছে গেছে, অনাবিল আনন্দস্রোতে ভেসে গেছে তার হৃদয়ের যত ব্যথা আর দুঃখ।
মনিরা শয্যা গ্রহণ করতেই সুফিয়া বিছানায় উঠে বসল, গম্ভীর তীব্রকণ্ঠে বলল–কোথায় গিয়েছিলে মনিরা?
মনিরা সুফিয়ার কথায় চমকে উঠল, তাহলে কি সুফিয়া সব জানতে পেরেছে! হঠাৎ কোন জবাব দিতে পারল না সে, নীরব রইলো
সুফিয়া পুনরায় বলল–মনিরা, আমি সব জানি মিছামিছি কিছু গোপন করতে চেষ্টা করনা।
মনিরাও এবার শরীর থেকে চাদর সরিয়ে উঠে বসলো, ক্যাবিনের নীলাভ আলোতে তাকালো সুফিয়ার মুখের দিকে। দেখল ঘৃণায় সুফিয়া কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে।
মনিরার মুখে ফুটে উঠল একটা হাসির রেখা। দীপ্ত উজ্জ্বল তার মুখমণ্ডল। তখনও মনিরার শরীরে শিহরণ জাগাচ্ছে তার স্বামীর স্বর্গীয় পরশ। বুকের মধ্যে তখনও আনন্দের ছোঁয়া দোলা জাগাচ্ছে, সত্যই মনিরা আজ ধন্য! বলবে–সত্য কথাই বলবে, এতে আপত্তির কিছু নেই। মনিরা বলতে শুরু করল সুফিয়া, জানি তুমি এখন যা শুনেছ বা দেখেছ তাতে আমার ওপর তোমার ঘৃণা জন্মাবার কথাই। যে কেউ এটা দেখলে আমাকে এ ভাবে প্রশ্ন করত। তাই তোমার এ সন্দেহ অহেতুক নয়।
সুফিয়ার মুখ তখনও গম্ভীর থমথমে। মনিরাকে সুফিয়া অনেক বিশ্বাস করে, ভালবাসে। সে ভাবতেও পারে না মনিরা নষ্ট চরিত্রা মেয়ে। তাই সে এমন একটা অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে, যা তার মনকে বিষাক্ত করে তুলছিল।
মনিরা বলে চলল–সুফিয়া, তোমাকে আমি আমার জীবন কাহিনী সব বললেও একটা কথা এখনও বলিনি, আমি বিবাহিতা–আমি সন্তানের জননী–
সুফিয়া অস্ফুট শব্দ করে উঠল—সত্যি!
হাঁ সুফিয়া। শোন, আজ তোমাকে আমার সব গোপন কথা খুলে বলব, বলার পূর্বে তোমার মনের ভুল আমি ভেঙ্গে দিচ্ছি। যিনি তোমার আমার উদ্ধারকারী বিনয় সেন, তিনিই আমার স্বামী।
তোমার বিবাহিত স্বামী?
হাঁ সুফিয়া, আমার স্বামী।
তোমার স্বামীর এ ছদ্মবেশের কারণ কি মনিরা? তিনি বিনয় সেনের বেশে চেহারা এবং কণ্ঠস্বর পাল্টিয়ে আমাদের কেন এভাবে ছলনা করে চলেছিলেন?
সুফিয়া, তার বুদ্ধির শেষ নেই, বলছি সব শোন। ছদ্মবেশে না থাকলে তিনি আজ ঝিন্দের ভাগ্যাকাশে নতুন সূর্যের আবির্ভাব ঘটাতে পারতেন না। তুমি তো জান, ঝিন্দবাসী কিভাবে রাজা মঙ্গলসিন্ধের নিষ্ঠুর, নিষ্পেষণে নিষ্পেষিত হয়ে চলেছিল। আমার স্বামীর প্রাণে ঝিন্দবাসীদের এই করুণ পরিণতি দারুণ ব্যথা জাগিয়েছিল,তাই তিনি নিজেকে গোপন রেখে দেশ ও দশের জন্য কঠিন ভাবে সংগ্রাম চালিয়ে তবেই আজ জয়ী হতে পেরেছেন। আমার কাছেও তিনি নিজেকে প্রকাশ করেননি, জানতেন আমি তার কাজে বাধার সৃষ্টি করে বসব। সুফিয়া, কত কষ্টই না এতদিন ভোগ করেছেন তিনি। আমি এতটুকু সহায়তা তাকে করতে পারিনি বা করিনি–
মনিরা সব খুলে বলল, যদিও সে পূর্বে তার জীবন কাহিনী সুফিয়ার কাছে বলেছিল, কিন্তু সে স্বামী এবং সন্তান সম্বন্ধে সব গোপন করে গেছে। আজ একটা কথা ছাড়া সব কথাই বলল সুফিয়ার কাছে। তার স্বামীর আসল পরিচয় আজও মনিরা গোপন করে গেল।
মনিরার সব কথা শুনে সুফিয়া হেসে বলল–ভাগ্যবতী নারী তুমি মনিরা! তোমার মত স্বামীরত্ন পাওয়া কত বড় সৌভাগ্যের কথা, আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না।
দু’বান্ধবী মিলে অনেকক্ষণ ধরে গল্প হলো, তারপর একসময়ে ঘুমিয়ে পড়ল মনিরা আর সুফিয়া।
