বিনয় সেন ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী করতে লাগল। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার বজরার মৃতদেহের ওপর ঝাপসা অন্ধকারের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।
বিনয় সেন বলল–সুফিয়া, এর প্রতিশোধ আমি না নিয়ে ছাড়বো না। তার চোখ দুটো সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে ধক ধক করে জ্বলে উঠল।
১০.
মঙ্গলসিন্ধ অন্যান্য নারীর মত মনিরার প্রতি জঘন্য আচরণ করতে পারল না। কেন যেন মনিরার চোখের দিকে তাকিয়ে শয়তান, মঙ্গলসিন্ধের মনেও দ্বিধা এলো। নিজের রাজবাড়ির এক কক্ষে মনিরাকে আবদ্ধ করে আখল সে।
কক্কর সিংয়ের ইচ্ছা মনিরাকে বাগানবাড়িতে আনা হোক কিন্তু মঙ্গলসিন্ধ চায় না এই যুবতীকে তার লালসার সামগ্রী করে। মনিরাকে মঙ্গলসিন্ধের বড় ভাল লেগেছে, ওকে সে চিরদিনের জন্য পাশে পেতে চায়। সে কারণেই অন্যান্য যুবতীর মত মঙ্গলসিন্ধ মনিরাকে ব্যবহার করতে পারল না।
মনিরাকে বন্দী করে রাখলেও তার প্রতি কোন মন্দ আচরণ করা হল না। সুন্দর সুসজ্জিত একটা কক্ষে তাকে আটকে রাখা হল। তার সেবা-যত্নের জন্য কয়েকজন দাসী নিযুক্ত করে দিল মঙ্গলসিন্ধ। বন্দিনী যাতে কোন রকম কষ্ট না পায় সেদিকে খেয়াল রাখল সে।
মনিরা নিজের বুদ্ধিবলেই মঙ্গলসিন্ধের হিংস্র থাবা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলল। সে জানত এখানে সে কত অসহায়। মঙ্গলসিন্ধের কাছে সে একটি হীন পুতুলের মতই নির্জীব। কারণ সে এখন বন্দিনী।
মনিরাকে যখন মঙ্গলসিন্ধ নৌকায় এনে জিজ্ঞেস করেছিল তুমি সেচ্ছায় এলে, কারণ কি যুবতী?
জবাবে বলেছিল মনিরা——যার দুনিয়ায় কেউ নেই তার আবার যেতে আপত্তি কি? ঐ বজরার মালিকও আমাকে বন্দী করে আটকে রেখেছিল, সুযোগ পেলেই এ দেশ ছেড়ে পালাবে, কাজেই আমি আপনার সঙ্গে যেতে সহজেই রাজী হয়েছি।
মনিরার কথায় মঙ্গলসিন্ধের মনে অভূতপূর্ব একটা আনন্দের উৎস বয়ে গিয়েছিল, তাহলে এ যুবতী অসহায় সম্বলহীন, একে সহজেই আপন করে নিতে সক্ষম হবে সে, একে মনিরার অপূর্ব রূপে মুগ্ধ হয়েছিল মঙ্গলসিন্ধ, তারপর মনিরার কণ্ঠস্বরে এবং আচরণে খুশি হল। মনিরাকে তাই মঙ্গলসিন্ধ বিয়ে করে একান্ত নিজের করে নেবে মনস্থ করল।
কথাটা মঙ্গলসিন্ধ বন্ধু কঙ্করসিংকে বলল কঙ্কর, জীবনে বহু নারী আমি দেখেছি এবং পেয়েছি, কিন্তু এ নারীর মত সুন্দর গুণবতী নারী আমি কোনদিন দেখিনি। আমি একে বিয়ে করে রাণী করতে চাই—
কথাটা শুনে অদ্ভুতভাবে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল কঙ্কর সিং, তারপর হাসি থামিয়ে বলল-অজ্ঞাত অপরিচিত এক নারী হবে ঝিন্দের রাণী….হাঃ হাঃ হাঃ…..হাঃ হাঃ হাঃ। কঙ্কর সিংয়ের অট্টহাসির শব্দে বাগানবাড়ির কাঁচের জানালা কপাটগুলো ঝন ঝন করে বেজে উঠল।
মঙ্গলসিন্ধ বলল—কঙ্কর, তুমি কেন, পৃথিবীর কেহ আমার এই–সংকল্পে বাধা দিতে পারবে না।
কঙ্কর সিং বলল—বেশ, তোমার যা মনে চায় তাই হবে।
কঙ্কর সিং মুখে ‘বেশ হবে’ বললেও অন্তরে তার একটা প্রচন্ড আক্রোশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সেদিন মেয়েটাকে আনতে তাকে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছিল। তার হাতে নিহত হয়েছে দু’জন লোক। এই লোক দু’জনকে হত্যা করতে তার শরীরেও আঘাত পেয়েছে, অথচ সেই নারীকে মঙ্গলসিন্ধ একা গ্রহণ করবে, এ কোনদিন হতে পারে না।
কঙ্কর সিং মনে মনে মতলব আঁটতে লাগল, কেমন করে যুবতীটিকে হাতে আনবে।
মনিরার জন্যই কঙ্কর সিং আর মঙ্গলসিন্ধের মধ্যে একটা হিংসার সৃষ্টি হল। কঙ্কর সিং চায় মনিরাকে বাগানবাড়িতে এনে তাকে নিয়ে আমোদ করতে।
হিংস্র জন্তুর মতই ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে গেল কঙ্কর সিং।
এমন দিনে কঙ্কর সিং সাথী হিসেবে পেল বিনয় সেনকে। সেদিন বাগানবাড়িতে একা একা বসে গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছিল কঙ্কর সিং, বিনয় সেন এসে বসল তার পাশে। মৃদু হেসে বলল-সিং বাহাদুর, আজ আপনাকে বড় ভাবাপন্ন লাগছে, ব্যাপার কি? নতুন কোন আমদানি নেই বুঝি?
বিনয় সেনকে দেখে খুশি হল কঙ্কর সিং, সোজা হয়ে বসে বলল-বিনয় সেন, আপনি এসেছেন-ভালই হল। একটা উপকার করতে হবে।
বলুন আমি কি উপকার করতে পারি?
কঙ্কর সিং একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিল, তারপর ফিসফিস করে বলল—সেদিন মঙ্গল আর আমি, নৌকা ভ্রমণে গিয়ে এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতী শিকার করে এনেছি।
বিনয় সেন বলে উঠল অপূর্ব সুন্দরী শিকার তাও নদী বক্ষে—আশ্চর্য?
কঙ্কর সিং হাসল বিশ্বাস হচ্ছে না? তা না হবারই কথা। তবে শুনুন, সেদিন আমি আর মঙ্গল বের হলাম। সঙ্গে শিকারের জন্য কিছু গোলাবারুদ নিলাম আর নিলাম কয়েকটা বন্দুক আর রাইফেল। ভোরে যাত্রা শুরু হল আমাদের। নদীবক্ষের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আমরা এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ আমি বললাম চল মঙ্গল, নদীর যে অঞ্চলে ঘন বন আছে সে দিকে চল-হরিণ শিকার করাও হবে, সে সাথে নৌকা ভ্রমণও সার্ধক হবে। একটু থামল কঙ্কর, বিনয় সেন স্তব্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছে। পুনরায় বলতে শুরু করল কঙ্কর আমার কথামতই মঙ্গল মাঝিদের আদেশ দিল নদীর দিকে চল। আমাদের নৌকা সেভাবে এগিয়ে চলল, যে দিকে ঘন বন।
বিনয় সেন বলে উঠল–তারপর?
তারপর আমাদের নৌকা যখন নদী বেয়ে বুলের দিকে এগুচ্ছিলো তখন আমরা দেখতে পাই ঘন বনের আড়ালে একটা ফাঁকা জায়গায় একটা বজরা। শুধু বজরাই নয়, বজরার সামনে দুটি নারীমূর্তি। আমরা তো অবাক হলাম, এমন নির্জন নদীবক্ষে ঘন বনের ধারে বজরা এলো কোথা থেকে? শুধু বজরাই নয়, নারীও রয়েছে।
