হ্যাঁ সুফিয়া, বিনয় বাবুর দয়ায় আমাদের কোন অসুবিধা বা কষ্ট নেই। তিনি সত্যি বড় মহৎ হৃদয়, উন্নত প্রাণ। তাঁর ঋণ আমরা জীবনে পরিশোধ করতে পারব না।
তবে কেন এত মন খারাপ কর? মনিরা, তোমার চেয়ে আমার ব্যথা কম নয়।
মনিরা মৃদু হাসল, বলল সে সুফিয়া, তোমার ব্যথার চেয়ে আমার ব্যথা অনেক বেশি, তুমি পিতা-মাতা, ভাই-বোন ছেড়ে অশান্তি ভোগ করছ, আর আমি….একটু থেমে বলল মনিরা-আর আমার এ দুনিয়ায় কেউ নেই, কিছু নেই, আমি সর্বহারা-চাপা কান্নায় কণ্ঠ ধরে আসে তার।
সুফিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ বলে উঠল-দেখ দেখ মনিরা, একখানা নৌকা এদিকে আসছে।
মনিরা তাকাল, দেখতে পেল একটা নৌকা তাদের বজরার দিকে এগিয়ে আসছে। কয়েকজন লোকও আছে দেখা যাচ্ছে।
মনিরা বলল—কোন শিকারীদল হবে।
সুফিয়া বলল–আমার মনে হচ্ছে ওরা কোন সওদাগর, দেখছ না নৌকাখানা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ।
মনিরা তখনও তাকিয়ে আছে বজরার সামনে পাটাতনে দাঁড়িয়ে, সুফিয়া বলল—ভেতরে চলো মনিরা।
নৌকাখানা তখন আরও অনেক এগিয়ে এসেছে। হঠাৎ সুফিয়া অস্ফুট স্বরে ভয়ার্তকণ্ঠে বলে উঠল—মনিরা, ঐ যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে ওকে যেন আমি কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। পরক্ষণেই বলে ওঠে সেচলে এস মারা, চলে এস, ওকে চিনতে পেরেছি, ও বড় শয়তান লোক। ওর কবল থেকেই বিনয় ভাইজান আমাকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলেন।
মনিরা আর সুফিয়া দ্রুত বজরার মধ্যে প্রবেশ করল।
কিন্তু ততক্ষণে নৌকাখানা অতি নিকটে পৌঁছে গেছে। নৌকাখানা রাজা মঙ্গলসিন্ধের। নৌকায় মঙ্গলসিন্ধ, কঙ্করসিং এবং আরও দু’তিন জন তার সঙ্গী রয়েছে। কঙ্কর সিংয়ের পরামর্শেই মঙ্গলসিন্ধ নৌকাভ্রমণে এদিকে এসেছে। কারণ এটা ঝিল শহরের একেবারে নির্জন বনাঞ্চল, এদিকে সহজে লোকজন বড় আসে না, কঙ্করসিং বলেছিল, যেদিকে লোকজন কম বা নির্জন সেদিকে আজ যাব; বনের ধারে নদীতীরে, অনেক সময় হরিণ–জলপান করতে আসে, নৌকাভ্রমণও হবে, শিকার করাও হবে। মঙ্গলসিন্ধ কঙ্করসিংয়ের কথামতই মাঝিগণকে এদিকে নৌকা আনতে বলেছিল।
নৌকা নিয়ে মনের আনন্দে চারদিক দর্শন করতে করতে আসছিল তারা। জনহীন নিস্তব্ধ নদীবক্ষ বেয়ে তাদের নৌকা এগিয়ে আসছে। হঠাৎ তারা দেখতে পায় অদূরে একটা বজরা দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমে আশ্চর্য হয় মঙ্গলসিন্ধ, এই নির্জন নদীবক্ষে বজরা এল কোথা থেকে। পরক্ষণে আরও আশ্চর্য হয় যখন তাদের নজরে পড়ে বজরায় দুটি নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্করসিংয়ের কথামত মাঝিগণ নৌকার গতি বাড়িয়ে দেয়।
মনিরা আর সুফিয়া তাড়াতাড়ি সরে পড়লেও দুষ্ট মঙ্গলসিন্ধ এবং কঙ্করসিংয়ের দৃষ্টি এড়াতে পারল না। মনিরার অপূর্ব সুন্দর চেহারা মঙ্গলসিন্ধের মনে আগুন ধরিয়ে দিল।
নৌকা অল্পক্ষণেই বজরার কিনারে এসে ভিড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে বিনয় সেনের দুজন অনুচর যারা বজরা রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছিলো তারা এগিয়ে এল, একজন বলল–আপনারা কি চান?
নৌকা থেকে কঙ্করসিং প্রথমে উত্তর করল—এটা রাজা মঙ্গলসিন্ধের পানসী নৌকা। জানতে চাই তোমরা কে এবং কি কারণে এই নির্জন স্থানে অবস্থান করছ?
রাইফেলধারী পাহারাদাররা জবাব দিল আমরা বিদেশী শিকারী, এখানে এসেছি বন্য পশু শিকার করবো বলে।
তোমরা শিকারী, মিথ্যে কথা। তোমাদের বজরায় কে আছে বল? বলল কঙ্কর সিং।
পাহারাদার বলল–আমাদের মনিব শিকারে গেছেন, নৌকায় কেউ নেই।
এবার মঙ্গলসি হুঙ্কার ছাড়ল—কঙ্কর, এদের গ্রেফতার কর আমি বজরাখানা তল্লাশি করব।
সঙ্গে সঙ্গে কঙ্কর এবং আরও দু’জন দুষ্ট লোক বজরায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। কঙ্কর সিং তার রাইফেলের প্রচণ্ড আঘাতে একজন পাহারাদারকে ধরাশায়ী করল। দ্বিতীয় পাহারাদার অক্রমণ করল কঙ্করসিংকে। ভীষণ ধস্তাধস্তি শুরু হল। ততক্ষণ বজরার মাঝিগণ যে যা পেল নিয়ে তুমুল যুদ্ধ শুরু করল।
মঙ্গলসিন্ধ তার রাইফেলের গুলিতে একে একে মাঝিদের হত্যা করল। তখনও দ্বিতীয় পাহারাদার আর কঙ্করসিংয়ের লড়াই চলছে, সে কিছুতেই মঙ্গলসিন্ধ এবং কঙ্করসিংকে বজরার প্রৱেশ করতে দেবে না।
ওদিকে সুফিয়া তখন তীরবিদ্ধ হরিণীর মত কাঁপছে।
মনিরা ওর দিকে তাকিয়ে নিজের বিপদের কথা ভুলে গেল। বলল——ভয় কি সুফিয়া, মরতে হয় বীর রমণীর মত মরব, তবু নিজের ইজ্জত হারাবো না।
সুফিয়া কম্পিত গলায় বলল-আমি যে বড় নার্ভাস হয়ে পড়েছি মনিরা, ঐ শয়তানের কবল থেকে একবার রক্ষা পেয়েছি আর বুঝি নিজেকে বাঁচাতে পারব না।
তাহলে তুমি বিছানার নিচে লুকিয়ে পড়। যা অদৃষ্টে থাকে আমার হবে।
মনিরা কথা শেষ করে বিছানার নিচে সুফিয়াকে লুকিয়ে রাখল। যেমনি মনিরা সুফিয়াকে লুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল ঠিক সেই মুহূর্তে বজরার কক্ষে প্রবেশ করল মঙ্গলসিন্ধ। দু’চোখে তার লালসা ভরা।
মঙ্গলসিন্ধ মনিরাকে দেখামাত্র ভুলে গেল সব, ভুলে গেল দ্বিতীয় কোন নারীর কথা। বিমুগ্ধ, বিমোহিত হয়ে তাকাল মনিরার দিকে। জীবনে সে বহু নারী দেখেছে কিন্তু এত সুন্দরী নারী সে কোনদিন দেখেনি। মনিরার অপূর্ব রূপ মঙ্গলসিন্ধের মনে এক অদ্ভুত মোহের সৃষ্টি করল।
মনিরা নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডাগর ডাগর চোখ দুটি মঙ্গলসিন্ধের মুখে সীমাবদ্ধ। অদ্ভুত এক দৃষ্টি মনিরার দু’চোখে ঝরে পড়ছে।
