বলুন গুরুদেব?
ঝিন্দ রাজসিংহাসনে উপযুক্তা রাণীর প্রতিষ্ঠা হয়েছে দেখে অনেক খুশি হলাম।
এ আপনার অনুগ্রহ দেব।
এবার বিচার চাই।
বিচার?
হাঁ, আমার ওপর স্বপ্নদেশ হয়েছে, মহারাজ জয়সিন্ধের হত্যার বিচার হোক।
মঙ্গলসিন্ধ একবার মন্ত্রী কঙ্করসিংয়ের মুখে দিকে তাকিয়ে নিল।
মন্ত্রী কঙ্করসিং দৃষ্টি নত করে নিল, তার মনোভাব হত্যাকারীর বিচার হওয়াই প্রয়োজন। মনে মনে এটাই কামনা করে সে। কাজেই কংকর সিং নীরব রইল।
সন্ন্যাসী তার আশা বার কয়েক মাটিতে ঠুকে বললেন রাণী, এই বিচার করুন। আমি এই কক্ষের সকলেরই হাত গণনা করব।
সন্ন্যাসী নিজের হাত বাড়ালেন–চক্ষুদ্বয় তখনও মুদিত, বললেন তিনি–আমি কারও মুখ বা হাতের রেখা চোখে দেখব না শুধু স্পর্শ করে বলব।
মঙ্গলসিন্ধের বুকের মধ্যে তখন টিপ টিপ শুরু হয়েছে। সর্বনাশ হবে–এবার উপায়?
ইতোমধ্যে রাজকর্মচারীগণ একে একে উঠে দক্ষিণ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন সন্ন্যাসী বাবাজীর দিকে।
সন্ন্যাসী সবাইকে তাদের মনোভাব প্রকাশ করে বলে দিচ্ছেন। অদ্ভুত মশল সন্ন্যাসীর।
ভয়বিহ্বলে মঙ্গলসিন্ধ বারবার তাকাচ্ছে সন্ন্যাসীর দিকে। হঠাৎ বলেই বসল সে–গুরুদেব, রাজদরবারের সকলের হাত স্পর্শ করেই আপনি সকলের মনের কথা বলে দিলেন। এবার সকলেরই হাত দেখা শেষ হয়েছে, আমার পিতার হত্যাকারী রাজদরবারে নেই।
সন্ন্যাসী বিড় বিড় করে মন্ত্র পাঠ করলেন, তারপর বললেন–আমি যোগবলে জানতে পারছি মহারাজ জয়সিন্ধের হত্যাকারী এই রাজদরবারেই রয়েছে।
এ্যাঁ, বলেন কি গুরুদেব। কে সে হত্যাকারী নরাধম? আমার পিতাকে যে হত্যা করেছে তাকে এই মুহূর্তে আমি বন্দী করব।’
সন্ন্যাসী বললেন–ঝিন্দরাণী, আপনি আপনার সৈন্যদের আদেশ করুন মহারাজ জয়সিন্ধের হত্যাকারীকে বন্দী করতে। আমি এই মুহূর্তে আমার গণনা–
মঙ্গলসিন্ধ ভয়ার্তকণ্ঠে বলল–বিনয় সেনকে আমি রাজদরবারে দেখছি, নিশ্চয়ই সেই আমার নিরপরাধ পিতাকে হত্যা করেছে এবং সেই কারণেই সে আজ রাজদরবারে আসেনি।
সন্ন্যাসী বললেন–আমারও তাই মনে হচ্ছে, কিন্তু এখনও দু’জনের হাত দেখা বাকী আছে। আসুন রাজা মঙ্গলসিন্ধ, আপনার হাত খানা দিন। আসুন, বিলম্বে অমঙ্গল হবে।
মঙ্গলসিন্ধ কম্পিত পদক্ষেপে এগিয়ে গেল সন্ন্যাসীর দিকে। অতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতখানা এগিয়ে দিল।
সংগে সংগে সন্ন্যাসী অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন–আমি এটা কার হাত স্পর্শ করেছি?
রাজদরবারের সকলেই একসঙ্গে উচ্চারণ করলেন–কুমার মঙ্গল সিন্ধের।
চিৎকার করে উঠলেন সন্ন্যাসী—বিশ্বাস হচ্ছে না, আমি চক্ষু খুললাম–
চোখ মেলে মঙ্গলসিন্ধকে দেখে বলে উঠলেন সন্ন্যাসীকুমার, আপনি পিতৃহন্তা।
সেই মুহূর্তে ঝিরাণী মনিরা কঠিনকণ্ঠে বলল–গ্রেফতার কর পিতৃহন্তা মঙ্গলসিন্ধকে।
অমনি সশস্ত্র সৈনিক মঙ্গলসিন্ধকে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের উদ্যত তরবারির অগ্রভাগ গিয়ে ঠেকলো মঙ্গলসিন্ধের বুকে। হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হলো।
এবার সন্ন্যাসী মন্ত্রী কঙ্করসিংয়ের দিকে হাত বাড়াল–এসো বৎস তোমার হাত দেখা এখনও বাকী।
কঙ্কর সিং জানত সন্ন্যাসী অন্য কেউ নয়, বিনয় সেন এবং তার সঙ্গে পরামর্শ করেই সে এ কাজ করেছে, কাজেই সে অতি সহজেই এগিয়ে গেল সন্ন্যাসীর দিকে।
সন্ন্যাসী কঙ্কর সিংয়ের হাত ধরে বিড় বিড় করে কিছু মন্ত্র পাঠ করলেন তারপর বললেন–রাজা মঙ্গলসিন্ধের পিতৃহত্যার পরামর্শ দাতা এই মন্ত্রীবর, একেও গ্রেফতার করা হোক।
মুহূর্তে কঙ্করসিং ভয়ংকর এবং হিংস্র মূর্তি ধারণ করল, সঙ্গে সঙ্গে তরবারি খুলে আঘাত করল সন্ন্যাসীর মাথায়।
সন্ন্যাসী ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সরে দাঁড়াল, আঘাত তার আসনে গিয়ে বিদ্ধ হল।
রাণী আদেশ দিল–বন্দী কর–মন্ত্রীকে, বন্দী কর।
সৈনিকগণ এবার মন্ত্রীবর কঙ্করসিংকেও বন্দী করে ফেলল।
মঙ্গলসিন্ধ এবং কঙ্করসিং বন্দী হয়ে হিংস্র জন্তুর মত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। মঙ্গলসিন্ধের দু’চোখে রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ ফুটে উঠেছে আর কঙ্করসিংয়ের চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে, দাঁতে দাঁত পিষে বলল–বিনয় সেন, তোমার ভণ্ডামি বুঝতে পেরেছি। সেই কারণেই তুমি আমার নিকটে মহারাজ হত্যার গোপন রহস্য জেনে নিয়েছ। তোমাকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করব না।
বিনয় সেন তখন নিজের সন্ন্যাসী ড্রেস খুলে ফেলল। মঙ্গলসিন্ধ হুঙ্কার ছাড়ল এবার–শয়তান বিনয় সেন তুমি, মিথ্যা সন্ন্যাসী সেজে আমাকে ধোঁকা দিয়েছ। সৈনিকগণ আমি রাজা, আমার আদেশ বিনয় সেনকে গ্রেফতার কর! গ্রেফতার কর!
কিন্তু রাজদরবারের সবাই মঙ্গলসিন্ধ ও কঙ্কর সিং বন্দী হওয়ায় যারপরনাই খুশি হয়েছেন। মহারাজ হত্যারহস্য উদঘাটন হওয়ায় সকলেই বিনয় সেনের বুদ্ধির প্রশংসা করছেন, সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন–ঝিরাণী কি জয়! ঝিরাণী কি জয়! বিনয় সেন কি জয়–
সৈনিকগণ মঙ্গলসিন্ধের কথা কানেও নিল না। সবাই এক সঙ্গে ন্দিরাণী আর বিনয় সেনের জয়ধ্বনিতে রাজদরবার মুখরিত করে তুলল।
রাগে, ক্ষোভে, ক্রোধে মঙ্গলসিন্ধের মুখমণ্ডল কাল হয়ে উঠেছে। কঙ্কর সিং ক্রুদ্ধ সিংহের মত দাঁত কড়মড় করছে, এই মুহূর্তে ছাড়া পেলে সে দেখে নিত বিনয় সেনকে। কিন্তু সে সুযোগ দিল না সৈনিকগণ। ঝিন্দারাণীর আদেশে মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্করসিংকে বন্দী অবস্থায় দরবারকক্ষ থেকে নিয়ে গেল কারাগারের দিকে।
