হাঁ, রহমান যতদিন আমি রাজা জয়সিন্ধের হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে না পেরেছি ততদিন আমার ঝি ত্যাগ করা সম্ভব নয়। তুমি তো জান রহমান, দস্যু বনহুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে জান কোরবান করতেও দ্বিধা বোধ করে না। তুমি প্রস্তুত হয়ে নাও, আজ রাতেই আমরা বের হব, দেখতে চাই কে এই রাজা জয়সিন্ধের মৃত্যুদূত।
কথাগুলো বলার সময় বনহুরের মুখমণ্ডল কঠিন হয়ে উঠল। নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে বজরার মেঝেতে পায়চারী কবতে লাগলো সে।
রহমান বনহুরের উত্তেজিত ভাব লক্ষ্য করে ভীত হল। সর্দারকে সে এমনভাবে রাগতে খুব কমই দেখেছে। রহমান ভয়ঙ্কর একটা কিছুর প্রতীক্ষা করতে লাগল, তবু বুলল–সর্দার, ঝিন্দের রাজার মৃত্যু ঘটেছে তাতে আমাদের এত বিচলিত হবার কি দরকার?
রহমান, বনহুর শুধু যে দেশে জন্মেছে সে দেশের সন্তান নয়। সারা বিশ্ব তার জন্মস্থান। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার আপনজন। ন্যায় তার রীতি, অন্যায়ের বিরুদ্ধেই তার সংগ্রাম, এর কোনদিন পরিবর্তন হবে না।
বনহুরের এ কথার পর রহমান আর কিছু বলতে পারল না। সর্দারকে সে ভালভাবে জানে, সে একবার যা বলবে তা না করে ছাড়বে না।
সে বুঝতে পারল জয়সিন্ধের হত্যাকারীকে সর্দার খুঁজে বের করবেই এবং জয়সিন্ধের হত্যার প্রতিশোধ সে নেবেই।
০২.
সেদিন মনিরা আর সুফিয়া শুয়ে শুয়ে গল্প করচ্ছিল। এখন তাদের একসঙ্গেই উঠা-বসা, নাওয়া-খাওয়া এমনকি ওরা দু’জন এক সঙ্গে একই কক্ষে, একই বিছানায় শোয়।
নানা সুখ-দুঃখের গল্প করে, হাঁসে কাঁদে, কত রকম কথাবার্তাই না হয় মনিরা আর সুফিয়ার মধ্যে।
সেদিন কথায় কথায় বলে মনিরা—সত্যিই বোন সুফিয়া, আজ আমরা মহৎ হৃদয় বিনয় বাবুর জন্যই রক্ষা পেয়েছি, তার এ উপকারের কথা আমরা কোনদিন ভুলবো না। আজও তিনি আমাদের যে উপকার করে চলেছেন তা আর বলার নয়। তাঁর মত মহান লোক এ দুনিয়ায় খুবই কম আছেন।
মনিরার কথায় বলে উঠল সুফিয়া–ঠিকই বলেছ মনিরা, তার সুন্দর চেহারার সঙ্গে মনের অদ্ভুত মিল আছে। এমন সুন্দর সুপুরুষ আর বুঝি হয় না।
হ্যাঁ সুফিয়া, একদিন তিনি সুন্দর সুপুরুষই ছিল হয়তো, যদিও তিনি আজ বৃদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু—
মনিরার কথা শেষ হয় না, সুফিয়া খিল খিল করে হেসে উঠল–বৃদ্ধকাকে তুমি বৃদ্ধ বলছ মনিরা?
কেন বিনয় বাবুর কথা বলছি, তিনি সত্যি এককালে সুন্দর সুপুরুষ ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
এসব কি বলছ মনিরা। কাকে তুমি বৃদ্ধ বলছ?
মনিরা একটু হকচকিয়ে যায়, অবাক কণ্ঠে বলে–হাসছ যে বড়?
তোমার কথাশুনে না হেসে পারছি না মনিরা–বিনয় বাবুকে তুমি বৃদ্ধ বললে কি করে?
মনিরা বিব্রত কণ্ঠে বলল–তিনি একেবারে বৃদ্ধ না হলেও প্রৌঢ় তো—
আবার হাসল সুফিয়া, তারপর বলল, তুমি কার কথা বলছ মনিরা, আমি বুঝতে পারছি না।
মনিরা গম্ভীর কণ্ঠে বললো–আমাদের উদ্ধারকর্তা বিনয় বাবুর কথা বলছি।
আশ্চর্য। তিনি তো যুবক, বৃদ্ধ দেখলে কখন?
তিনি যুবক!
হাঁ, তিনি সুন্দর সুপুরুষ যুবক।
মনিরা অন্যমনস্কভাবে অস্ফুট কন্ঠে বলল—তবে যে কথা শেষ না করে কিছু ভাবতে লাগল মনিরা, এসব কি শুনছে সে। বিনয় সেন তাহলে বৃদ্ধের ছদ্মবেশে তার কাছে আত্মপ্রকাশ করেছে, তবে কে সে?
গভীররাত। সুফিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে পাশে?
মনিরার চোখে ঘুম নেই। কত কথাই না তার মনে উদয় হচ্ছে। পিতামাতা, মামা-মামীমা, স্বামী, শিশুপুত্র নূরের কথা একটার পর একটা স্মৃতি ছায়াছবির মত ভেসে উঠছে তার মানসপটে। মনিরার মনের ব্যথা অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ছে বালিশে। তারপর সব কথা মুছে নতুন করে একটা কথা আলোড়ন জাগাল তার বুকের মধ্যে। বিনয় বাবু তাকে বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়েছিল পিশাচিনী হেমাঙ্গিনীর নিকট হতে। কিন্তু কোনদিন তার প্রতি কোন অসৎ আচরণ করেনি। বরং আজ বিনয় বাবুর মহত্ত্বের জন্যই সে নতুন জীবন লাভ করেছে। কিন্তু সুফিয়ার নিকটে আজ যে কথা সে শুনল তা অতি বিস্ময়কর। বিনয় বাবু বৃদ্ধ নন–যুবক, অতি সুন্দর সুপুরুষ–এ সব কি তবে সত্যি কথা? বিনয় সেনের তার নিকট বুদ্ধের ছদ্মবেশ ধারণের কারণ কি?
হঠাৎ মনিরার চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ল, নদীতীরে অশ্বপদশব্দে চমকে উঠল মনিরা, তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করে বজরার জানালায় গিয়ে দাঁড়াল, কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেল না মনিরা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও কিছুই নজরে পড়ল না, অশ্বপদশব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দূর হতে দুরান্তে।
মনিরা বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।
মঙ্গলসিন্ধের বাগানবাড়িতে আবার আনন্দের বান ডেকে যাচ্ছে। নাচেগানে ভরপুর হয়ে উঠেছে বাগানবাড়ি। মঙ্গলসিন্ধ এখন স্বাধীন, তাকে বাঁধা দেবার বা তার কাজে আপত্তি জানাবার কেউ নেই।
পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে মঙ্গলসিন্ধ কিছুটা শোকের ভান করেছিল, প্রজাদের ডেকে দুঃখ জানিয়ে চোখে রুমাল চাপা দিয়ে কেঁদেছিল। সেদিনও বিনয় সেন দাঁড়িয়েছিল তার পাশে। মঙ্গলসিন্ধের চোখের পানি তার অন্তরেও ব্যথার সৃষ্টি করেছিল। মঙ্গলসিন্ধের কান্নায় প্রজাদের মনেও কষ্ট হয়েছিল অনেক। কঙ্করসিং বন্ধুর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল–সবদিন কি কারও পিতা-মাতা জীবিত থাকে? কি হবে দুঃখ করে—এখন রাজ্য ভার গ্রহণ করে—প্রজাদের দুঃখভার লাঘব কর।
