রাজা মঙ্গলসিন্ধ কার পরামর্শে রাজা জয়সিন্ধকে হত্যা করেছে?
আপনাকে পূর্বেই বলেছি বিনয় সেন, রাজা জয়সিন্ধকে যদিও মঙ্গলসিন্ধ হত্যা করেছে, কিন্তু তাকে উৎসাহিত এবং সুযোগ করে দিয়েছি আমি। তার এই রাজ্যলাভের পেছনে রয়েছে আমার আন্তরিক প্রচেষ্টা।
সত্যি, এজন্য আপনাকে উপযুক্ত পুরস্কার দেয়া উচিত।
হাঁ, আমার বুদ্ধি বলেই সে আজ ঝিন্দের রাজা।
মন্ত্রীবর, আপনি মঙ্গলসিন্ধকে সরিয়ে ঝিন্দের রাজা হলে বিজয়সিন্ধ এসে আপত্তি করে বসতে পারে। কাজেই তাকেও সরাতে হবে।
ঠিক বলেছেন বিনয় সেন, ঝি-রাজ্য লাভ করতে হলে রাজবংশের কাউকে—
জীবিত রাখা চলবে না।
আমার মনের কথাই আপনি বলেছেন বিনয় সেন।
কিন্তু বিজয়সিন্ধকে সরাতে হলে কাজে নামার পূর্বে তার আবাসস্থলের ঠিকানা জানতে হবে।
এটা সামান্য ব্যাপার, বিজয়সিন্ধ ঝিল রাজ্যের জরাসন্ধী নগরে বাস করে। তার পিতামাতা বহুদিন পূর্বে মারা গেছে।
সে এখন কি করে মন্ত্রীবর?
ছবি আঁকা তার নেশা, পেশাও বলা চলে, কারণ বিজয়সিন্ধ নিজের আঁকা ছবি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে।
বিনয় সেন বলল–রাজভাগিনা হয়ে তাকে ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় কেন?
আপনি তাকে জানেন না বলে কথাটা বললেন বিনয় সেন। বিজয়সিন্ধ এত লোক, পরের সাহায্য সে কোন সময় কামনা করে না। তা ছাড়াও তার একটা দোষ আছে, নিজের উপার্জন দিয়ে নিজেরই চলে না, তবু সে শহরের দীন-দুঃখীকে নিজে না খেয়ে বিলিয়ে দেয়। নিজে হয়তো উপোস করে মরে।
নিস্পলক নয়নে কঙ্কর সিংহের কথাগুলো শুনছিল বিনয় সেন, মুখমণ্ডলে তার অপূর্ব একটা জ্যোতির লহরী খেলে যায়। তাড়াতাড়ি বিনয় সেন নিজের মুখমণ্ডলে কঠিন ভাব ফুটিয়ে তোলে।
সেদিন আর বেশিক্ষণ কঙ্কর সিং এবং বিনয় সেনের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলে না।
১৫.
জরাসন্ধী শহরের এক প্রান্তে ফুল্লরা নদী। নদীতীরে পাশাপাশি কয়েকখানা একতলা বাড়ি। নদীতীর ঘেঁষে যে বাড়িটা সেটা বেশ বড় এবং দোতলা। এককালে বাড়ির যে জৌলুস ছিল আজও তা স্পষ্ট বুঝা যায়। কিন্তু বহুদিন বাড়িটা মেরামত না করায় স্থানে স্থানে ধ্বসে পড়েছে। তবু বাড়িখানা দাঁড়িয়ে আছে কাল প্রহরীর মত মাথা উঁচু করে।
নিশীথ রাত।
জরাসন্ধী শহরটা যেন নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঝিন্দ রাজ্যেরই একটা অঙ্গ এই জরাসন্ধী। এ শহর ঝিন্দের মত পর্বত আর পাহাড়ে ঘেরা নয়, শস্যশ্যামলা বনানী ঢাকা একটা পরিচ্ছন্ন শহর।
রাত বেশি হওয়ায় শহরের পথ-ঘাট-মাঠ নীরব নিস্তব্ধ। দ্বাদশীর চাঁদ ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। আকাশে অসংখ্য তারার মেলা। বাতাস বইছে গৃহহারা পথিকের দীর্ঘশ্বাসের মতই থেকে থেকে। ..
ফুল্লরা নদীতীরে দোতলা বাড়িখানার একটা কক্ষে এখনও আলো জ্বলছে। তন্দ্রাচ্ছন্নের মত ক্যানভাসের ওপর তুলির পরশ বুলিয়ে চলেছে রাজা জয়সিন্ধের ভাগিনা বিজয়সিন্ধ। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে চিত্রটি সজীব হয়ে উঠেছে।
শিল্পী ছবি আঁকা শেষ করে নির্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকে তার অপূর্ব এই সৃষ্টির দিকে, অদূরস্থ কোন গীর্জা থেকে সময় সময় সংকেত শোনা যায়। রাত দ্বিপ্রহর।
বিজয়সিন্ধ তখনও নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে তার সম্মুখস্থ চিত্রখানার দিকে।
হঠাৎ চিত্রের উপরে একটা কাল ছায়া এসে পড়ল। চমকে ফিরে তাকাল বিজয়সিল্ক, সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠল কে?
অতি নরম মোলায়েম কণ্ঠস্বর-শত্রু নই-বন্ধু।
কে-কে আপনি?
আমি একজন মানুষ।
আপনার নাম?
বিনয় সেন।
আপনি, আপনি—
হাঁ, আমি ঝিন্দের রাজকর্মচারী।
এখানে কি প্রয়োজন?
প্রয়োজন আছে বিজয়সিল্ক, আসুন কথা আছে আপনার সঙ্গে।
এত রাতে কি এমন কথা রাজকর্মচারী? আপনি কাল ভোরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে অনেক খুশি হতাম।
যে কথার জন্য এই মুহূর্তে আমি এখানে এসেছি, সে অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা।
হাসল বিজয়সিল্ক, তারপর বলল-ঝিন্দের রাজপরিবারের এমন কোন গুরুত্বপুর্ণ কথা থাকতে পারে না যা আমার অতি–
আপনি ভুল করছেন বিজয়সিন্ধ, আপনি আমার কথা শুনুন, আসুন আমার সঙ্গে।
চলুন রাজকর্মচারী, কিন্তু আমার বাড়িতে আপনাকে বসতে দেবার মত রাজকীয় আসন তো নেই।
এবার বিনয় সেনের ভ্রুকুঞ্চিত হল, বলল সে রাজকর্মচারী বলে কেন আপনি আমাকে উপহাস করছেন?
উপহাস করিনি বিনয় সেন, যা সত্য তাই বলেছি। শুনেছি আপনি রাজা মঙ্গলসিন্ধের দক্ষিণ হাত। আপনি মঙ্গলের রাজকর্মচারী হতে পারেন কিন্তু আমার কাছে আপনি একজন সাধারণ মানুষ ছাড়া কিছু নন।
হাঁ, তাই আমি চাই, আমি এখানে রাজকর্মচারী হিসেবে আসিনি, এসেছি একটি কথার জন্য।
কথা?
হাঁ, মঙ্গলসিন্ধ বা রাজপরিবারের কেউ আমাকে পাঠাননি।
তবে?
আমি—আমি এসেছি দয়া করে যদি আমার কথা শোনেন।
বিজয়সিন্ধ বিনয় সেনসহ নিজের শয়নকক্ষে এসে আসন গ্রহণ করল।
উভয়ে তাকিয়ে আছে উভয়ের মুখের দিকে।
বিজয় সেন লোকমুখে শুনেছে, বিজয় সেন রাজা মঙ্গলসিন্ধের সঙ্গীসাথী বা অনুচর। শয়তান মঙ্গলসিন্ধের সঙ্গী ও সাথী তারই মত কুৎসিত, কুচরিত্র, দুষ্টলোক হবে। কিন্তু বিজয়সিন্ধ যতই বিনয় সেনকে দেখছে ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার কথাবার্তা বা চালচলনেও তো নেই কোন দুষ্ট মনোভাব।
বিনয় সেনও বিজয় সিন্ধের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক নয়নে বিজয়সিন্ধ শুধু সুন্দর পুরুষই নয়, একজন মহাপুরুষও বটে। সে যে একজন গুণী লোক তা তার চেহারায় ফুঠে উঠেছে। বিনয় সেন বুঝতে পারেন, কঙ্কর সিং-এর একটি কথাও মিথ্যা নয়। বিজয়সিন্ধ সত্যই অতি মহৎ ব্যক্তি।
