মঙ্গলসিন্ধ এক পাও অগ্রসর হতে পারল না। মুগ্ধ তন্ময় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল।
এমন সময় কঙ্কর সিং দ্বিতীয় পাহারাদারকেও ঘায়েল করে বজরার কক্ষে প্রবেশ করল। মনিরাকে দেখতে পেয়ে সেও অবাক হল, তারপর দ্রুত এগুতে গেল তার দিকে, মঙ্গলসিন্ধ হাত বাড়িয়ে পথ রোধ করল–পঁড়াও।
কঙ্করসিং বিস্ময়ভরা চোখে তাকাল মঙ্গলসিন্ধের দিকে, তারপর বললস্বর্গের অপ্সরী।
হ্যাঁ কঙ্কর, স্বর্গের অপ্সরী বলেই মনে হচ্ছে—বললো মঙ্গল সিন্ধ।
কঙ্কর সিং এবার তাদের অনুচরগণকে ডাকল। পথ মুক্ত, বজরার পাহারাদারগণ কেউ বা আহত কেউ বা নিহত হয়েছে। কাজেই তারা আর কোন বাধাই পেল না, নির্বিঘ্নে বজরার কক্ষে প্রবেশ করে মঙ্গলসিন্ধ এবং কঙ্কর সিংয়ের সম্মুখে দাঁড়াল।
কঙ্কর সিং বলল-তোমরা ওকে জোরপূর্বক আমাদের নৌকায় উঠিয়ে নাও।
তৎক্ষণাৎ দু’জন গুণ্ডাধরনের লোক ক্ষিপ্তের ন্যায় এগুলো মনিরার দিকে, আর একটু হলেই মনিরাকে তারা ধরে ফেলবে।
সুফিয়ার কথায় এবং একটু পূর্বে নৌকার আরোহীদের কথায় মনিরা বুঝতে পেরেছিল ওটা রাজা মঙ্গলসিন্ধের নৌকা এবং এ যুবকই যে রাজা মঙ্গলসিন্ধ এটাও সে অনুমানে ধরে নিয়েছিল, কারণ তার শরীরে রাজকীয় পোশাক ছিল। মনিরা আরও জানে বিনয় সেন রাজা মঙ্গলসিন্ধের রাজদরবারে চাকরি করেএদের হাত থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় নেই। এরা সংখ্যায় অনেক বেশি কাজেই তার নারীশক্তি এদের কাছে কিছু নয়। মনিরা বুদ্ধির কৌশলে নিজেকে রক্ষা করার উপায় করে নিল।
লোকগুলো এগিয়ে আসতেই মনিরা বলল–তোমরা আমাকে স্পর্শ কর না, আমি তোমাদের সঙ্গে স্বেচ্ছায়ই যাব।
লোক দু’জন তবু এওচ্ছিল, কঙ্কর সিং বলল-ওর কথায় বিশ্বাস করনা, নিশ্চয়ই ও পালাবার ফন্দি করছে। তোমরা ওকে ধরে হাত-পা বেঁধে নৌকায় উঠিয়ে নাও।
মঙ্গাসন্ধ আজ কঙ্কর সিংয়ের কথায় কান না দিয়ে বললো–থাম, ও নিজে যখন আমাদের সঙ্গে যেতে চাইছে তখন ওকে তোমরা ধর না। তারপর মঙ্গলসিন্ধ নিজেই এগিয়ে এল মনিরার সম্মুখে তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমরা কেন এখানে এলাম বা এসেছি। কাজেই তোমার কোন আপত্তি আমরা শুনব না, চল আমাদের নৌকায়।
মনিরা সকলের অলক্ষ্যে একবার তার বিছানার দিকে তাকাল, মনে মনে বলল বিদায় সুফিয়া-বিদায়….।
মনিরাকে নিয়ে মঙ্গলসিন্ধের নৌকা যখন নদীর বাঁকে অদৃশ্য হল তখন সুফিয়া আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল। চারদিকে মৃতদেহ ছড়ান, বজরার পাটাতন রক্ষে রাঙা হয়ে উঠেছে, তারই মধ্যে দাঁড়িয়ে সুফিয়ার অবস্থা মর্মান্তিক হয়ে উঠল।
বজরার চারজন মাঝি, পাহারাদার, দু’জন বাবুর্চি সবাই নিহত হয়েছে। একজন পাহারাদার শুধু জীবিত ছিল, কঙ্কর সিং মনে করেছিল তার আঘাতে সেও মরে গেছে। যদিও তার মাথায় প্রচন্ড আঘাত লাগায় সে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল কিন্তু অল্পক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরে আসে, কিন্তু সে নিশ্চুপ মৃতের ন্যায় পড়ে থেকে পাপিষ্ঠ শয়তানের কার্যকলাপ দেখছিল। যাতে মালিক এলে তাকে সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারে।
সুফিয়ার অবস্থাও তাই, যদিও সে বিছানার তলায় আত্মগোপন করে নিজেকে রক্ষা করে নিয়েছিল, কিন্তু মনিরাকে যখন দুষ্টের দল নিয়ে গেল তখন সে অতি কষ্টে নিজেকে সংযত রেখেছিল। বিনয় সেনকে বলে অন্ততঃ একটা কোন ব্যবস্থা যাতে করা যায় সে চেষ্টা করতে হবে।
এক্ষণে চারদিকে ছড়ানো মৃতদেহের মধ্যে দাঁড়িয়ে সুফিয়া ডুকরে কেঁদে উঠল। মনিরাকে পেয়ে শয়তানগণ তার কথা ভুলে গিয়েছিল, নইলে ওরা যখন প্রথমে কথা বলেছিল তখন তাদের কথায় সুফিয়া স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল, এ বজরায় দুটি নারী রয়েছে। ভয়ে তার অন্তরাত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল, মনিরা যদি তাকে এভাবে শয্যার নিচে লুকিয়ে না রাখত তাহলে তাকেও ওরা পাকড়াও করে নিয়ে যেত তাতে কোন সন্দেহ নেই। যে পাহারাদারটি তখনও জীবিত ছিল তার নাম আসলাম। আসলাম অন্যান্য মৃতদেহের মধ্য হতে উঠে দাঁড়াল। সুফিয়াকে আকুলভাবে কাঁদতে দেখে বলল—আপনি এভাবে কাঁদবেন না। মালিক এলে নিশ্চয়ই তিনি এর প্রতিশোধ নেবেন!
বিনয় সেন যখন তার বজরায় ফিরে এলো তখন বেলাশেষের সূর্যাস্তের ক্ষীণ রশ্মি এসে লালে লাল করে তুলছে তার বজরার প্রাঙ্গণ। চারদিকে মৃতদেহ আর জমাট রক্তে বজরাখানা ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
০৯.
বিনয় সেনকে দেখতে পেয়েই ছুটে এলো আসলাম আর সুফিয়া কেঁদে কেঁদে সব কথা বলল তারা বিনয় সেনের নিকটে।
আসলাম বলল–মালিক, আমাকে আপনি হত্যা করুন। আমি বড় অপদার্থ। আমার চোখের সামনে সবাইকে নিহত করে ওরা তাকে নিয়ে পালাল অথচ আমি তাদের বাধা দিতে সক্ষম হলাম না, এর চেয়ে দুঃখ আর বেদনা কি হতে পারে মালিক!
বিনয় সেনের চোখেমুখে তখন প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। আসলামের কথায় কান না দিয়ে বলল সেসুফিয়া, সত্যই তুমি তাকে চিনতে পেরেছ যে একদিন তোমাকে সেই বাগানবাড়িতে…..
হাঁ ভাইজান, আমি তাকে দেখামাত্র চিনতে পেরেছি। কোনদিন তার চেহারা ভুলব না। শয়তান পাপিষ্ঠ রাজকুমার সে।
বিনয় সেন চারদিকে ছড়ানো লাশগুলোর দিকে তাকিয়ে দক্ষিণ হাতে নিজের মাথার চুল টানতে লাগল। এমন যে একটা ঘটনা অকস্মাৎ ঘটে যাবে ভাবতেও পারেনি বিনয় সেন। নিরীহ মাঝি আর পাহারাদারদের মৃত্যু তার অন্তরে প্রচন্ড আঘাত করল আর সবচেয়ে বড় মনঃকষ্ট হল তার মনিরার জন্য। শয়তান মঙ্গলসিন্ধ না জানি তার ওপর কি অকথ্য ব্যবহার করছে।
