মঙ্গলসিন্ধ ধ্যানগ্রস্তের মত এতক্ষণ সন্ন্যাসী বাবাজীর কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল সন্ন্যাসী যা বলছেন তা অতীব সত্য। কারণ, যে নারীকে সে অজানা এক বজরা থেকে নিয়ে এসেছে ঠিক তার সংগেই তো মিলে যাচ্ছে সন্ন্যাসী বাবাজীর কথা। বলল মঙ্গলসিন্ধ-বাবাজী, আপনি অনুগ্রহ করে আমার অন্তপুরে চলুন, নিরালায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করব।
চলুন মহারাজ, চলুন। আপনার মঙ্গল কামনাই আমার ধর্ম। উঠে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী বাবাজী।
মঙ্গলসিন্ধ তার রাজদরবারে সকলের নিকটে তখনকার মত বিদায় নিয়ে সন্ন্যাসী বাবাজীসহ রাজ-অন্তপুরে প্রবেশ করল।
১২.
নিজের বিশ্রামকক্ষে এসে বসল মঙ্গলসিন্ধ। সন্ন্যাসী বাবাজীকে তার নিজের শয্যা ছেড়ে দিল, আপনি আমার শয্যায় আরামে বসুন।
সন্ন্যাসী বাবাজী দুগ্ধফেননিভ শুভ্র বিছানায় জেঁকে বসলেন, তারপর বললেন-বৎস, এবার আপনি মনের কথা অকপটে ব্যক্ত করতে পারেন।
মঙ্গলসিন্ধ ভক্তি গদগদ কণ্ঠে বলল–আপনি যা স্বপ্নে অবগত হয়েছেন তা সত্য।
আমি সব জানি বৎস, সব জানি। স্বপ্নে আমি সবই অবগত হয়েছি।
বাবজী, আমার অন্তপুরে একটি তরুণী আবদ্ধা রয়েছে।
আবদ্ধা…বলেন কি! তবে যে আমি স্বপ্নে জানতে পারলাম তাকে আপনি সসম্মানে..
গুরুদেব, আপনি ভুল বুঝবেন না। আবদ্ধা হলেও আমি তার প্রতি অন্যায় আচরণ করিনি।
খুশি হলাম বস, কারণ যে নারী এখন আপনার অন্তপুরে স্থান লাভ করেছে, সে অতি পবিত্র-দেবী সমতুল্য।
আমি তাকে বিয়ে করে রাণী করতে চাই গুরুদেব।
খুশি হলাম বৎস, কিন্তু বিয়ের পূর্বেই তাকে রাজসিংহাসনে বসিয়ে রাণী করতে হবে। তারপর ছ’মাস সে রাজ-সিংহাসনে উপবিষ্টা থাকার পর তাকে মহাধুমধামের সঙ্গে বিয়ে করতে হবে।
আপনার কথা শিরধার্য গুরুদেব! আমি তাকে আমার সিংহাসনে বসিয়ে তাকে রাণী করব কিন্তু সে যদি রাণী হতে আপত্তি জানায়? এবং যতদূর সম্ভব সে নারী কিছুতেই রাণী হতে চাইবে না।
তাহলে তাকে কোনদিন আপনি স্পর্শ করতে পারবেন না, করলে আপনার মৃত্যু হবে। আচ্ছা, আজ আমি চলি, আমার জপের সময় প্রায় আগত। সন্ন্যাসী বাবাজী উঠে দাঁড়ালেন।
মঙ্গলসিন্ধও সন্ন্যাসী বাবাজীর সংগে আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল, তার মুখমণ্ডলে একটা দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। করজোড়ে বলল মঙ্গলসিন্ধ—গুরুদেব, যদি কিছু মনে না করেন তবে আমার অন্তপুরে এসে যদি তার সংগে একটু দেখা করেন তাহলে আমি আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
কিন্তু বৎস, আমিতো কোনদিন নারীমুখ দর্শন করি না মা কালীকা দেবীকে ছাড়া।
মা কালী দেবী আপনাকে সাক্ষাৎ দেন?
হাঁ বৎস, মা কালী, তার এ অধম পুত্রের সংগে সাক্ষাৎ না করে পারেন না।
কিভাবে আপনি তার সাক্ষাৎ লাভ করেন গুরুদেব?
সে অতি কঠোর কঠিন তপস্যা, সংক্ষেপে বলি। অমাবস্যার গভীর রাত্রে শোনে সদ্য মৃতদেহের উপর বসে আমাকে তপস্যা করতে হয়। তপস্যা দি সফল হয় তখন আকাশে মেঘ জমে ওঠে। ভীষণ ঝড়বৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎ চমকায়, বজ্রপাত হয়—তারই মধ্যে মা কালী হাতে রক্তরাঙা খর্গ, গলায় নরমুণ্ডু, জিহ্বায় তাজা রক্তের আলপনা আমার সম্মুখে শশরীরে এসে দণ্ডায়মান হন…..
মঙ্গলসিন্ধের দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময়, অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলমা কালী শশরীরে এসে দণ্ডায়মান হন!
হাঁ বৎস, সেই একটি নারীমূর্তিই আমি জীবনে দেখেছি।
গুরুদেব, তাহলে আপনি তার সংগে সাক্ষাৎ করতে রাজী নন?
আপনি যখন বলছেন তখন না করি কেমন করে। তবে এক কাজ করতে হবে।
বলুন গুরুদেব কি করতে হবে?
আমি চক্ষু বন্ধ করে তার কক্ষে প্রবেশ করব, আপনি তার হাত আমার হাতের মুঠায় এনে দেবেন। আমি তাকে সব কথা বলব।
বেশ তাই করছি গুরুদেব, আসুন আমার সংগে।
১৩.
মনিরা কেঁদে কেঁদে দু’চোখ লাল করে ফেলেছে; চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে, আর কাঁদতে পারে না। হৃদয়টা পুড়ে যেন ছাই হয়ে গেছে তার। বারবার এই নির্মম পরিণতি—যার কোন শেষ নেই।
মনিরা শয্যায় শুয়ে নীরবে কাঁদছিল।
এমন সময় কক্ষের দরজা খুলে যায়, কক্ষে প্রবেশ করে মঙ্গলসিন্ধ, সংগে তার জটাজুটধারী এক সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীর দক্ষিণ হাত মঙ্গলসিন্ধের দক্ষিণ হাতের মুঠায়, চক্ষুদ্বয় মুদিত।
মনিরা মঙ্গলসিন্ধ এবং সন্ন্যাসী বাবাজীকে দেখে বিছানা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায়। মঙ্গলসিন্ধের পেছনে চক্ষু মুদিত সন্ন্যাসীর দিকে তাকিয়ে মনিরা বুঝতে পারল, সন্ন্যাসী অন্ধ।
মঙ্গলসিন্ধ বলল-যুবতী, কোন ভয় নেই, এই সন্ন্যাসী বাবাজী তোমাকে দুটি কথা বলবেন।
মনিরা পুনরায় তাকাল সন্ন্যাসীর মুখের দিকে। কোন উত্তর দিতে পারল না সে।
সন্ন্যাসী একটা শব্দ করে বলল–বৎস, ক্ষণিকের জন্য আপনাকে বাইরে যেতে অনুরোধ করছি।
মঙ্গলসিন্ধ নীরবে বাইরে চলে গেল।
সন্ন্যাসী এবার মুদিত আঁখি মেলে তাকাল, ক্ষিপ্রকণ্ঠে বলল–মনিরা, আমি বিনয় সেন।
মনিরা, অস্ফুট শব্দ করে সন্ন্যাসীর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে এলো–আপত্তি এসেছেন।
হাঁ মনিরা, তোমাকে উদ্ধারের জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি। রাজা মঙ্গলসিন্ধকে আমি বলেছি তোমাকে রাণী করতে, ঝিন্দের রাণী।
এ আপনি কি বলছেন! চাই না আমি ঝিন্দের রাণী হতে।
মনিরা, তোমাকে ঝিন্দের রাণী করবে, বিয়ে করে রাণী নয়।
তুমি অমত করো না। আমি তোমাকে উদ্ধার করে নেব। দাও তোমার হাত আমার হাতে-দাও–দাও বিলম্ব করো না।
