বিনয় সেন ভাবছে বিজয়সিন্ধের কথা।
বিজয়সিন্ধ ভাবছে বিনয় সেনের কথা।
কথা বলল বিনয় সেন–রাজপুরী থেকে এলেও আমি রাজ আদেশে আসিনি।
আপনি কি তবে নিজের ইচ্ছামত এসেছেন?
হাঁ, একটা গোপনীয় কথা আছে বিজয়সিন্ধ।
বলুন?
আমি জানি আপনি মহারাজ জয়সিন্ধের অতি আদরের ভাগিনা।
হাঁ, মামা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
অবশ্য তার কারণ ছিল।
কারণ, কি কারণ থাকতে পারে বিনয় সেন? মামা যদি ভাগিনাকে আদর করে তার কারণ–
আছে, কারণ তাঁর পুত্র মঙ্গলসিন্ধ মানুষ নয়। মহারাজ জয়সিন্ধ নিজ পুত্রকে কোনদিন বিশ্বাস করতেন না।
বিজয়সিন্ধ নিশ্চুপ রইল।
বিনয় সেন বলে চলে–জয়সিন্ধ পুত্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি জানতেন তার অভাবে সুষ্ঠুভাবে রাজ্য চালনা মঙ্গলের পক্ষে অসম্ভব হবে। প্রজাদের দুঃখের সীমা থাকবে না। তাই প্রজাদরদী রাজা আপনাকেই তাঁর রাজ-সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন।
এ কথা আপনি জানলেন কি করে? এটা তিনি নিজের মনের মধ্যে পোষণ করতেন বটে এবং তা একমাত্র জানত মঙ্গল—
আমিও জানতাম বিজয়সিন্ধ, আর জানতাম বলেই আজ আমি আপনার নিকটে এসেছি।
কারণ? কারণ, ঝিন্দ রাজসিংহাসনে উপযুক্ত রাজার প্রয়োজন।
মুহূর্তে বিজয়সিন্ধের মুখ কাল হয়ে উঠল আপনি আমাকে রাজ্যের মোহ দেখিয়ে–
না না, আপনি ভুল বুঝছেন বিজয়সিল্ক, আমি আপনার হিতৈষী।
রাজ্যলোভ আমার নেই, আপনি যেতে পারেন। তাছাড়া মঙ্গলই আপনাকে পাঠিয়েছে আমার মনোভাব জানতে, তাই নয় কি?
না, মঙ্গলসিন্ধ আমাকে পাঠাননি বা আমি তার কথাতে আসিনি।
তবে?
আমি একজন ঝিন্দ নাগরিক। আমি ঝিরাজ্যের অধিবাসীগণের মনের ব্যথা সর্বান্তকরণে উপলব্ধি করে রাজকাজে নিযুক্ত হয়েছি। প্রজাদের দুঃখ বেদনা যে রাজা বুঝে না, তাকে সরিয়ে সিংহাসনের উপযুক্ত লোককে রাজসিংহাসনে বসাতে চাই। এটা আমার কল্পনা নয়, আমার আন্তরিক বাসনা। বিজয়সিন্ধ, আপনি আমার অনুরোধ অবহেলা করবেন না। কথা দিন।
আপনি যা বলছেন তা সম্ভব নয়। কেন?
প্রথমত, রাজ্যলোভ আমার নেই, দ্বিতীয়ত মঙ্গল এখন ঝিন্দের রাজা, তৃতীয়ত রাজা হবার যোগ্যতা আমার নেই।
বিনয় সেন হাসল–রাজ্যলোভ আপনার নেই, এ আমি জানি, আর নেই বলেই আপনি রাজা হবার যোগ্য ব্যক্তি। মঙ্গলসিন্ধ রাজা হবার একেবারে অযোগ্য কাজেই তাকে রাজসিংহাসন থেকে সরাতে হবে।
বিনয় সেন, আমি অন্যায় কোনদিন মানি না। মঙ্গল আযোগ্য হলেও সে রাজসিংহাসনের অধিকারী, আমি এ কথায় রাজী হতে পারি না।
মঙ্গলসিন্ধ রাজসিংহাসনের অধিকারী হলেও প্রজাগণ তাকে চায় না। প্রজাদের মঙ্গল সাধনই তো রাজধর্ম। কিন্তু মঙ্গলসিন্ধ তার বিপরীত, সে প্রজাদের রক্ত শুষে নিচ্ছে। প্রজাদের ওপর চালাচ্ছে অকথ্য অত্যাচার। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তাদের স্ত্রী-কন্যা জোর করে নিয়ে এসে করছে ব্যভিচার-বিজয়সিন্ধ এতে শুনেও কি আপনার মনে দয়া হয় না? আপনার নিজের জন্য নয়, প্রজাদের সুখের জন্য আপনাকে ঝিন্দ রাজসিংহাসনে উপবেশন করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানই তো মানবধর্ম।
বিনয় সেনের মুখের দিকে নিস্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে বিজয় সিন্ধ। অনেকটা নরম হয়ে আসছে সে। বলল এবার মঙ্গল সিন্ধ রাজা হবার অযোগ্য হলেও সে এখন রাজসিংহাসনের অধিকারী, কাজেই
আপনি শুধু মত করুন বিজয়সিন্ধ আর সমস্ত দায়িত্ব আমার।
বেশ, ন্যায়ের জন্য আমি আপনার কথা মেনে নিলাম।
বিনয় সেন উঠে দাঁড়াল–এত রাতে আপনাকে বিরক্ত করলাম বলে আমাকে ক্ষমা করবেন।
বিজয়সিন্ধ আবেগভরা গলায় বলল–আপনার ব্যবহারে আমি, তুষ্ট হয়েছি। রাজকর্মচারী হয়ে আপনি এত সদয় সেজন্য সত্যি আমার আনন্দ হচ্ছে।
আচ্ছা চলি তাহলে, যখন ডাকব তখন কিন্তু চাই আপনাকে।
নিশ্চয়ই! আপনার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারব না।
বিনয় সেন বেরিয়ে যায়।
নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে বিজয়সিন্ধ, ভাবে আশ্চর্য এই যুবক! যেমন সুন্দর চেহারা তেমন অদ্ভুত সুন্দর ব্যবহার ও কথাবার্তা।
১৬.
মনিরা আজ ঝিন্দের রাণী।
মণিমাণিক্য খচিত রাজকীয় পোশাক তার শরীরে শোভা পাচ্ছে। মাথায় মুকুট। হাতে ঝি রাজ্যের প্রতীক ন্যায়দণ্ড।
স্বর্ণ সিংহাসনে উপবিষ্টা মনিরা।
রাজদরবারে স্ব স্ব আসনে উপবিষ্ট রাজকর্মচারিগণ।
মনিরা তাকায় একটি আসন শূন্য। অনুমানে বুঝে সে এটাই বিনয় সেনের আসন, কিন্তু সে কোথায়?
মনিরা নিজেকে বিপন্ন মনে করে। ঝিন্দের রাজসিংহাসনে সে উপবিষ্ট হয়েছে একমাত্র বিনয় সেনের অনুরোধে, কিন্তু কোথায় সে?
মনিরা মঙ্গলসিন্ধকে লক্ষ্য করে বলল–কুমার, রাজদরবারে সবাই কি এসেছেন?
না, একমাত্র বিনয় সেনকে দেখছি না।
ঠিক সেই মুহূর্তে রাজদরবারে প্রবেশ করলেন জটাজুটধারী সেই সন্ন্যাসী। দক্ষিণ হাতে আশা, বাঁ হাতে চিমটা, মুখে বম বম্ শব্দ। রাজদরবারে সন্ন্যাসীর আগমন হতেই সিংহাসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল ঝিন্দের রাণী মনিরা। সঙ্গে সঙ্গে সবাই উঠে দাঁড়াল, মঙ্গলসিন্ধ কঙ্কর সিং সকলেই—
সন্ন্যাসীর চক্ষুদ্বয় মুদিত, অতি ধীরে ধীরে এগুলেন তিনি। মঙ্গলসিন্ধ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সন্ন্যাসীর হাত ধরে রাজসিংহাসনের পাশে নিজের আসনে বসল। তারপর বিনীত কণ্ঠে প্রশ্ন করল সে—গুরুদেব, আপনার আগমনের কারণ যদি দয়া করে বলেন? হাঁ বলার জন্যই আজ আমার আগমন।
