রহমান মঙ্গলসিন্ধ ও কঙ্কর সিংহের বুক লক্ষ্য করে রিভলবার উঁচু করে ধরল।
যে লোকটা এতক্ষণ চাবুক দ্বারা ধনঞ্জয় রায়কে আঘাত করছিল, বনহুর তার বুক লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লো, সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল লোকটা। বনহুর নিজ হাতে পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায়ের হাতের শিকল মুক্ত করে তাঁকে নামিয়ে নিল। আঘাতে জর্জরিত ধনঞ্জয় রায় চাবুকের নির্মম কশাঘাতে মৃত্যুপ্রায় হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তবু তিনি জ্ঞান হারাননি। তিনি যখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েছেন, ঠিক তখন হঠাৎ জমকালো পোশাক পরা দু’জন অদ্ভুত মানুষের আবির্ভাব এবং তাদের কার্যকলাপ তাকে অবাক করে তুলল। তারপর যখন জমকালো পোশাক পরা লোক দুটি তাকে বন্ধনমুক্ত করে দিল, তখন আরও অবাক হলেন ধনঞ্জয় রায়। জমকালো মূতিদ্বয়ের মুখ তাদের মাথার কাল পাগড়ীর আঁচল দিয়ে বাঁধা ছিল, তাই তাদের মুখ দেখা যাচ্ছিল না।
বনহুর ধনঞ্জয় রায়কে শূন্য থেকে নামিয়ে নিয়ে কাঁধে তুলে নিল, তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেল।
রহমান তখনও মঙ্গলসিন্ধ এবং কঙ্কর সিংয়ের বুকের কাছে রিভলবার উদ্যত করে ধরে আছে।
যতক্ষণ না বনহুর তাঁর অশ্বপৃষ্ঠে ধনঞ্জয় রায়কে উঠিয়ে নিল ততক্ষণ রহমান মঙ্গলসিন্ধ ও কঙ্কর সিংয়ের নিকট থেকে সরে যায় নি।
বনহুর ধনঞ্জয় রায়কে অশ্বপৃষ্ঠে তুলে নিয়ে নিজেও উঠে বসল।
রহমান তখন রিভলবার ঠিক রেখে পিছু হটে কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ল। আর তাকে কে পায়, সেও অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে নিজের অশ্বের পাশে গিয়ে উপস্থিত হলে।
তারপর ছুটে চলল রহমান দুলকির পিঠে।
০৬.
বনহুর আর রহমান ধনঞ্জয় রায়কে নিয়ে তার বাড়িতে পৌঁছল। ধনঞ্জয় কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়লেন, নিজের বাড়ির দরজায় পৌঁছে জমকালো মূর্তিদ্বয়কে বললেন—জানি না আপনারা কে কি উদ্দেশ্যেই বা আপনারা আমাকে এই সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিলেন। যদিও আপনারা আমার অজানা বন্ধু তবু এটুকু জিজ্ঞেস করি, আপনারা কে বা কি নাম আপনাদের দুজনের?
গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল দস্যু বনহুরঅত্যাচারীর দমন, আর বিপদকারীর উদ্ধার সাধন এই দুটোই আমাদের কাজ। আমার নাম দস্যু বনহুর আর এর নাম রহমান-আমার সহকারী।
পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায়ের কণ্ঠ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের হলোদ বনহুর।
হ্যাঁ ইন্সপেক্টার। কিন্তু আমি আপনাদের দেশে অতিথি, দস্যু নই।
ধনঞ্জয়ের মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না। অন্ধকারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালেন দস্যু বনহুরের মুখের দিকে। দস্যু বনহুরের নাম তার অজানা নয়। সারা পৃথিবীতে এই নাম সুপরিচিত, কাজেই ধনঞ্জয় রায় এ নামের সঙ্গে পরিচিত হবেন তাতে সন্দেহ কি?
বনহুর এবার মৃদু হাসল, যদিও কাল পাগড়ীর আঁচলে তার মুখের নিচের অংশটুকু ঢাকা তবু তার কথা বুঝা গেল, পাওয়া গেল তার হাসির আওয়াজ, বললে বনহুর-ভয় নেই ইন্সপেক্টার, আপনার কোন অমঙ্গল আমি করব না। কথা শেষ করে সে অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসল।
রহমান আর দস্যু বনহুর যখন নিজ বজরায় এসে পৌঁছল তখন পূর্বদিক ফর্সা হয়ে এসেছে।
বনহুর তাজের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়াল।
রহমান অনুসরণ করল সর্দারকে।
দু’জন অনুচর তাজ আর দুলকিকে নিয়ে গহন বনের দিকে চলে গেল।
বনহুর বজরার নিকটবর্তী হতেই রহমান বলল সর্দার, আমি এবার চলি?
বনহুর অন্যমনস্কভাবে বজরার দিকে এগুচ্ছিল, রহমানের কথায় থমকে দাঁড়িয়ে বলল—তোমাদের পানসী নৌকা কোথায় রেখেছ রহমান?
ঐ বড় নদীর বাঁকে, যেখানে বনটা ঘন হয়ে নদীর মধ্যে নেমে গেছে সেখানে।
তোমাদের কোন কষ্ট হচ্ছে না তো?
না সর্দার, আমাদের কোন কষ্ট হচ্ছে না।
তোমরা এতগুলো লোক একসঙ্গে থাক….
পানসীখানা খুব বড় কিনা, ঝিন্দ দেশের পানসী নৌকা…. আপনি তো জানেন।
বেশ যাও। শোনো রহমান—
রহমান চলে যাচ্ছিল, সর্দারের ডাকে ধমকে দাঁড়ায়।
বনহুর দু’পা এগিয়ে আসে, তারপর বলে পুলিশরা বড় বেঈমান হয়। ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয়ের মনোভাব ভাল মনে হলা না—আচ্ছা যাও তুমি।
রহমান কুর্ণিশ জানিয়ে নদীর তীর বেয়ে অগ্রসর হল।
বনহুর এগুলো তার বজরার দিকে।
নিজের কক্ষে প্রবেশ করে শৰ্য্যায় গা এগিয়ে দিল, ঝিল শহর তার অচিরেই ত্যাগ করা উচিত, কিন্তু কেন যেন সে দিন দিন ঝিন্দের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। কিছু পূর্বে পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায়ের কথা স্মরণ হলো, আর একটু বিলম্ব হলে বেচারার জীবনটা চিরদিনের জন্য অকেজো হয়ে যেত, দু’চোখ অন্ধ হত তার।
মনে পড়ল শয়তান মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিংয়ের কথা। ইচ্ছে করল। ওদের দু’জনকেও কীটের মত আজ হত্যা করতে পারত সে। কিন্তু ওদের হত্যা করলে অহেতুক নরহত্যা করা হবে। তাছাড়া রাজা জয়সিন্ধের বংশ লোপ পেয়ে যাবে। কাজেই বনহুর নিজেকে অতি কষ্টে সংযত করে নিয়েছিল তখন।
আরও একটা কাজ এখনও বনহুরের মনে অহরহ যন্ত্রণা দিচ্ছে তা হচ্ছে রাজা জয়সিন্ধের হত্যাকারী কে, মঙ্গলসিন্ধ না অন্য কেউ।
যদি মঙ্গলসিন্ধই রাজা জয়সিন্ধের হত্যাকারী হয় তবে বনহুর কিছুতেই তাকে ক্ষমা করবে না। ক্ষমা করবে না কঙ্কর সিংকেও, যদি মঙ্গলসিন্ধকে তার পিতা-হত্যায় উৎসাহিত করে থাকে বা সাহায্য করে থাকে।
বনহুর নানা চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ল।
