অত্যন্ত আগ্রহে বিনয় সেনের দু’চোখ বড় হয়ে উঠল, বলল—তারপর? তারপর?
আমাদের নৌকা অতিশীঘ্র বজরাখানার নিকটে পৌঁছে গেল, কিন্তু তার পূর্বেই বজরার পাটাতন থেকে দুটি নারীমূর্তি অদৃশ্য হয়েছে-আমরা তো বজরার উপর লাফিয়ে নেমে পড়লাম, প্রথমেই বাধা দিতে এলো দু’জন পাহারাদার। একজনকে মঙ্গল নিহত করল আর একজনকে আমি। সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকজন এগিয়ে এলো, কিন্তু আমাদের অস্ত্র আর শক্তির কাছে তারা অত্যন্ত দুর্বল। অল্পক্ষণেই বজরার প্রায় সব পুরুষকে হত্যা করে ফেললাম। তারপর আমি আর মঙ্গল বজরার মধ্যে প্রবেশ করলাম। আর কেউ বাধা দেবার ছিল না, কাজেই স্বচ্ছন্দে বজরার কামরায় প্রবেশ করলাম। আশ্চর্য হলাম বজরার মধ্যে একটা অপ্সরীর মত সুন্দরী রমণীকে দেখে। তার চেয়েও আশ্চর্য হলাম রমণীর আচরণে। তাকে আমরা জোরপূর্বক পাকড়াও করে আনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি কিন্তু সে অতি সহজে নিজের ইচ্ছায় আমাদের সঙ্গে চলে এলো।
বিনয় সেন বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলল সে চলে এলো আপনাদের সঙ্গে–মানে আপনাদের নৌকায়?
হাঁ বিনয় সেন, অদ্ভুত নারী ঐ রমণী!
বিনয় সেন এবার ব্যস্তকণ্ঠে প্রশ্ন করল—কোথায় সে রমণী সিং বাহাদুর?
কঙ্কর পুনরায় আর একবার কক্ষের চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে চাপা গলায় বলল—এখন সে রাজ-অন্তপুরে।
রাজ-অন্তপুরে?
হাঁ, কারণ মঙ্গল বড় স্বার্থপর, আমার প্রচেষ্টায় সে এই অপ্সরীকে পেয়েছে অথচ সে আমাকে ফাঁকি দিয়ে একাই তাকে আত্মসাৎ করতে চায়।
বিনয় সেনের কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে আসে, বলে-এ তার অন্যায়।
শুধু অন্যায় নয়, তার অপরাধ। মঙ্গল তাকে রাণী করতে মনস্থ করেছে। রাণী!
হ্যাঁ। বিনয় সেন, মঙ্গল এই যুবতীকে বিয়ে করে রাণী করবে।
আর আপনি?
হাঃ হাঃ হাঃ–আর আমি, দাঁতে দাঁত পিষে বলল কঙ্কর-আমি তাকে রেহাই দেব? বিনয় সেন, জানি আপনি রাজকর্মচারী, কিন্তু আমার অনুরোধ, আপনি আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবেন।
কিন্তু……
এর মধ্যে কোন কিন্তু নেই বিনয় সেন। আমি মঙ্গলকে হত্যা করব এবং সেই রমণীকে তার কবল থেকে উদ্ধার করব।
তারপর?
আবার হেসে ওঠে কঙ্কর-তারপর আমি তাকে হৃদয়ের রাণী করব।
বলে উঠল বিনয় সেনআমার স্বার্থ কি? সিং বাহাদুর?
আপনাকে আমি প্রচুর অর্থ দেব।
বলুন আমার কি কাজ? কি করতে হবে বলুন?
মঙ্গলসিন্ধ আপনাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করে, আপনি তার সঙ্গে যোগ দিয়ে তার মনের কথা জেনে নেবেন। তারপর একদিন তাকে বাগানবাড়িতে এনে হত্যা করব…শুধু জানবেন আপনি আর জানব আমি।
নরহত্যা।
ভয় পাচ্ছেন কেন বিনয় সেন, এ বান্দা নরহত্যা করতে এতটুকু বিচলিত হয় না। তাছাড়া মঙ্গল নিরপরাধ নোক নয়, সে গুরুতর অপরাধী, তাকে হত্যা করা পাপ নয়।
তার মানে?
বিনয় সেন, আপনি রাজকর্মচারী হলেও রাজ-অন্তপুরের অনেক কথাই জানেন না।
না, তা জানি না, জানবার বাসনাও করি না।
আপনাদের প্রিয় রাজা নিহত হবার কথাটাও না?
বিনয় সেন এবার করুণ কণ্ঠে বললহ, স্বর্গীয় রাজা জয়সিন্ধের খুনের ব্যাপারটা আজও আমার মনে বড় আঘাত হানছে।
শুনুন বিনয় সেন, আপনাদের প্রিয় রাজার হত্যাকারী অন্য কেউ নয়, তার পুত্র মঙ্গলসিন্ধই তাকে হত্যা করেছে।
বিনয় সেন পাথরের মূর্তির মত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
কঙ্কর সিং বলল—এখনও আপনি মঙ্গলকে হত্যা করা পাপ মনে করেন?
পিতৃ হত্যাকারীকে হত্যা করা তার প্রতি সুবিচার করা। পিতৃহত্যার শাস্তি তাকে সর্বশরীরে অস্ত্র দ্বারা ক্ষতবিক্ষত করে লবণ মাখিয়ে তিলে তিলে শাস্তি দেওয়া।
হাঁ, ঠিকই বলেছেন বিনয় সেন, আমি মঙ্গলসিন্ধকে এভাবেই হত্যা করব।
তারপর রাজসিংহাসনের অবস্থা কি দাঁড়াবে সিং বাহাদুর?
এই চিন্তা, কেন আমি কি রাজ্য পরিচালনার অযোগ্য?
না না, ছিঃ ছিঃ আপনি এখন ঝিন্দের মন্ত্রীবর, আপনি কেন রাজকার্য পরিচালনায় অযোগ্য হবেন। কিন্তু একটা কথা আমি বলতে চাই সিং বাহাদুর।
আপনি আমাকে সিং বাহাদুর না বলে মন্ত্রীবর বলবেন—বিনয় সেন।
আপনার কথা মতই কাজ করব মন্ত্রীবর।
বলুন আপনি কি বলতে চাইছিলেন?
হাঁ, আমি বলছিলাম কি, কুমার বাহাদুর যাতে কিছু জানতে না পারে–যেমন সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে। রাজ্যও যেন পান আর সেই রূপসী তরুণীও যেন হাতছাড়া না হয়।
বলুন আমাকে কি করতে হবে?
মন্ত্রীবর, এ বাগানবাড়ি আমাদের এই গোপন আলোচনার উপযুক্ত স্থান নয়। বরং আপনার বাড়িতে….
হাঁ, ঠিকই বলেছেন বিনয় সেন, মঙ্গল যে কোন মুহূর্তে এখানে এসে যেতে পারে। চলুন আমরা অন্তপুরে গিয়ে বসি।
উঠে দাঁড়াল কঙ্কর সিং-চলুন। . বিনয় সেন কোনদিন কঙ্কর সিংয়ের অন্তপুরে আসেনি, আজ প্রথম এলো।
কঙ্কর সিং বিনয় সেনকে নিয়ে নিজের শোবার ঘরে গিয়ে বসল বলল কঙ্কর সিং–বলুন বিনয় সেন?
হাঁ বলছিলাম, রাজা মঙ্গলসিন্ধ আপনাকে অনেক সমীহ করেন–বন্ধু বলে আপনার কথা মানেনও।
সে কথা মিথ্যা নয় কিন্তু আপনি কি আমাকে ভুলাচ্ছেন বিনয় সেন?
মোটেই না, আপনি যখন আমাকে বিশ্বাস করে একটা সাহায্য চেয়েছেন তখন আমি আপনার কথামত কাজ না করে কি পারি? আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা বলব?
বলুন বিনয় সেন, বলার জন্যই তো এখানে–মানে আমার অন্তঃপুরে আপনাকে…
হাঁ, তা আমি জানি, দেখুন মন্ত্রীবর, আপনি যাতে একসঙ্গে ঝিন্দ রাজ্য এবং ঝিন্দের রাণী লাভ করেন–
