কঙ্কর সিং বলে উঠল-হতাশ হবার কিছু নেই, আজই আমি নতুন একটা আমদানি করব। কুমার বাহাদুর কত টাকা দেবে বল?
যত খুশি চাও দেব। বন্ধু, এখন আমি রাজা মঙ্গলসিন্ধ, কুমার নই–বুঝেছ? টাকার জন্য তোমার কোন চিন্তা নেই।
চমৎকার! এই তো কথার মতো কথা, দাও পাঁচ হাজার। হাত পাতলো কঙ্কর সিং।
মঙ্গলসিন্ধ বিনয় সেনকে বলল–কোষাধ্যক্ষকে বলে দিন। কঙ্করকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দিতে।
বিনয় সেন উঠে দাঁড়াল, বলল–আচ্ছা।
০৩.
বাগানবাড়ি।
মঙ্গলসিন্ধ আর কঙ্কর সিং বসে আছে, সামনে মদের বোতল। অদূরে বসে বিনয় সেন। একটা নতুন মেয়ে নাচছিল, চোখেমুখে ভীতি ভাব। তবু নাচছে কম্পিত চরণ তুলে।
বার বার করতালিতে মুখর হয়ে উঠছিল কক্ষটা।
হঠাৎ কঙ্কর সিং উঠে দাঁড়ায় ইংগিত করল।
মঙ্গলসিন্ধ উঠে কঙ্কর সিংকে অনুসরণ করল।
দু’জন কানে মুখ নিয়ে কিছু বললো, তারপর বিনয় সেনকে লক্ষ্য করে বলল মঙ্গল সিন্ধ–আপনি এখন যেতে পারেন।
বিনয় সেনের ভালও লাগছিল না, উঠে দাঁড়াল চলে বাবার পূর্বে একবার নতুন নর্তকীর দিকে তাকিয়ে দেখল।
দুটো অসহায় দৃষ্টির সংগে বিনয় সেনের দৃষ্টির বিনিয়ম হল।
বিনয় সেন বাগানবাড়ি ত্যাগ করল।
অন্ধকারে এগিয়ে চলেছে বিনয় সেন, হঠাৎ তার সামনে একটা জমকালো মূর্তি এসে দাঁড়াল অন্ধকারেও বিনয় সেন বুঝতে পারল মূর্তিটার হাতে একটা রিভলবার।
বিনয় সেন কিছু বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ থ, মেরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল–কি চাও?
জমকালো মূর্তিটা চাপাকণ্ঠে বলল–যদি মঙ্গল চাও তবে শীঘ্র রাজ বাড়ি ত্যাগ করে চলে যাও–
বিনয় সেন স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল—যদি না যাই?
মৃত্যু! তোমাকে মরতে হবে।
বিনয় সেন হাসল হাঃ হাঃ হাঃ, মৃত্যু ভয়ে ভীত নয় বিনয় সেন। রাজকার্য পরিচালনায় কুমার বাহাদুরকে সে সাহায্য করবেই। কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড এক লাথি মেরে জমকালো মূর্তির হাত থেকে রিভলবারখানা ফেলে দিল দূরে–তারপর চলল ধস্তাধস্তি। বেশিক্ষণ বিনয় সেনের সঙ্গে পেরে উঠল না জমকালো মূর্তি অন্ধকারে আত্মগোপন করে প্রাণ বাঁচালো।
বিনয় সেন আর বিলম্ব না করে ফিরে গেল নিজ বজরায়।
পথে নানা চিন্তার জাল তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। রাজা জয়সিন্ধের হত্যাকারী কে, তবে কি তার পুত্র মঙ্গলসিন্ধের চক্রান্তেই রাজা নিহত হয়েছেন? নাকি কঙ্কর সিংয়ের কাজ এটা। তাদের আচরণে যথেষ্ট সন্দেহের ছোঁয়া রয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ না সত্যিকার খুকে আবিষ্কার করতে পেরেছে বিনয় ‘ সেন ততক্ষণ তার মনে শাস্তি নেই। যেমন করে হোক আসল খুনীকে তার খুঁজে বের করতেই হবে। মহৎ রাজার হত্যার প্রতিশোধ নিতেই হবে। কিন্তু কে এই জমকালো মূর্তি যে আজ তাকে রিভলবার দেখিয়ে রাজবাড়ি ত্যাগ করার জন্য ভয় দেখাচ্ছিল? কি এর অভিসন্ধি, আর কেনই বা তাকে সরে পরার জন্য এত তাগাদা–
বজরায় এসেও বিনয় সেনের মন থেকে এই চিন্তা দূর হল না। শয্যায় শুয়ে শুয়ে ঐ সব নিয়েই ভাবছে বিনয় সেন। বয় এসে তাকে খাবার জন্য বলল।
বিনয় সেন বয়কে জিজ্ঞাসা করল–সুফিয়া আর মনিরা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?
হ্যাঁ স্যার, তারা আর এতরাতে জেগে থাকতে পারেন, অনেকক্ষণ আগে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
বিনয় সেন বলল–তুই যা, আমি আসছি।
বয় চলে গেল।
বিনয় সেন শয্যা ত্যাগ করে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল।
গভীর চিন্তায় এতক্ষণ সে হাতমুখ ধোয়ার কথাও ভুলে গিয়েছিল।
বাথরুমে প্রবেশ করে পরিষ্কার পানিতে হাতমুখ ধুয়ে ফেলল বিনয় সেন, ক্লান্তি আর অবসাদ অনেকটা দূর হল তার। বজরায় এখন মনিরা আর সুফিয়া অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
কিন্তু বিনয় সেনের ধারণা সত্য নয়। সুফিয়া ঘুমালেও মনিরা ঘুমাতে পারেনি এখনও। গত কয়েকদিন ধরে মনিরার মনে একটা কথা সর্বদা ঘুরপাক খাচ্ছিল, বিনয় সেন বৃদ্ধা বা প্রৌঢ় নন, তিনি সুন্দর সুপুরুষ বলেছিল সুফিয়া। এ কথাটাই অহরহ মনিরার মনে দ্বন্দ্ব জাগাচ্ছিল, কে এই বিনয় সেন? তার কাছে নিজেকে গোপন করাই বা কারণ কি? আজ মনিরা দেখতে চায় কে এই বিনয় সেন–মনিরা চোরের মত চুপি চুপি শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল। মনের মধ্যে একটা অনুভূতি তাকে উত্তেজিত করে তুলছিল। পা টিপে টিপে বজরার দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে অতি সন্তর্পণে বিনয় সেনের কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়াল। গভীর অন্ধকার রাত্রি। আকাশে অসংখ্যা তারার মেলা। মৃদু বাতাস বইছে, বজরাখানা একটু একটু দোল খাচ্ছে।
মনিরা দরজার ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো বুকের মধ্যে আলোড়ন শুরু হয়েছে। নিজেকে সংযত করে উঁকি দিল ভেতরে।
বজরার কক্ষ শূন্য। কেউ নেই, শয্যা শূন্য–মনিরা ভীত হল, হঠাৎ যদি সুফিয়া জেগে উঠে তাকে বিছানায় না দেখে বেরিয়ে আসে–এখানে যদি দেখতে পায় কি ভাববে, ছিঃ ছিঃ লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। কিন্তু ফিরে যাওয়া চলবে না। আজ মনিরা দেখবে এই বিনয় সেন কে?
০৪.
মনিরা চমকে উঠল, কে যেন তার কাঁধে হাত রেখেছে ফিরে তাকাতেই বিবর্ণ ফ্যাকাশে হল তার মুখমণ্ডল, বিনয় সেন তার পেছনে দাঁড়িয়ে হেসে বলল বিনয় সেন—এখানে কি দেখছ মনিরা?
মনিরা লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেল। ছিঃ ছিঃ কেন সে এভাবে এখানে এসেছিল। নিশ্চয়ই বিনয় সেন তাকে কিছু ভেবে বসেছেন। সুফিয়া তাকে জব্দ করার জন্যই হয়তো এ কথা বলেছে, না, না, সুফিয়ার কথায় বিশ্বাস করা তার ঠিক হয়নি।
