এখনও সেই আর্তনাদ থেমে থেমে শুনা যাচ্ছে।
বনহুর বলল–রহমান, সতর্কতার সঙ্গে প্রাচীর টপকে অন্দর মহলে যেতে হবে।
রহমান আর নিচুপ থাকতে পারল না, বলল–সর্দার, এই বাড়িতে আপনার আগমনের অর্থ কি এখনও আমি বুঝতে পারলাম না।
বনহুর বলল–গত কয়েকদিন হলো ঝিন্দের পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায় নিখোঁজ হয়েছেন, নিশ্চয়ই শুনেছ?
হাঁ, শুনেছিলাম। তিনি নাকি পুলিশ অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে উধাও হয়েছেন। পুলিশ অনেক অনুসন্ধান চালিয়েও তাকে পায়নি।
রহমান, আমার মনে হয় এই যে আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছ এটা ধনঞ্জয় রায়ের কণ্ঠস্বর। আমি তাঁরই সন্ধানে এখানে এসেছি। রহমান, তুমি প্রাচীর টপকে ওপারে যাও, আমিও যাচ্ছি।
অল্পক্ষণেই বনহুর আর রহমান রাজা সূর্যসেনের রাজ-অন্তপুরে প্রবেশ করল।
বহুদিন বাড়িখানায় লোকজনের বাস না থাকায় বাড়িটা একরকম পোড়োবাড়ির মতই নির্জন হয়ে পড়েছে। বাড়ির কোথাও আলো নেই। গাঢ় অন্ধকার সারা বাড়িটা ছড়িয়ে রয়েছে।
বনহুর আর রহমান অতি লঘু পদক্ষেপে এগুলো। এখনও সেই আর্তনাদ থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে। যন্ত্রণাদায়ক করুণ আর্তনাদ।
বনহুর রহমানসহ এগিয়ে চলল যেদিক থেকে শব্দটা আসছে। বিরাট বিরাট কক্ষের টানা বারান্দা বেয়ে বনহুর আর রহমান এগুচ্ছিল। সম্মুখের একটি কক্ষে আলো জ্বলছে, নজরে পড়ল তাদের। বনহুর আর রহমান সেই কক্ষের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মুক্ত জানালায় উঁকি দিয়ে কক্ষে কেউ আছে কিনা দেখে নিল বনহুর-না, কেউ নেই—
কক্ষটা নির্জন, কিন্তু কক্ষে যে কেউ বাস করে এটা বেশ বুঝতে পারল সে।
বনহুর আর রহমান সেই কক্ষে প্রবেশ করল। কক্ষে একটা গ্যাসের আলো জ্বলছিল। বনহুর আর রহমান কক্ষে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল। কক্ষটার একপাশে একটা খাট রয়েছে, খাটের উপরে বিছানায় একটি কম্বল আর একটি তেলচিটে বালিশ। খাটের চারপাশে ধূলো এত পুরু হয়ে পড়েছে যে খাটের রঙ বুঝার কোন উপায় নেই। একটা, পায়াভাংগা টেবিল এপাশের দেয়ালে ঠেশ দিয়ে রাখা হয়েছে। টেবিলে কয়েকটা সিগারেটের খালি বাক্স এবং ম্যাচের ঠোসা। মদের দুটো খালি বোতল, একটা কাঁচের গ্লাস।
হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেল দেয়ালে, কয়েকখানা তৈলচিত্র টাঙানো রয়েছে দেখতে পেল। ছবিগুলোর গায়ে যদিও ধূলা-বালি লেগে একেবারে রঙ পাল্টে গেছে বা ছবির চেহারা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবু বনহুর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল, তৈল চিএগুলো নিশ্চয় রাজা সূর্যসেনের বংশধরগণের। হঠাৎ একটা ছবির ওপর দৃষ্টি পড়তেই বনহুর স্থির হয়ে দাঁড়াল, নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে রইল ছবিখানার দিকে।
সর্দারকে এভাবে ছবির দিকে নিম্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখে রহমান আশ্চর্য হলো। শুধু তাই নয়, রহমান অবাক হয়ে দেখল তার সর্দারের দুচোখে অশ্রু ভরে উঠেছে। ছবিখানা একটি যুবতীর তৈলচিত্র।
রহমান জিজ্ঞেস করল সর্দার, এ চিত্রখানা কার?
বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল—রাজা সূর্য সৈনের কন্যা সিন্ধীরাণীর।
সে এখন কোথায় সর্দার?
বেঁচে নেই! একটু থেমে পুনরায় বলল বনহুর-এই সিন্ধীরাণী একদিন আমাকে সাগরতলে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
বনহুরের কথা শেষ হতে না হতে আবার শোনা যায় সে করুণ তীব্র আর্তনাদ-আঃ আঃ আঃ উঃ উঃ….
বনহুর আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে রহমানসহ কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ল অন্ধকারে দ্রুত এগুলো।
কয়েকখানা ঘর পেরিয়ে একটা চোরাকুঠরির মত কক্ষের সামনে এসে, দাঁড়াল বনহুর আর রহমান। সেই কক্ষ হতেই করুণ আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল।
বনহুর আর রহমান দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাকাল কক্ষের ভেতরে। সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট কণ্ঠে বলল বনহুর—যা ভেবেছিলাম তাই। পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায়কে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।
বনহুরের পাশ কেটে উঁকি দিল রহমান। ভয়ঙ্কর দৃশ্য। অর্ধ বয়স্ক এক ভদ্রলোককে দুহাতে শিকল বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পা দু’খানা মাটি থেকে আধা হাত উপরে রয়েছে। একজন ভয়ঙ্কর চেরাহার লোক শঙ্কর মাছের লেজের চাবুক দিয়ে আঘাত করছে ভদ্রলোকের দেহে। ভদ্রলোকের সারা শরীর বেয়ে দরদর করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অস্ফুট আর্তনাদ করছেন ভদ্রলোক। দুজন লোক দাঁড়িয়ে, শরীরে তাদের রাজকীয় পোশাক।
বনহুর বলল-রহমান, ওদের চিনতে পেরেছ যারা দাঁড়িয়ে আছে?
হ্যাঁ সর্দার, একজন রাজকুমার মঙ্গলসিন্ধ, অন্যজন কঙ্কর সিং।
ঠিকই ধরেছ, ওদের চক্রান্তেই ধনঞ্জয় নিরুদ্দেশ হয়েছেন এবং তাঁকে এখানে আটকে রেখে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ রহমান?
হ্যাঁ করেছি, ধনঞ্জয়ের সামনে একটা অগ্নিকুণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে।
শুধু তাই নয়, অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে দুটো লৌহশলাকা লক্ষ্য করেছ?
হ্যাঁ সর্দার।
ঐ লৌহশলাকা দুটি ধনঞ্চয় রায়ের চোখে প্রবেশ করান হবে…
কি নির্মম…
তার পূর্বেই ধনঞ্চয় রায়কে উদ্ধার করে নিতে হবে।
ঐ দেখুন সর্দার, এবার লোকটা লৌহশপাকা দুটি হাতে তুলে নিচ্ছে।
আর বিলম্ব নয়, এসো আমার সঙ্গে-কথা শেষ করেই বনহুর বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল, তারপর একসঙ্গে বনহুর আর রহমান গুলিভরা উদ্যত রিভলবার হাতে কক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বনহুর রিভলবার ঠিক রেখে প্রচণ্ড এক পদাঘাতে লোকটার হাত থেকে অগ্নিদগ্ধ লৌহশলাকা দুটি দূরে নিক্ষেপ করল। নিরস্ত্র মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিং একপাশে দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধ জন্তুর ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে।
