নূর যখন ঘুমায় নূরী তখন তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর মুখের দিকে; সে যেন স্পষ্ট দেখতে পায় শিশুমুখে তার বনহুরের প্রতিচ্ছবি। নূরী অবাক হয়ে ভাবে এ কেমন করে সম্ভব হল। তার হুরের চেহারার সঙ্গে এ শিশুর চেহারার এতটা মিল কি করে সম্ভব হল!
কিন্তু যতই নূরী শিশুটাকে দেখত ততই আরও আকৃষ্ট হত আরও গভীরভাবে ভালবাসত, স্নেহ করত। এক মুহূর্ত নূরী শিশুটিকে চোখের আড়াল করতে পারত না।
একদিন শিশু মনিকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে নূরী, ঘুমের ঘোরে স্বপ্নরাজ্যে চলে যায় সে। দেখতে পায় গহন একটা বনের মধ্যে সে বনহুরকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কত কাটা বিধেছে তার পায়ে, কত আঘাত পেয়েছে শরীরে তবু আকুলভাবে খুঁজছে সে তার হুরকে। কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। হঠাৎ বন আলো করে একটা আলোর ছটা ফুটে উঠল। একি, নূরী অবাক হয়ে দেখল–সেই আলোর বন্যার মধ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে তার হুর আর একটি যুবতী। একি, এ যে সেই মেয়ে-যাকে সে একদিন কান্দাই বনের পোড়াবাড়িতে হুরের বাহুবন্ধনে দেখে সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছিল, ছুটে গিয়ে পুলিশের নিকটে বনহুরের সন্ধান দিয়েছিল। এ যে সেই মেয়ে–ওকি, ওদের মধ্যে একটা শিশু দাঁড়িয়ে, ছোট্ট শিশু এ যে তার মনি! মনি ওদের পাশে–নূরী ছুটে গিয়ে মনিকে বুকে তুলে নিল–সঙ্গে সঙ্গে নূরীর ঘুম ভেঙ্গে গেল, তাড়াতাড়ি পাশে শোয়া মনিকে টেনে নিল কোলের মধ্যে। মনের মধ্যে তখন একটা আলোড়ন শুরু হয়েছে। একি স্বপ্ন দেখল সে তার হুরের মনিই পাশে ঐ মেয়েটিকে আজ আবার নতুন করে দেখল। আর বা কেন তাদের পাশে?
নূরী যতই চিন্তা করতে লাগল–ততই একটা অসহ্য জ্বালা মনটাকে তার আচ্ছন্ন করে ফেলল।
গোটারাত তার ঘুম হল না।
সেদিন নূরীর মনে স্বপ্নটা একটা বিরাট পরিবর্তন এনে দিল। সব সময় ঐ স্বপ্নের দৃশ্যটা ওর চোখে ভেসে বেড়াতে লাগল। নূরী কিছুতেই নিজেকে প্রকৃতিস্থ রাখতে পারল না, বনহুরের অনুচর গহর আলীকে বললগহর আলী, তুমি যাবার আয়োজন কর আমি ঝিল শহরে যাব।
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলল গহর আলী–ঝিন্দ শহরেই তো সর্দার গেছেন। হাঁ, সে কারণেই আমি যাব গহর, তুমি আমার যাত্রার সব বন্দোবস্ত করে দাও।
তা কি করে সম্ভব বল, সর্দার নিশ্চয়ই সেখানে তোমাকে দেখে খুশি হবেন না।
না গহর, আমি আর তার জন্য প্রতীক্ষা করতে পারি না। আমি যাবই।
এদিকে কে সামলাবে?
আমি সব ব্যবস্থা করে যাব। নাজির হোসেন আছে, ফরহাদ আছে, আরও অনেক অনুচর আছে, সবাই হুরের আস্তানা সামলাবে–আমি না থাকলেও ক্ষতি হবে না।
বেশ আমি আয়োজন করব। কিন্তু কে কে তোমার সঙ্গে যাবে নূরী?
তুমি এবং আরও সাতজন আমার সঙ্গে থাকবে।
আচ্ছা, আমি যাত্রার আয়োজন করছি।
এদিকে মনিকে নিয়ে নূরী যখন ঝিন্দে যাবার আয়োজন করছে তখন ঝিন্দে বনহুর রাজা জয়সিন্ধের হত্যারহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত। রহমানও সব সময় তার পাশে পাশে রয়েছে ছায়ার মত।
গভীর রাতে গোটা বিশ্ব যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন দস্যু বনহুর রহমান সহ বেরিয়ে পড়ে। বনহুর তার অশ্ব তাজের পিঠে আর রহমান তার অশ্ব দুলকির পিঠে।
শরীরে তাদের জমকালো ড্রেস, মাথায় পাগড়ী, হাতে গুলিভরা রিভলবার।
শহরের পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছে দুটি অশ্ব–দস্যু বনহুর আর রহমান। নির্জন পথ, দু’ধারে বাড়িগুলো যেন সজাগ প্রহারীর মত দন্ডায়মান রয়েছে। কোন কোন বাড়ির মুক্ত গবাক্ষে ডিমলাইটের অনুজ্জ্বল ক্ষীণ আলোকরশ্মি দেখা যাচ্ছে।
দূর হতে ভেসে আসছে বেওয়ারিশ কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ।
দস্যু বনহুর আর রহমান আরও কিছুক্ষণ চলার পর শহরের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াল। অদূরে বিরাট একটা টিলা, টিলার উপর একখানা রাজ প্রাসাদ।
রাজপ্রাসাদ হলেও কালের নির্মম আঘাতে প্রাসাদটার আজ জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। রাজা সূর্যসেনের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র কন্যা সিন্ধিরাণীর অন্তর্ধানের পর বাড়িটা একেবারে পোডড়াবাড়ির মত হয়ে গেছে। বহুদিন বাড়িটার কোন যত্ন নেয়া হয়নি। কাজেই সব ভেঙে খসে পড়েছে।
বনহুর রহমানকে লক্ষ্য করে বলল–রহমান, সামনে যে প্রাসাদ দেখছ এটাই সূর্যসেনের বাড়ি।
সর্দার, এ বাড়িতে আমাদের কি প্রয়োজন?
প্রয়োজন আছে বৈকি! তুমি আমার সঙ্গে এসো। আর একটু অগ্রসর হবার পর আমাদের পায়ে হেঁটে যেতে হবে। কারণ অশ্বপদশব্দ আমাদের কার্যে ব্যঘাত ঘটাতে পারে।
রহমান সর্দারের কথার অর্থ ঠিকমত বুঝতে না পারলেও আর কোন প্রশ্ন করল না। সে সর্দারকে অনুসরণ করতে লাগল।
নিঝুম রাতি।
টিলার নিকট পৌঁছে অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়ালো বনহুর আর রহমান। অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলাল সূর্যসেনের বাড়িখানার দিকে।
বাড়িখানার নিকটবর্তী হতেই বনহুর আর রহমানের কানে ভেসে এলো একটা তীব্র আর্তনাদ—কাউকে যেন কশাঘাত করা হচ্ছে বা ঐ ধরনের কোন যন্ত্রণা দেয়া হচ্ছে। আর্তনাদটা পুরুষ কষ্ঠের।
রহমান অন্ধকারে একবার তাকাল বনহুরের মুখের দিকে। তার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিল—এ বাড়িখানার মধ্যে কে এমনভাবে তীব্র আর্তনাদ করছে?
বনহুর কোন জবাব না দিয়ে অগ্রসর হলো। দক্ষিণ হাতে তার উদ্যত রিভলবার। রহমানের হাতেও রিভলবার।
বাড়িটার ঠিক পেছন প্রাচীরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল বনহুর আর রহমান।
