বিনয় সেন বলেছিল সেদিন—হাঁ কুমার বাহাদুর, কঙ্কর সিং ঠিকই বলেছেন, আপনি রাজ্যভার গ্রহণ করে রাজকার্য শুরু করুন।
অন্যান্য রাজকর্মচারী নীরব ছিলেন, কারণ তারা সবাই জানেন মঙ্গলসিন্ধ কেমন লোক। রাজকার্যভার সে গ্রহণ করলে দেশের ও দশের কি
অবস্থা দাঁড়াবে। মঙ্গলসিন্ধের আচরণে ভেতরে ভেতরে সবাই অসন্তুষ্ট ছিল। রাজকুমারের ব্যবহারে তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
মঙ্গলসিন্ধ যখন পিতার শোকে মুহ্যমান হয়ে বার বার রুমালে চোখ মুছিল, তখন রাজকর্মচারিগণ বাঁকা চোখে তাকিয়ে দেখছিলেন। মঙ্গলসিন্ধের এ কান্না যে নিছক একটা ভণ্ডামি এটা সবাই বুঝতে পেরেছিলেন। রাজার জীবিতকালে সে যথেচ্ছাচরণে প্রায়ই বাধা পেত। অনেক সময় পিতার নিকটে তিরস্কার শুনতে হত। এমনকি রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে পুত্রকে অনেকবার ত্যাজ্যপুত্র করতে চেয়েছিলেন। এহেন পিতার মৃত্যুতে পুত্রের চোখের পানি যে একটা অহেতুক লোক দেখান কারসাজি, এটা অনেকেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছিলেন।
কিন্তু লোকে যতই যা ভাবুক বা মনে করুক রাজার মৃত্যু ঘটেছে, কাজেই রাজার প্রয়োজন। একমাত্র পুত্র মঙ্গলসিন্ধ ছাড়া রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর কেউ নেই।
মঙ্গলসিন্ধ রাজা হল।
মঙ্গলসিন্ধ রাজা হয়ে প্রথমেই বুড়ো মন্ত্রী কৃষ্ণ সেনকে রাজকার্য থেকে বহিস্কার করল। সে আসনে প্রতিষ্ঠা করল বন্ধু কঙ্কর সিংকে। আর বিনয় সেনকে করল তার প্রধান সহকারি।
বিনয় সেন মঙ্গলসিন্ধের এই আন্তরিকতায় খুশি হল।
মঙ্গলসিন্ধের রাজকার্যে বিনয় সেন যথেষ্ট সহায়তা করে চলল।
আর কঙ্কর সিং করে চলল ঠিক তার উল্টো, রাজকার্যে মঙ্গলসিন্ধকে সব সময় কুপরামর্শ দিতে লাগল। যতদূর সম্ভব কঙ্কর সিং নিজেও প্রজাদের ওপর চালাল নানা অত্যাচার আর উৎপীড়ন।
সেদিন মঙ্গলসিন্ধ নিজের বিশ্রামকক্ষে বসেছিল। আজকাল মদ পান তার বেড়ে গেছে। বাগানবাড়িতেও আজকাল প্রতিদিন বাঈজী নাচ চলছে। কঙ্কর সিং আর বিনয় সেনের সঙ্গে মঙ্গলসিন্ধের আলাপ আলোচনা হচ্ছিল।
কক্কর সিং বলল–কুমার, একটা বড় দুঃসংবাদ আছে।
মঙ্গলসিন্ধ মদের শূন্যপাত্রটা নামিয়ে রেখে বলল–দুঃসংবাদ। না, দুঃসংবাদ শুনতে আমি রাজী নই বন্ধু।
বিনয় সেন আগ্রহভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল শঙ্কর সিংয়ের মুখের দিকে তারপর শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল–কোন রাজকার্যঘটিত দুঃসংবাদ না কি?
কঙ্কর সিং বলে উঠল-রাজকার্যঘটিত দুঃসংবাদ হলে তাতে তেমন ঘাবড়াবার কিছু ছিল না। এটা তার চেয়ে বড় দুঃসংবাদ।
এবার মঙ্গলসিন্ধের টনক নড়ল, বলল—তবে কিসের দুঃসংবাদ কঙ্কর?
হেমালিনী নিহত হয়েছে। হয়েছে—
হেমাঙ্গিনী নিহত হয়েছে। বল কি বন্ধু?
শুধু হেমাঙ্গিনীই নিহত হয়নি, তার আস্তানা পুলিশের দখলে চলে গেছে–
এও কি সব?
অসম্ভব কিছুই নয় কুমার, হেমাঙ্গিনীকে পুলিশ হত্যা করে তার আস্তানা গল করে নিয়েছে, তার সহকারীদের বন্দী করে, কারাগারে আবদ্ধ করেছে।
আর তার মাল?
তাদের পুলিশের হেফাজতে যার যার পিতা-মাতা আত্মীয় স্বজনের নিকটে পাঠান রয়েছে।
বল কি কঙ্কর, এত বড় ঘটনা কবে ঘটল?
সে আজ বেশ কিছুদিন হল, তুমি যখন কারাগারে বন্দী ছিলে–
মঙ্গলসিন্ধ চিৎকার করে উঠল–আমাকে জানাওনি কেন?
তুমি এমনিই বিমর্ষ এবং চিন্তাযুক্ত ছিলে তাই।
তুমি একথা আমাকে না জানিয়ে ভুল করেছ কঙ্কর। হেমাঙ্গিনীকে পুলিশ হত্যা করে আমার বুকের পাজর গুড়া করে দিয়েছে। আমি পুলিশদের সমুচিত শাস্তি দেব।
বিনয় সেন মৃদু হেসে বলল–আর আপনার পিতার হত্যাকারীকে শাস্তি দেবেন না কুমার বাহাদুর?
মঙ্গলসিন্ধ কিছু বলার পূর্বেই বলে উঠল কঙ্কর সিং–মহারাজ বৃদ্ধ হয়েছিলেন, অচিরেই তাঁর মৃত্যু ঘটত–সেক্ষেত্রে তাঁকে হত্যা করে হত্যাকারী তেমন কোন ক্ষতি করেনি।
বিনয় সেন কঙ্কর সিংয়ের কথার কোন জবাব না দিয়ে তাকাল মঙ্গলসিন্ধের দিকে।
মঙ্গলসিন্ধ তখন বোতল থেকে শূন্যপাত্রে খানিকটা তরল পদার্থ ঢেলে ঢক ঢক করে গলাধঃকরণ করল তারপর জড়িত কণ্ঠে বলল–বুড়োমানুষগুলো দুনিয়ার আবর্জনার মত জঞ্জাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাবা গেছে, তার অদৃষ্ট তাকে সরিয়ে নিয়েছে। তাকে কে হত্যা করল বা করেছে এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় আমার নেই। তাছাড়া পিতার হত্যাকারীকে শাস্তি-হাঃ হাঃ হাঃ—বিনয় সেন আপনি–না না, থাক আজ নয়, পরে আরও পরে সব বলব, কিন্তু–
কঙ্কর সিং মঙ্গলসিন্ধের পিঠে থাবা দিয়ে বলে উঠল–কিন্তু আর নয়, চুপ কর।
হাঁ চুপ করলাম, কিন্তু হেমাঙ্গিনী ছাড়া আমার মনে কে শান্তি এনে দেবে বন্ধু?
বিনয় সেন হেসে বলল–এজন্য দুঃখ করে কি হবে। শ্রী কঙ্কর সিং থাকতে অমন হেমাঙ্গিনীর চেয়ে আরও কত হেমাঙ্গিনী রয়েছে শহরে, খুঁজে বের করবেন উনি।
কঙ্কর সিং বিনয় সেনের কথায় খুশি হল, বলল সে হাঁ কুমার, বিনয় সেন যা বলেছে অতি সত্য, এক হেমাঙ্গিনী গেছে আরও কত হেমাঙ্গিনী সৃষ্টি হবে যারা নিত্যনতুন মাল তোমাকে পরিবেশন করবে।
কিন্তু আমি যে বড় হাঁপিয়ে পড়েছি কঙ্কর। মঙ্গলসিন্ধের গলায় অসহায় ভাব।
বিনয় সেন বলে উঠল-বাঈজীদের নাচ কি আপনার মনে শান্তি এনে দেয় না কুমার বাহাদুর।
না বিনয় সেন, বাঈজীদের নীরস নাচ আর গান আমার মনে কোন আনন্দ দেয় না, আমি চাই নিত্য নতুন ফুল–কথা শেষ করে হাঃ হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল মঙ্গলসিন্ধ–
