তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই তার।
০৭.
মঙ্গলসিন্ধকে আজ অত্যন্ত উত্তেজিত মনে হচ্ছে। রাজকার্যে তার যেন, মন বসছে না। কঙ্করসিংয়ের মনোভাবে বেশ চঞ্চলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিনয় সেন শুধু শান্ত ধীরস্থির, গম্ভীরভাবে তার নিজ আসনে বসেছিল।
মঙ্গলসিন্ধ রাজকার্য অতি সংক্ষেপে শেষ করে উঠে দাঁড়াল। কঙ্করসিংকে লক্ষ্য করে বলল—বিনয় সেন সহ আমার বিশ্রামাগারে এস, কথা আছে।
মঙ্গুলসিন্ধ রাজসভা করে নিজ বিশ্রামাগারে প্রবেশ করল। কঙ্করসিং এবং বিনয় সেন অনুসরণ করল তাকে।
মঙ্গলসিন্ধ আসন গ্রহণ করার পর কঙ্করসিং ও বিনয় সেন আসন গ্রহণ করল।
মঙ্গলসিন্ধ সম্মুখস্থ পা-দানিতে প্রচণ্ড একটা পদাঘাত করে কঠিন কণ্ঠে বলল—আমার রাজ্যে কে এবং কারা এমন দুঃসাহসী আছে যারা আমার বুকে পিস্তল ধরে আমার বন্দীকে মুক্ত করে নিয়ে যায়?
কঙ্কর সিং বলে উঠলা, এত সাহস কাদের, কাদের বুকের পাটা
এত বড়?
বিনয় সেন বিস্ময়ভরা চোখে তাকাল মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়ের মুখের দিকে, তারপর জিজ্ঞাসা করল—কুমার বাহাদুর, আপনাদের কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। মঙ্গলসিন্ধ এবার শান্ত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলল-সে কথা বলব বলেই আপনাকে ডেকেছি বিনয় সেন। একটা এমন কথা যা না বললেও নয়, অথচ অতি গোপনীয়।
বলুন কুমার বাহাদুর? বললো বিনয় সেন।
মঙ্গলসিন্ধ সোজা হয়ে বসলো দু’চোখে তার আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে, বললো-বিনয় সেন, আপনি জানেন পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায়কে হেমাঙ্গিনী হত্যার অপরাধে আমি আমার গুপ্ত অনুচর দ্বারা বন্দী করি।
হ্যাঁ, এ কথা আমি জানি কুমার বাহাদুর, আরও জানি তাকে রাজা সূর্যসেনের পোড়ো রাজ প্রাসাদের চোরাকুঠরিতে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
হয়েছিল, তার উপযুক্ত সাজাও দেয়া হচ্ছিল, কিন্তু কাল রাতে দুজন কাল পোশাক পরা লোক আচমকা সেখানে উপস্থিত হয় এবং আমার বুকে পিস্তল ধরে আমার বন্দী পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায়কে মুক্ত করে নিয়ে উধাও হয়।
বিনয় সেনের দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময় ফুটে উঠল, বলল সে—এ আপনি কি বলছেন কুমার বাহাদুর। ধনঞ্জয় রায়কে নিয়ে উধাও হয়েছে, কে তারা এমন দুঃসাহসী……
বিনয় সেন আপনি এই মুহূর্তে আমার রাজ্যে গোপনে গুপ্তচর নিযুক্ত করে দিন। কে বা কারা এমন দুঃসাহসী আছে যারা আমার বুকে পিস্তল ধরে আমার বন্দীকে মুক্ত করে নিয়ে যায়।
কঙ্কর সিংও মঙ্গলসিন্ধের কথায় যোগ দিয়ে বলল-হ্যাঁ, এই দুষ্ট লোক দুটিকে যেমন করে হোক খুঁজে বের করতেই হবে এবং তাদের পাকড়াও করে এনে উত্তপ্ত লৌহশলাকা দ্বারা তাদের চক্ষুদ্বয় এবং জিহ্বা ছেদন করা হবে।
বিনয় সেনের চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠল, বলল সে-অত্যাচারীদের শাস্তি শুধু জিহ্বা ছেদন ও চক্ষুদ্বয়ে লৌহশলাকা প্রবেশ নয়, তাদের শান্তি শরীরের চামড়া ছিড়ে ফেলে লবণ মাখিয়ে দেয়া।
মঙ্গলসিন্ধ বিনয় সেনের কথায় অত্যন্ত খুশি হয়ে বলল—বিনয় সেন, আপনি পারবেন এদের দুজনকে খুঁজে বের করতে এবং উপযুক্ত শাস্তি দান করতে। আজই আপনি গুপ্ত অনুচর দেশের মধ্যে ছড়িয়ে দিন, যেন শীঘ্র তারা দুশমনদের খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়।
কঙ্কর সিং বলে উঠল—আমি স্বহস্তে তাদের শরীরের চামড়া খুলে তবে ছাড়বো–দাঁতে দাঁত পিষে সে তার মনোভাব প্রকাশ করল।
বিনয় সেন তাকল তার মুখের দিকে।
মঙ্গলসিন্ধ বলল—কঙ্কর, বিনয় সেন কাজের লোক, নিশ্চয়ই শয়তানদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে। আপনি যেতে পারেন এবার।
বিনয় সেন মঙ্গলসিন্ধকে অভিবাদন করে কক্ষ ত্যাগ করল।
মঙ্গলসিন্ধ এবার কঙ্কর সিংয়ের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল নতুন খোরাকের আশায় মনটা বড় হাঁপিয়ে উঠেছে কঙ্কর। হেমাঙ্গিনীর মৃত্যু আমার বুকের পাজর চূর্ণ করে দিয়েছে। বেচারী কত সুন্দর মেয়েই না আমদানি করত।
কঙ্কর সিং মুচকি হেসে বলল মঙ্গল, তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন, আমি কয়েকজন লোক নিযুক্ত করেছি। অচিরেই তারা আমাদের মনমত নারী সরবরাহ করতে সক্ষম হবে।
কিন্তু আর কত দিন এমনি কাটবে বন্ধু। চল আজ আমরা নৌকা বিহারে যাই।
হ্যাঁ, তাই কর মঙ্গল, অনেকদিন নৌকা বিহারে যাওয়া হয়নি।
০৮.
মনিরার মনটা আজ কেমন ছটফট করছে। কিছু ভাল লাগছে না। এমনি আর কত দিন কাটবে, কোনদিন কি তার স্বামীর মন থেকে অবিশ্বাসের কালোছায়া মুছে যাবে না। চিরদিনই কি এমনিভাবে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে হবে?
সুফিয়া এমন সময় এলো তার নিকটে, হেসে বলল-কি ভাবছ মনিরা? আজ কিন্তু তোমাকে খুব বিষণ্ণ মলিন দেখাচ্ছে-কি দুঃখ তোমার বলনা?
মনিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল—দুঃখই যার জীবনের সাথী তার আবার নতুন কি দুঃখ থাকতে পারে সুফিয়া। তুমি তো আমার সব কথা জান।
জানি কিন্তু আজ হঠাৎ আবার এতটা–
কি জানি সুফিয়া, আজ মনের মধ্যে বড় অশান্তি বোধ করছি। আমার জীবনে যখনই কোন অশান্তির ঘনঘটা এগিয়ে আসে, তার পূর্বে আমার মন বড় অস্থির হয়ে পড়ে। জানি না আরও কি দুর্ভোগ এগিয়ে আসছে আমার জন্য।
ছিঃ মনিরা, মিছামিছি অশান্তির কালোছায়া মনে স্থান দিয়ে নিজেকে এত বিমর্ষ করছ। বিনয় ভাইজান বলেছেন-ঝিন্দে তার কাজ শেষ হলেই আমাদের নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। তিনি আমাদের কত যত্নে রেখেছেন, এতটুকু কষ্ট বা অসুবিধা নেই আমাদের, বল সত্যি কি না?
