মনিরা সংকুচিতভাবে দক্ষিণ হাতখানা বাড়িয়ে দিল সন্ন্যাসীর দিকে।
সন্ন্যাসী মনিরার হাত স্পর্শ করে বিড় বিড় করে মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন।–
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করল মঙ্গলসিন্ধ, কড়জোড়ে বলল–গুরুদেব হয়েছে!
হ্যাঁ হয়েছে বৎস! আমি যোগমন্ত্রদ্বারা এই যুবতীকে ঝিন্দের রাণী হবার যোগ্যতা সমর্পণ করলাম। এবার মনিরার হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন সন্ন্যাসী–আসুন, এবার আমাকে রাজ-অন্তপুরের বাইরে নিয়ে চলুন। পস্যার সময় আগত, বিলম্বে অমঙ্গল ঘটতে পারে।
মঙ্গলসিন্ধ সন্ন্যাসীর হাত ধরে তাকে কক্ষের বাইরে নিয়ে গেল।
মনিরা এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। যাক বিনয় সেন তাহলে তার সন্ধান পেয়েছেন। এবার আর ভয়ের কোন কারণ নেই। হেমাঙ্গিনীর হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবার রাজা মঙ্গলসিন্ধের হাত থেকে তিনি রক্ষা করলেন। বিনয় সেনের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল মনিরার মন। চোখের পানি মুছে এলো চুলগুলো খোপা করে বেঁধে পুনরায় শয্যায় গিয়ে বসল এখন তার মুখমণ্ডল পূর্বের ন্যায় গম্ভীর থমথমে নয়, চোখ দুটো অশ্রুভারাক্রান্ত নয়, একটা প্রসন্ন ভাব মুখে ফুটে উঠেছে।
১৪.
কঙ্কর সিং বিনয় সেনের হাত দু’খানা চেপে ধরল। নরম মোলায়েম গলায় বলল-আপনিই এখন আমার একমাত্র ভরসা, সহায় সম্বল। আমি ঐ যুবতীর জন্য পাগল হয়ে যাব। অহরহ আমার মনে ঐ একটি মাত্র মুখ জেগে আছে। বলুন বিনয় সেন, তাকে কি পাব?
সেই কারণেই তো আমি সন্ন্যাসীর বেশে রাজা মঙ্গলসিন্ধের রাজ দরবারে গিয়েছিলাম। মন্ত্রীবর শুধু সেই সুন্দরী লাভই হবে না, তার সঙ্গে রাজ্যলাভও হবে।
।বিনয় সেন কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব, ভেবে পাচ্ছি না। দেখুন আমি রাজা হবার পর আপনাকে মন্ত্রী করবো।
মন্ত্রী!
হাঁ বিনয় সেন, আপনাকে আমি ঝিন্দ রাজ্যের মন্ত্রী করব।
খুশি হলাম। কিন্তু রাণী থাকাকালীন নয়, আপনি যখন রাজ সিংহাসনে উপবেশন করবেন তখন আপনি আমাকে যে পদে প্রতিষ্ঠিত করবেন, তাই হব। একটা কথা আমি জিজ্ঞাসা করব?
করুন?
আচ্ছা মন্ত্রীবর, আপনি রাজপরিবারের সমস্ত খবরই অবগত আছেন, তাই না?
হাঁ, রাজপরিবারের এমন কোন কথা বা কাজ নেই যা আমি জানি না। বিনয় সেন বেশ কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে মুখ তুলল তারপর বলল–মঙ্গলসিন্ধকে রাজ-সিংহাসনচ্যুত করে আপনাকে যখন আমরা ঝিন্দের রাজা করব তখন রাজা জয়সিন্ধের কোন বংশধর যদি প্রতিবাদ জানিয়ে বসে বা সে নিজে রাজ সিংহাসনে উপবেশনের দাবী জানায়?
এবার কঙ্কর সিং বেশ ভাবাপন্ন হল, ললাটে চিন্তারেখা ফুটে উঠল–বিনয় সেন, আপনি যা বলেছেন অতীব সত্য। মঙ্গলকে পৃথিবী থেকে বিদায় দিতে আমার বেশি বেগ পেতে হবে না কিন্তু–থামল কঙ্কর সিং।
বিনয় সেন বলল–কিন্তু কি মন্ত্রীবর?
হাঁ আছে, রাজা জয়সিন্ধের ভগ্নি মায়ারাণীর এক পুত্র বিজয়সিন্ধ আছে। সে অতি নিষ্ঠাবান সৎচরিত্রবান যুবক। মামার মৃত্যুর পর সে একবার ঝিন্দে এসেছিল, কিন্তু মঙ্গলসিন্ধের আচরণে সে দুঃখিত ব্যথিত হয়ে স্বদেশে ফিরে গেছে। রাজা জয়সিন্ধ তার এই ভাগিনাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। অনেক সময় মঙ্গলের ওপর রাগ করে তাকে ঝি রাজ্যের রাজা করবেন বলে বলতেন। মঙ্গলের পিতৃহত্যার আর একটা কারণ রাজা জয়সিন্ধের এই উক্তি।
বিনয় সেন তন্ময় হয়ে শুনছিল কঙ্কর সিংয়ের কথাগুলো, এবার বললরাজা জয়সিন্ধ তাহলে ভাগিনা বিজয়সিন্ধকে রাজা করার মনোবাসনা পোষণ করতেন?
হাঁ, কারণ মঙ্গলসিন্ধের ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত ও ব্যথিত ছিল।
বিজয়সিন্ধ কি জয়সিন্ধের আপন ভগ্নির গর্ভজাত পুত্র?
হাঁ, এবং সে কারণেই আমি নিশ্চিন্ত নই বিনয় সেন। যদিও বিজয়সিন্ধ একজন মহৎ ব্যক্তি তবু মঙ্গলসিন্ধের অভাবে সে নিশ্চয়ই নিশ্চুপ থাকবে বলে মনে হয় না।
গভীর চিন্তারেখা ফুটে ওঠে বিনয় সেনের ললাটে। কিছুক্ষণ মৌন থেকে বলল সে–ভাববার কথা, মঙ্গলসিন্ধের অভাবে সে ঝিন্দের রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এটাও সত্য।
তাহলে কি করা যায় বিনয় সেন? আপনার ওপরই আমার সমস্ত আশাখাসা নির্ভর করছে।
ব্যস্ত হবেন না, মন্ত্রীবর, ধৈর্য ধারণ করুন।
কিন্তু কত দিন?
যতদিন না মঙ্গলসিন্ধ পৃথিবী থেকে মুছে যায়। পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ তাকে পেতেই হবে।
আমিও যে তাকে সহায়তা করেছিলাম বিনয় সেন।
আপনি তো রাজ-সিংহাসন লাভ করতে চলেছেন মন্ত্রীবর।
আমি সেই অনিন্দ্যসুন্দরী তরুণী—
ঝিন্দের রাণী হলে সে তো আপনার হাতের মুঠায় থাকবে।
বিনয় সেন, আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি, তার সঙ্গে এই নিন আমার কণ্ঠের মুক্তার মালা।
ওটা আমি কি করব মন্ত্রীবর। আপনি মন্ত্রী, মুক্তার মালা আপনার গলাতেই শোভা পায়।
তবে কি দেব আপনাকে বলুন?
যখন রাজ সিংহাসন এবং রাণী দুটো আপনার হাতে আসবে তখন আপনি যা দেবেন তাই আমি খুশিমনে গ্রহণ করব।
সত্যি আপনার মত মহৎ ব্যক্তি আর নেই ইহজগতে। ঝিন্দের রাজা হবার পর আপনাকে আমি রাজমন্ত্রী করব কথা দিলাম।
আচ্ছা সে হবে তখন।
বিনয় সেন কিছুক্ষণ পায়চারী করলো, তারপর বলল–মন্ত্রীবর এবার কয়েকটি প্রশ্ন করব আপনাকে, সঠিক জবাব দেবেন। কারণ, কার্যক্ষেত্রে পদার্পণ করলে প্রয়োজন হতে পারে।
বলুন বিনয় সেন, আপনি যা জানতে চাইবেন তারই জবাব পাবেন। আমি সত্যি কেমন যেন বিভোর হয়ে পড়েছি। ঝিন্দ রাজ্য আমার চাই, তার সঙ্গে চাই সেই তরুণী। তাকে দেখা অবধি আমার হৃদয়ে এক ফোটা শান্তি নেই সব সময় তার চিন্তা আমাকে দগ্ধীভূত করে চলেছে।
