বুঝেছি সর্দার।
আচ্ছা, তুমি যাও, বজরার ছাদে দাঁড়িয়ে চোখে দূরবীক্ষণ লাগিয়ে দূরে লক্ষ্য রাখবে–
মনিরা কিছুতেই নিজকে শয্যায় ধরে রাখতে পারল না। বিদ্যুৎ গতিতে শয্যা ত্যাগ করে ক্যাবিনের বাইরে বেরিয়ে এলো, এ যে তার অতি কমানার অতি সাধারণ জনের গলার আওয়াজ–তবে, তবে কি সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু কই না তো, ঐ তো, সেই কণ্ঠ যা তার মনের কন্দরে করে গাঁথা হয়ে রয়েছে। কোনদিন সে এই গলার স্বর বিস্মৃত হবে না–হতে পারে না।
বিনয় সেনের ক্যাবিন থেকে পুনরায় ভেসে এলো পূর্বের সেই আওয়াজ তুমি এবার যেতে পার।
মনিরা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ক্যাবিনের দরজার আড়ালে আত্মগোপন করল, কিন্তু দৃষ্টি তার বাইরে অন্ধকারে নিবদ্ধ রইল। দেখল মনিরা, এক লোক অন্ধকারে বিনয় সেনের ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে বজরার ছাদের দিকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল।
লোকটা বজরার ছাদে অদৃশ্য হতেই মনিরা বেরিয়ে এলো ক্যাবিনের বাইরে। আসার সময় একবার বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে নিল মনিরা, অঘোরে ঘুমাচ্ছে সুফিয়া। মনিরা অতি লঘু পদক্ষেপে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বিনয় সেনের ক্যাবিনের দরজায় এসে দাঁড়াল। এই মুহূর্তে লোকটা বেরিয়ে যাওয়ায় দরজা কিঞ্চিৎ ফাঁক ছিল, মনিরা আলগোছে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি ফেলল কক্ষের মধ্যে, সঙ্গে সঙ্গে মনিরার হৃদয়ে একটা অনাবিল আনন্দের শিহরণ বয়ে গেলো, বিস্ময়ে পুলকে স্তব্ধ হয়ে গেল সে। বিনয় সেনের শয্যা তার কামনার, চির সাধারন রত্নতার স্বামী–দস্যু বনহুর! কোথায় সে বাবড়ি চুল, মুখে ছাটকরা দাড়ি। একজোড়া গোঁফ, বড় আঁচল, কোথায় সে বিনয় সেন!
মনিরা ভুলে গেল সব কথা, ভুলে গেল সে নিজেকে, ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্বামীর বুকে। কোন কথা তার মুখ দিয়ে বের হলো না।
বনহুর গভীর রাতে বিনয় সেনের রাজকীয় ড্রেস পরিবর্তন করে সবেমাত্র নিজের ক্যাবিনে এসে বিশ্রামের আয়োজন করছিল, এমন সময় অতর্কিতে মনিরাকে তার ক্যাবিনে প্রবেশ করতে দেখে চমকে উঠল। বুঝতে পারল আজ মনিরার নিকটে সব ফাঁস হয়ে গেছে। বনহুর মনিরাকে নিবিড় করে টেনে নিল বুকে, কিন্তু তারও কণ্ঠ দিয়ে কোন শব্দ বের হলো না। গভীর আবেগে মনিরার পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে চলল সে। মুখটা নেমে এলো ওর চুলের ওপর।
মনিরার দু’চোখে বাঁধভাঙ্গা জলস্রোতের মত অশ্রুধারা নেমে এলো। স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে আকুলভাবে কাঁদতে লাগল মনিরা। এই দেড়টি বহরের ঘাত-প্রতিঘাতের জমান বেদনা অঝোরে ঝরে পড়তে লাগল তার দু’নয়নে।
ফুলে ফুলে কাঁদছে মনিরা।
বনহুর নীরব। শুধু চিবুকটা বারবার ঘষছে মনিরার চুলে। বনহুরের চোখেও অশ্রু, ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ছে মনিরার মাথার ওপর।
মনিরা ইচ্ছামত কাঁদল, বনহুর একটু বাধাও দিল না, কারণ জানে সে এখন ওকে বাধা দেয়া ঠিক হবে না। বুকের মধ্যে ওর জমে রয়েছে ব্যথার পাহাড় কাঁদুক, কেঁদে কেঁদে ওর মনটা যদি একটু হাল্কা হয়!
অনেকক্ষণ কাঁদল মনিরা, তারপর এক সময় শান্ত হয়ে এলো।
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করে ডাকল মনিরা। বল তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ?
হঠাৎ আগ্নেগিরির মত জ্বলে উঠল মনিরা, ক্রুদ্ধ বাষ্পভরা কণ্ঠে বললএত ছিল তোমার মনে! ছেড়ে দাও আমাকে যেতে দাও এবার–
বনহুর ওকে আরও এঁটে ধরল, আবেগ মধুর কন্ঠে বলল–মনিরা আমি নরাধম পাপী–আমাকে তুমি ক্ষমা করতে পারবে না জানি তবু মনিরা তোমার–
না না, আমি কিছুতেই আমার এ মুখ তোমাকে দেখাব না। আমাকে তুমি ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও।
কেন মনিরা?
আমি অসতী ব্যভিচারিণী–
বনহুর মনিরার মুখে হাতচাপা দিল—আমাকে তুমি মাফ করে দাও মনিরা। মাফ করে দাও–
মনিরার হৃদয়ে আজ ক্ষুব্ধ অভিমান মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কিছুতেই সে নিজেকে প্রকৃতিস্থ রাখতে পারছে না। কেন তার স্বামী তাকে এমনভাবে নির্মম ব্যথা দিয়েছে। কেন সেদিন তাকে কিছু বলার সুযোগ পর্যন্ত দেয়নি। কেন সে দিনের পর দিন আর তার সন্ধান নেয়নি। কেন সে বিচার করে দেখেনি সত্যি মনিরা অসতী-ব্যভিচারিণী কিনা। তারপর যদিও এতদিন পর তাকে খুঁজে পেয়ে পাপপুরী থেকে উদ্ধার করে আনল তবু কেন সে এতদিনও তার কাছে আত্মগোপন করে রয়েছে। সব ব্যথা আর দুঃখ আজ মনিরার হৃদয়ে আঘাতের পর আঘাত করে চলল। তাই সে ক্ষুব্ধ অভিমানে নিজেকে স্বামীর বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু মনিরা দস্যু বনহুরের বাহু দুটিকে এতটুকু শিথিল করতে সক্ষম হলো না। বনহুর বললো–মনিরা, বিনা কারণে আমি তোমার প্রতি অন্যায় করেছি। ভুল করেছি মনিরা, আমি ভুল করেছি–বনহুর নতজানু হয়ে মনিরার পায়ের কাছে বসে পড়ল।
অদ্ভুত এ দৃশ্য!
যে দস্যুর ভয়ে সমস্ত দেশবাসীর মনে আতঙ্কের সীমা নেই, যে দস্যুর জন্য গোটা পৃথিবীর পুলিশবাহিনী তটস্থ, যে দস্যু সব দস্যুর চেয়ে শক্তিমান, সেই দম্রাট আজ, আজ একটা নারীর পদতলে উপবিষ্ট।
মনিরার পদপ্রান্তে যখন দস্যু বনহুর নতজানু হয়ে মাফ চাইছিল ঠিক তখন পাশের একটা ছোট জানালায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল সুফিয়া। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল সে–একি দেখছে! বিনয় সেনের স্থানে কে ঐ অপূর্ব সুন্দর যুবক। আর মনিরাই বা এ ক্যাবিনে কেন! কি ওদের পরিচয় আর কেনই বা যুবক মনিরার চরণতলে উপবিষ্ট। সুফিয়ার দু’চোখে রাজ্যের প্রশ্ন।
