কিন্তু বিজয়সিন্ধকে রাজা হিসেবে পেয়ে আবার তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। ঝিল রাজ্যের উপযুক্ত রাজা হলো বিজয়সিন্ধ। সৌম্য সুন্দর দীপ্তকান্তি যুবক বিজয়সিন্ধ এখন ঝিন্দের রাজা। বিনয় সেনের পরামর্শেই পুনরায় বৃদ্ধমন্ত্রীকে তার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা হলো। আবার শান্তি ফিরে এলো ঝি রাজ্যের বুকে।
বিনয় সেন এবার বিদায় চাইল।
বিজয়সিন্ধ তাকে আলিঙ্গন করে বলল—আপনি শুধু ঝিন্দ রাজকর্মচারীই ছিলেন না, আপনি একজন ঝিন্দ রাজ্যের মঙ্গলকামী ব্যক্তি ছিলেন। আপনাকে বিদায় দিতে আমার বুকের পাঁজর চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বন্ধু, আপনি মানুষ নন–দেবতা।
বিজয়সিন্ধের কাছে বিদায় নিতে বিনয় সেনের চোখ দুটোও শুষ্ক ছিল। একটা মায়ার আবেষ্টনী অক্টোপাশের মত তাকে যেন আকর্ষণ করছিল।
চলে যাবার সময় বিনয় সেন একটা চিঠি বিজয়সিন্ধের হাতে দিয়ে বলল–আজ থেকে দশ দিন পর এ চিঠির খাম ছিড়ে আপনি পড়বেন, সাবধান তার পূর্বে নয়।
চিত্রাপিতের ন্যায় বিজয়সিন্ধ বিনয় সেনের দেওয়া খামে ভরা চিঠিখানা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিনয় সেন বিদায় নিয়ে চলে গেল রাজ–অন্তপুর থেকে।
বিজয়সিন্ধ কিছুতেই বিনয় সেনের কথা অমান্য করতে সাহসী হলো না। চিঠিখানা অতি যত্নসহকারে রেখে দিল শেফের মধ্যে। দশ দিন পর সে দেখবে কি লেখা আছে ওর মধ্যে।
১৯.
নূরী তার শিশু মনিকে নিয়ে বেশ কিছু সংখ্যক অনুচরসহ ঝিন্দের দিকে রওনা দিল। সঙ্গে নিল প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদ। দস্যুকন্যা নূরীর বুকে অপরিসীম দুঃসাহস। সে নিজেও পুরুষের বেশে সজ্জিত হয়ে একখানা রাইফেল পিঠে ঝুলিয়ে রাখল।
নিখুঁতভাবে নিজেকে পুরুষের বেশে সজ্জিত করেছিল নূরী। তাকে দেখলে কেউ নারী বলে চিনতে পারবে না। যতক্ষণ না সে কথা বলে।
নূরীর মনোভার কেউ তাদের ওপর হামলা চালালে ওদের সে কিছুতেই ক্ষমা করবে না।
কান্দাই নদীর বুক চিরে তরতর করে এগিয়ে চলেছে নূরীর শ্যামাদ বজরা। অতিদ্রুতগামী এবং অতি মজবুত বজরা এই শ্যামচাঁদ। দু’জন মাঝি আর একজন দাড়ি বজরায় ছিল–আর ছিল দস্যু বনহুরের কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর। কায়েসও আছে এদের মধ্যে।
নূরী স্বয়ং বজরায় সবাইকে পরিচালনা করছিল। পথের নির্দেশ দিচ্ছিল কায়েস।
দিনরাত অবিরাম গতিতে শ্যামচাঁদ বজরা এগিয়ে চলেছে। বনহুরের সঙ্গে মিলনের আশায় নূরীর হৃদয়ে উত্তাল তরঙ্গের মত আনন্দের উৎস বয়ে চলেছে। ঝিন্দ শহরে বনহুর কি করছে,কেন সে এতদিন ফিরে এলো না, এটাই নূরীর একমাত্র চিন্তা।
নির্জন নদীবক্ষে নূরী মনিসহ বজরার ছাদে বসে থাকে। গভীর নীল সচ্ছ জলের বুকে দাঁড়ের ঝুপঝাপ শব্দের তালে তালে মনি অস্ফুট শব্দ করে কথা বলে। সুর করে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গান গায়, নূরীও যোগ দেয় তার গানের সুরে।
হাসে কায়েস আর অন্যান্য অনুচর। সকলের মনেই অফুরন্ত উচ্ছ্বাস আর উন্মাদনা।
কখনও বা মনিকে কোলে করে বজরার ডেকে এসে দ আংগুল বাড়িয়ে দেখায় আকাশে উড়ে চলা শুভ্র বলাকাগুলো।
মনির সামনের মাত্র ক’টা দাঁত উঠেছে। সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাঁতগুলো বের করে ফিক ফিক করে হাসে মনি।
নূরীও হাসে।
২০.
ঝিন্দরাজ্য ছেড়ে যেতে কেন যেন আমার মনে ব্যথা জাগছে সুফিয়া। বজরার ডেকে দাঁড়িয়ে বলল মনিরা।
সুফিয়া দূরে অনেক দূরে ছেড়ে আসা ঝিন্দ শহরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে-ঝিন্দের রাণী তুমি, ঝিল ছেড়ে যেতে তোমার ব্যথা না লাগবে তো লাগবে কার? আমার কিন্তু খুব আনন্দ হচ্ছে।
মনিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল–তোমার আনন্দ হবারই কথা,কারণ তুমি ফিরে আব্বা-আম্মা ভাই-বোনদের সঙ্গে মিলিত হবে, আর আমি–নিঃসঙ্গ একা–চাপাকান্নায় মনিরার কণ্ঠ ধরে এলো।
সুফিয়া আর মনিরার পেছনে কখন যে বিনয় সেন এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি কেউ। মনিরা ফিরে তাকাতেই বিনয় সেন সরে গেল সেখান থেকে। মনিরা বুঝতে পারল তার কথাটা বিনয় সেনের মনে ব্যথা দিয়েছে। বিনয় সেনের চোখ দুটো যে অশ্রু ছলছল হয়ে উঠেছিল এটা লক্ষ্য করেছিল সে।
বজরার ডেকে দাঁড়িয়ে সুফিয়া আর মনিরার মধ্যে অনেক কথা হলো।
মনিরার মনে সর্বহারার বেদনা আর সুফিয়ার হৃদয়ে আপন জনের সঙ্গে মিলন আশার উদ্দীপনা।
দু’দিন দু’রাত অবিরাম চলার পর বিনয় সেনের বজরা এবার মধুমতি নদী বেয়ে–এগুচ্ছে। নদীর মধ্যে সবচেয়ে বড় নদী এই মধুমতি।
মধুমতি গভীর এবং প্রশস্ত নদী হলেও বেশ শান্ত। কাজেই নিশ্চিন্ত মনে বজরাখানা এগিয়ে চলেছে।
রাত গভীর। বজরায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল মনিরার। পাশে অঘোরে ঘুমাচ্ছে সুফিয়া। নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমাচ্ছে। আর কদিন পর পিতামাতার সঙ্গে মিলিত হবে সে।
আর মনিরা চির অসহায় অভাগিনী। অহরহ মনের মধ্যে তার তুষের আগুন জ্বলছে। আহার-নিদ্রা একরকম তার নেই বললেই চলে। খেতে বসলে সবাইকে দেখায় সে খাচ্ছে, কিন্তু আসলে সে কিছুই খেতে পারে না বা খায় না। বিছানায় শুয়ে, চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে, কিন্তু ঘুমায় না ঘুমাতে পারে না।
সুফিয়া জানে মনিরা ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু ঘুম আসে না। মিছামিছি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে বিছানায়। আজও তেমনই শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল কত কি ভাবছিল সে, কখন, যে একটু তন্দ্ৰামত এসেছিল খেয়াল নেই তার। হঠাৎ জেগে উঠল মনিরা, শুনতে পেল সে একটা অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর। পাশের ক্যাবিনে কে যেন কাউকে বলছে–চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে আমাদের বজরা চালাবে, বুঝেছ?
