১৭.
দুশ্চরিত্র লম্পট রাজা মঙ্গলসিন্ধ রাজচ্যুত এবং বন্দী হওয়ায় প্রজাদের মনে আনন্দ ধরে না। সেই সঙ্গে মন্ত্রী কঙ্করসিং বন্ধী হওয়ায় প্রজারা অত্যন্ত খুশি হয়েছে।
মহারাজ জয়সিন্ধের অকস্মাৎ মৃত্যু প্রজাদের হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। প্রজাদের মনে আশংকা ছিল মহারাজের মৃত্যুর পর রাজ্যের কি পরিণতি হবে। মঙ্গলসিন্ধ রাজা হলে তাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠবে, এটা তারা মনে প্রাণে উপলব্ধি করত।
মহাপ্রাণ রাজার মৃত্যুর পর মঙ্গলসিন্ধ যখন রাজা হলো, এবং তার অসৎচরিত্র বন্ধুবর কঙ্করসিংকে যখন মন্ত্রী করা হলো তখনই প্রজাদের মুখ কাল হয়ে উঠল, চোখে সবাই অন্ধকার দেখতে লাগল। এবার তার অবস্থা যে কি দাঁড়াবে তাই চিন্তা করতে লাগল সবাই।
প্রজাগণ যা ভেবেছিল তাই সত্য হলো। মঙ্গলসিন্ধ রাজা হওয়ার পর রাজ্যময় শুরু হলো এক অশান্তির জ্বালাময় পরিস্থিতি। প্রজাদের ধরে এনে অযথা নির্যাতন শুরু হলো। কাউকে কারাগারে বন্দী করা হলো, কাউকে দাসরূপে ব্যবহার করতে লাগল, কারও স্ত্রী-কন্যা মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্করসিংয়ের দৃষ্টিপথে পতিত হলে তার নিস্তার নেই, বাগানবাড়িতে তাকে চাই-ই-চাই।
মহারাজ জয়সিন্ধ থাকাকালীন কুমার মঙ্গলসিন্ধ প্রজাদের ওপর অত্যচার উৎপীড়ন করলেও তাকে করতে হত গোপনে। অনেক সময় এজন্য পিতার নিকট কুমারকে কঠিন শাস্তিও পেতে হত। কাজেই প্রজাদের ওপর নির্যাতন করে তার তৃপ্তি হত না।
সে কারণেই কঙ্করসিংয়ের পরামর্শে মঙ্গলসিন্ধ পিতাকে হত্যা করেছিল এবং নিজে রাজসিংহাসনে উপবেশন করে প্রজাদের প্রতি স্থলে। মুনিবা ঝিন্দের বন্যায়বিচারে বিনা করতের কোন অঙ্গ চালাচ্ছিল নির্মম অত্যাচার। বিনা দোষে বহু নিরীহ প্রজা মঙ্গলসিন্ধের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিতে লাগল। কাউকে স্ত্রী-কন্যা সঁপে দিয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে, কেউ বা কলংকের কালিমা মুছে ফেলার জন্য ঝিন্দ নদীতে আত্মবিসর্জন দিয়েছে।
রাজা মঙ্গলসিন্ধ আর মন্ত্রী কঙ্করসিংয়ের অত্যাচারে দেশবাসী যখন অতিষ্ঠ ঠিক সেই মুহূর্তে ঝিন্দের সিংহাসনে ঝিন্দের রাণী হিসেবে অধিষ্ঠিত হলো মনিরা।
মনিরা ঝিন্দের রাণী হয়ে বিনয় সেনের পরামর্শমত রাজ্য চালনা করতে লাগল। রাণীর ন্যায়বিচারে ঝিন্দবাসীর মনে আনন্দ আর ধরে না। সবাই মনেপ্রাণে ঝিরাণীর মঙ্গল কামনা করতে লাগল।
বিনয় সেনের সহযোগিতায় রাজ্য চালনায় মনিরার কোন অসুবিধা হলো না।
এখানে মনিরা যখন ঝিন্দের রাণী তখন শূন্য বজরায় সুফিয়া একা একা অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। আজকাল বিনয় সেনও সব সময় বজরায় আসে না। তবু সুফিয়ার মনে সদা ভয়, না জানি আবার কখন কোন বিপদ এসে পড়বে।
বিনয় সেন একদিন বজরায় ফিরে এলে বলল সুফিয়া–ভাইজান মনিরার কোন সন্ধান পেলেন?
আজ বিনয় সেনের চেহারায় একটা আনন্দ ভাব ফুটে উঠেছে। শুধু ঝিন্দের রাজসিংহাসনে ঝিন্দের রাণী হিসেবে মনিরাই প্রতিষ্ঠিতা নয়, দুষ্ট রাজা মঙ্গলসিন্ধ ও শয়তান মন্ত্রী কঙ্কর সিং বন্দী। বিনয় সেন এখন ঝিন্দের কাজ অনেকটা গুছিয়ে এনেছে। এখন বাকী ঝিন্দ সিংহাসনে উপযুক্ত রাজা, সে কাজও প্রায় ঠিক করে ফেলেছে বিনয় সেন, এখন শুধু বিজয়সিন্ধকে এনে ঝিন্দের রাজা হিসেবে অভিষেক করা। সুফিয়ার কথায় বলল সে মনিরার সন্ধান আমি পেয়েছি বোন, সে এখন ঝিন্দের রাণী।
বলছেন কি ভইজান, এ কথা সত্য।
হাঁ, সত্য।
তাহলে কি রাজা মঙ্গলসিন্ধ তাকে–
না, বিয়ে করে রাণী নয়, মনিরা মঙ্গলসিন্ধ ও তার দুষ্ট মন্ত্রী কঙ্করসিংকে বন্দী করে রাণী হয়েছে।
সত্যি?
হাঁ সত্যি!
কি যে আনন্দ হচ্ছে আমার! আচ্ছা ভাইজান, তাহলে মনিরাকে আমি আর কোনদিন দেখতে পাব না?
পাবে সুফিয়া। সে কান্দাই শহরের মেয়ে, ঝিন্দে সে চিরদিন থাকতে পারবে না, কাজেই সে আবার তোমার সঙ্গে মিলিত হবে এবং কান্দাই শহরে ফিরে যাবে।
তাহলে ঝিন্দের রাজসিংহাসনের অবস্থা কি হবে?
ঝিল রাজ্যের ন্যায্য অধিকারী ব্যক্তিই রাজা হবেন এবং অচিরেই হবেন।
মনিরার ফিরে আসার কথা শুনে সুফিয়ার মনে অনাবিল একটা আনন্দস্রোত বয়ে চলল।
বিনয় সেন বুঝতে পারল, সুফিয়া মনিরার আগমন আশায় খুশিতে আত্মহারা হয়েছে। আর কতদিন বেচারী এমন একা একা নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে পারে।
১৮.
ঝিন্দের রাণীর ন্যায়বিচারে একদিন পিতৃহন্তা রাজকুমারের ফাসি হয়ে গেল। আর কঙ্কর সিংয়ের হলো দ্বীপান্তর। বহুদূরে নীল সাগরের ওপারে তাকে রেখে আসা হলো।
এবার বিনয় সেন ঝিন্দ রাজ্যের উপযুক্ত লোক বিজয়সিন্ধকে ঝিন্দ রাজসিংহাসনে বসল। অভিষেক করল বিনয় সেন নিজে।
ঝি রাজ্যের প্রজাগণ পূর্ব হতেই বিজয় সিন্ধকে জানত। তার ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ ছিল। বিজয়সিন্ধ ঝিন্দের রাজসিংহাসনে আরোহণ করায় ঝিন্দ রাণীর মনে আনন্দের উৎসব বয়ে চলল। সবাই খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে উৎসবে মেতে উঠল। ঝিন্দ নগরী আলোয় আলোময় হয়ে উঠল।
বিজয়সিন্ধ ঝিন্দের বাজার হলো। এবার ঝিরাণী মনিরা প্রজাদের কাছে বিদায় নিয়ে বিনয় সেনের সঙ্গে ফিরে এলো তার বজরায়।
ঝিন্দারাণীকে বিদায় দিতে ঝিন্দবাসীদের চক্ষু অশ্রুসজল হলো। দু’মাস ঝিল রাজসিংহাসনে উপবেশন করেছিল মনিরা ঝিরাণী হিসেবে। এ দু’মাস প্রজাদের সুখের অন্ত ছিল না। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিল প্রজাগণ। বিনয় সেনের সহযোগিতায় ‘মনিরা প্রজাদের ওপর ন্যায়বিচার করেছে। যাতে প্রজাদের মঙ্গল হয় সে কাজ করেছে, তাই মনিরাকে বিদায় দিতে ঝিন্দাবাসীর মনে দুঃখের ছোয়া লাগল।
