বিনয় সেন মনিরাকে চিন্তা করতে দেখে বলল—গরমে বুঝি ঘুম হচ্ছে না তোমার?
মনিরা তার কথার কোন জবাব দিতে পারল না, বলল–আমায় কামরায় পৌঁছে দিন!
বিনয় সেন বলল–চল।
মনিরা নিজেদের কামরায় প্রবেশ করতেই দেখতে পায় সুফিয়া জেগে উঠেছে, মনিরাকে দেখে বলে—কোথায় গিয়েছিলে মনিরা?
বড্ড গরম বোধ করছিলাম–তাই একটু–
জানি।
কি জান সুফিয়া?
তুমি বিনয় সেনের কক্ষে যাওনি?
সুফিয়া!
মিথ্যা কথা বলো না মনিরা, আমি সব জানি।
কি জান সুফিয়া?
জানি, তুমি বিনয় সেনকে ভালবেসে—
ছিঃ ছিঃ একথা ভাবতে পারলে সুফিয়া?
মনিরা, আমি লক্ষ্য করেছি আজ বেশ কিছুদিন হল তুমি অত্যন্ত ভাবাপন্ন হয়ে পড়েছ। সব সময় তুমি বিনয় সেনের জন্য–
সুফিয়া, আমি ভাবতেও পারিনি তোমার মনে এমন একটা ধারণা দানা বাঁধতে পারে। বিনয় সেন বৃদ্ধ, গুরুজন স্থানীয়–তাকে আমি শ্রদ্ধা করি—
মনিরা আর সুফিয়ার মধ্যে যখন কথা হচ্ছিল তখন কামরার বাইরে দাঁড়িয়ে শুনে ফেলল বিনয় সেন, একটা মৃদু হাসির ক্ষীণ রেখা ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে।
মন্থর গতিতে নিজের কামরায় চলে গেল বিনয় সেন।
এরপর থেকে বিনয় সেন লক্ষ্য করল মনিরা আর সুফিয়ার মধ্যে বেশ একটা মনোমালিন্য ভাব। দু’জন সব সময় দু’জনকে এড়িয়ে চলতে চায়। কিন্তু এক বজরায় বাস করে এও কি সম্ভব? বিনয় সেন চিন্তিত হল।
একদিন বিনয় সেন সুফিয়াকে নির্জনে ডেকে বলল—সুফিয়া, একটা কথা তোমাকে বলব।
বলুন ভাইজান।
তোমাকে আমি বোনের মতই ভালবাসি—
আমি জানি ভাইজান।
সে কারণেই আজ আমি তোমার শরণাপন্ন হয়েছি।
সুফিয়া তাকাল বিনয় সেনের মুখের দিকে, কি বলতে চান বিনয় সেন। আজ সুফিয়া বিনয় সেনের সুন্দর দীপ্ত মুখমণ্ডলে এক অপূর্ব জ্যোতির লহরী লক্ষ্য করল। সুফিয়া তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
বিনয় সেন বলল–সুফিয়া, আমি মনিরাকে ভালবেসে ফেলেছি।
জানিনা, কেন আমার ওকে এত ভাল লাগে।
সুফিয়া চমকে উঠল–তাকাল বিনয় সেনের মুখের দিকে, পরক্ষণেই দৃষ্টি নত করে নিল।
বিনয় সেন বলে চলেছে–সুফিয়া, তুমিই একমাত্র আমার এ বাসনা পূর্ণ করতে পার।
সুফিয়া এবার বলল–মনিরা সুন্দরী, ওকে ভাললাগা স্বাভাবিক, আপনার মনের কথা আমি তাকে বলব।
হ্যাঁ সুফিয়া, তুমি যদি ওকে বুঝিয়ে কথাটা বল তাহলে আমি অত্যন্ত খুশি হব।
বেশ, আমি বলব।
সুফিয়া জানত এরকম একটা ঘটনা ঘটবে বা ঘটতে পারে। সে মনিরাকে এক সময় সব কথা খুলে বলল।
মনিরা স্তব্ধ হয়ে শুনল, তার মুখমণ্ডলে একটা গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। সে ভেবেছিল বিনয় সেন কোনদিন তার প্রতি খারাপ মনোভাব পোষণ করবে না। কিন্তু আজ তার মনের সে ধারণা নষ্ট হয়ে গেল। আশঙ্কায় বুকটা টিপ টিপ করে উঠল।
সুফিয়ার হাত মুঠায় চেপে ধরে বলল মনিরা সুফিয়া, তাকে তুমি বলে দিও তার উপকারের জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ, কিন্তু তাঁর কথায় আমি রাজী নই। আমাকে যদি তিনি হত্যাও করেন–তবুও না।
সুফিয়া মনিরার কথাগুলো বলল বিনয় সেনকে–ভাইজান, মনিরাকে আমি কিছুতেই রাজী করাতে পারলাম না। অতি কঠিন মেয়ে এই মনিরা।
বিনয় সেনের মুখে হাসি ফুটে উঠল, বলল সে–সুফিয়া, তোমার মনের ভুল ভেঙেছে তো?
সুফিয়া কথাটা বুঝতে না পেরে বলল–আমার মনের ভুল, কি বলছেন ভাইজান?।
সেদিন রাতে তুমি না মনিরাকে বলেছিলে সে আমার প্রতি আসক্তা–
সুফিয়া এবার বুঝতে পারল মনিরা আর তার মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছিল সব শুনেছেন বিনয় সেন। লজ্জিত হল সুফিয়া। সত্য সত্যই মনিরাকে সে একদিন সন্দেহ করেছিল। আজ সে সন্দেহ দূর হয়ে গেল।
এরপর থেকে মনিরা আর সুফিয়ার মধ্যে আবার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে উঠল। একসঙ্গে উঠা-বসা ও শোয়া সব হতে লাগল।
বিনয় সেন খুশি হল।
আবার সে স্বচ্ছ মনে রাজা জয়সিন্ধের হত্যারহস্য উদঘাটনে আত্মনিয়োগ করল।
০৫.
শিশু মনিকে নিয়ে নূরী দিনরাত ব্যস্ত থাকলেও সদাসর্বদা বনহুরের অভাব তার অন্তরে ব্যথার খোঁচা দিয়ে চলল। বনহুরই যে তার স্বপ্ন তার সাধনা। ওকে ছাড়া নূরী কোনদিন বাঁচতে পারে না। দিনের পর দিন কেটে চলল বনহুরের প্রতীক্ষায়, দিন গুণে নূরী। যখনই মনটা ওর অশান্তিতে ভরে উঠত তখনই শিশু মনিকে বুকে চেপে ধরত। একটা অনাবিল শান্তির ছোঁয়া তখন, তার হৃদয়কে শীতল করে দিত।
শিশু মনি এখন বেশ বড় হয়েছে। এক পা দু’পা করে হাঁটতে শিখেছে। সে। ফুলের মত সুন্দর ফুটফুটে মুখে অস্ফুট শব্দ করে বাব্বা–বাব্বা বা–
অমনি ছুটে এসে নূরী বুকে চেপে ধরত মনিকে, চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিত মুখখানা, বলত কোথায় তোমার বাবা? কে তোমার বাবা মনি?।
মনি দু’হাতে নূরীর গলা জড়িয়ে ধরে ফিক ফিক করে হেসে ফেলত। ফোকলা মুখে অপূর্ব সে হাসির ছটা।
নূরী প্রতিদিন শিশু মনিকে নিয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াত। ঝর্ণার ধারে বসে গান গাইত। চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকত–আয় আয় চাঁদ মামা, মনির কপালে টিপ দিয়ে যা। সোনার কপালে টিপ দিয়ে যা। কখনও বা দোলনায় শুইয়ে দোলা দিত আর গুনগুন করে গান গাইতে যে গান সে বনহুরের পাশে বসে কত দিন তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গাইত। সে গান নূরী সব সময় গায়। মনে পড়ে বনহুরের কথা। দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
বনহুর না থাকায় যদিও নূরীর তেমন কোন কষ্ট হয় না, আস্তানায় এখন বহু অনুচর রয়েছে যারা সদা সর্বদা নূরী এবং শিশুটির সুখ-সুবিধার দিকে নজর রেখেছে।
