কি বললেন আমাকে এত বড় নীচ প্রবৃত্তির মানুষ বলে মনে করছেন। যাকে মঙ্গল স্ত্রী বলে গ্রহণ করবে সে নষ্ট মেয়েকে আমি আবার স্ত্রী বলে–
না, সে কথা আমি বলছি না, বলছি আপনি রাজ্যলাভ এবং স্ত্রী লাভ যেন একই সঙ্গে করতে পারেন।
আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না বিনয় সেন?
বুঝিয়ে দিচ্ছি আপনি ধৈর্য ধরুন।
দেখুন বিনয় সেন, আমি চাই মঙ্গলসিন্ধ যেন ঐ সুন্দর তরুণীকে স্পর্শ করতে না পারে, এবং তাকে রাণী করার পূর্বেই যেন আমি মঙ্গলকে হত্যা করতে পারি। কারণ মঙ্গল আমাকে বলেছে জীবনে সে অনেক নারী দেখেছে কিন্তু এমন সুন্দরী নারী সে কোনদিন দেখেনি অপূর্ব অদ্ভুত নারী নাকি এই সুন্দরী। এবং সে কারণেই মঙ্গল তাকে বাগানবাড়ির ক্ষণিকের সামগ্রী হিসেব নষ্ট করতে চায় না, তাকে চিরদিনের জন্য পাশে রাখতে চায়। মনস্থ করেছে সে তাকে বিয়ে করে রাণী করবে।
মৃদু হাসল বিনয় সেন, বলল—মঙ্গল সিন্ধের কবল থেকে তরুণী এত সহজে পরিত্রাণ পাবে এ কথা আপনি ভাবতে পারলেন মন্ত্রীবর?
বিনয় সেন, আপনি ভুল করছেন, মঙ্গল আমাকে বলেছেতাকে আমি বিয়ের আগে স্পর্শ করব না।
কঙ্কর সিংহের কথায় বিনয় সেন নিশ্চুপ হয়ে কিছুক্ষণ ভাবল তারপর কঙ্কর সিংয়ের কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল।
বিনয় সেনের কথায় কঙ্কর সিংয়ের মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হলো। হেসে বলল কঙ্কর সিং-বিনয় সেন, সত্যিই আপনার মাথায় বুদ্ধি আছে। আপনার কথামত আমি কাজ করব।
বিনয় সেন তখনকার মত বিদায় গ্রহণ করল।
১১.
কঙ্কর সিং রাজদরবারে প্রবেশ করল। সংগে তার এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী, বলল কঙ্করসিং-ইনি একজুন সন্ন্যাসী এবং জ্যোতিষী।
মঙ্গলসিন্ধ রাজসিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সন্ন্যাসীকে অভিবাদনপূর্বক নিজ আসনের পার্শ্বে বসাল। বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল—হঠাৎ আপনার আগমনের কারণ কি জ্যোতিষী বাবাজী। যদি কিছু মনে না করেন অধমকে বলেন তাহলে কৃতার্থ হই। জটাজুটধারী সন্ন্যাসী অদ্ভুত একটা শব্দ করে বলল—আজ রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি, তাই মন্ত্রীবর মহাশয়কে বলে স্বপ্নের বিবরণ আপনাকেও জানাতে এসেছি।
কঙ্কর সিং গম্ভীর কণ্ঠে বলল হাঁ, সন্ন্যাসী বাবাজী যা বলছেন অতি সত্য কথা। এই বাবাজী পর্বতে বাস করেন, কোনদিন লোকালয়ে আসেন না। শুধু একবার এসেছিলেন বহুদিন পূর্বে যখন মহারাজ নিহত হবেন তখন।
চমকে উঠল মঙ্গলসিন্ধ।
কঙ্কর সিং বলল—তখন ইনি স্বপ্নে সব জানতে পেরেছিলেন।
মঙ্গলসিন্ধের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে বিবর্ণ হলো।
কঙ্কর সিং বলল—সন্ন্যাসী বাবাজী অত্যন্ত ভাল লোক। তিনি কোন সময় কারও অমঙ্গল কামনা করেন না। যার যা অদৃষ্টে আছে তার তাই ঘটবে, এতে বিচলিত হবার কোন কারণ নেই।
মঙ্গলসিন্ধ তাড়াতাড়ি কথাটা চাপা দেবার জন্য বলল–বাবাজী, আপনি স্বপ্নে কি জ্ঞাত হয়েছেন জানতে পারি কি?
সন্ন্যাসী পুনরায় মুখে একটা শব্দ করে বললেন, আমার স্বপ্নবার্তা জানাবার জন্যই আমি পর্বতের গুহা ত্যাগ করে এই রাজ দরবারে আগমন করেছি।
মঙ্গলসিন্ধ করজোড়ে বলল—বলুন দেব আপনার স্বপ্নবার্তা।
রাজদরবারের সবাই ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষা করছেন, না জানি কি বলবেন সন্ন্যাসী বাবাজী।
সন্ন্যাসী আসনে জেঁকে বসে হাতের চিমটাখানা মাটিতে তিনবার ঠক ঠক করে ঠুকে নিয়ে বললেন—ভোর রাতের স্বপ্ন অতি সত্য-অতি সত্য…মহারাজ, আমি স্বপ্ন দেখলাম একটা গহন বনের মধ্যে আপনি বিচরণ করে বেড়াচ্ছেন। আপনার চারদিকে গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন। এমন সময় আপনার অদূরে এক জ্যোতির্ময়ী নারীমূর্তি দেখা গেল….
থামলেন সন্ন্যাসী।
রাজা মঙ্গলসিন্ধের নিশ্বাস পড়ছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। কঙ্কর সিং তার নিজের আসনে বসে তাকাচ্ছে রাজা মঙ্গলসিন্ধের মুখের দিকে। রাজদরবারের অন্যান্য রাজকর্মচারী বিপুল আগ্রহে তাকিয়ে আছেন সন্ন্যাসী বাবাজীর মুখের দিকে।
হাঁ, তারপর….বলতে শুরু করলেন সন্ন্যাসী বাবাজী-আপনি তখন সেই নারীমূতির দিকে এগুচ্ছেন, কিন্তু কিছুতেই আপনি তার নাগাল পাচ্ছেন না। আপনার চারপাশে অন্ধকারের ঘনঘটা আরও জমাট বেধে উঠেছে। অদূরে জ্যোতির্ময়ী নারী অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আপনার দিকে….
বলুন তারপর–ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করল মঙ্গলসিন্ধ।
সন্ন্যাসী বলে চলেছেন—আপনি তখন প্রাণপণে ঐ নারীর দিকে ধাবিত হলেন। এমন সময় হঠাৎ অদ্ভুত এক দেবপুরুষের আবির্ভাব হলো সেখানে। সঙ্গে সঙ্গে আপনি স্তব্দ হয়ে দাঁড়ালেন। দেবমূর্তির চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এক অপূর্ব আলোর ছটা। দেবমূর্তি গম্ভীর কণ্ঠে আপনাকে লক্ষ্য করে বললেন–ক্ষান্ত হোন রাজা। ক্ষান্ত হোন——ঐ জ্যোতির্ময়ী নারী অতি পবিত্র। ওকে আপনি স্পর্শ করতে পারবেন না। আপনি তখন নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে তাকিয়ে আছেন দেবমূর্তির দিকে….
সন্ন্যাসী বাবাজী বলুন, তারপর কি হলো?
সন্ন্যাসী বাবাজী পুনরায় মাটিতে তিনবার হাতের চিমটাখানা ঠক্ ঠক করে ঠুকে নিয়ে বললেন-ব্যস্ততা কেন বৎস! আমি ধীরে ধীরে স্বপ্নদৃশ্যের সব কথাই আপনার নিকট ব্যক্ত করব। হাঁ, আপনার মঙ্গলের জন্যই আমি ঝিল পর্বত থেকে এ মানবপুরীতে এসেছি, আপনার মঙ্গলই আমার কামনা—আপনি যখন নিশ্চল মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছেন, তখন সেই অদ্ভুত দেবমূর্তি বলে উঠলেন-জানি তুমি ওকে চাও, অতি নিজের করে পেতে চাও। কিন্তু ওকে স্পর্শ করার সংগে সংগেই তোমার মৃত্যু হবে-আপনি তখন চিৎকার করে বললেন, এর কি কোন প্রতিকার নেই? দেবমূর্তি বললেনআছে, কিন্তু সে অতি কঠিন কাজ। আপনি তখন প্রশ্ন করলেন–কি এমন কঠিন কাজ যা আমি ঐ নারীর জন্য করতে পারি না? তখন দেবমূর্তি খুশি হলেন, বললেন–তুমি ঐ জ্যোতির্ময়ী নারীকে তোমার হৃদয় সিংহাসনে প্রতিষ্ঠার পূর্বে তাকে তোমার রাজ-সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা কর। তারপর ছ’মাস পর বিয়ে কর, তার পূর্বে নয়….এটুকু স্বপ্ন দেখার পর হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। ভোর রাতের স্বপ্ন, কাজেই আমার মনের মধ্যে বড় অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। সত্যই যদি আপনার হৃদয় সিংহাসনে কোন জ্যোতির্ময়ী নারীকে প্রতিষ্ঠার আয়োজন করে থাকেন তবে আপনি বিরত থাকুন। নচেৎ মৃত্যু আপনার অনিবার্য।
