শেষ পর্যন্ত পুলিশবাহিনী জয়ী হলো, জানবাগ হোটেলের কর্মচারীদের বন্দী করে নিয়ে ফিরে চলল তারা।
১৯.
বনহুর অর রহমান অশ্বপৃষ্ঠে এগিয়ে চলেছে।
দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা হচ্ছিল।
বনহুর বলল-রহমান, জানবাগ হোটেলের ম্যানেজার তাহলে তোমার গুলিতেই নিহত হয়েছে?
হাঁ, সর্দার, দারোগাকে আহত করে ভাগছিল, বেটা, আমি ওকে শেষ করে দিয়েছি।
ভালই করেছ রহমান।
সর্দার, নারীহরণকারী দল নিঃশেষ হল, এবার দেশে ফিরে যাওয়া থাক।
হাঁ, তাই যাব কিন্তু আরও কটা দিন আমাকে ঝিন্দে অবস্থান করতে হবে।
কেন সর্দার?
আরও কিছু কাজ বাৰ্ক আছে। হেমাঙ্গিনীর সিন্দুক থেকে বহু অর্থ আমি উদ্ধার করেছি, এই অর্থ আমি ঝিন্দের দীন-দুঃখীর মধ্যে বিলিয়ে দিতে vাই। কারণ, ঝিন্দের টাকা আমি নিয়ে যেতে চাই না।
সর্দার, আপনিই তাহলে হেমাঙ্গিনীকে—
হাঁ রহমান, আমি হেমাঙ্গিনীর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছি। কিন্তু হেমাঙ্গিনীর দক্ষিণ হাত গহর আলী মে এক ব্যক্তি সে এখনও জীবিত, এখনও পলাতক। যাক, ওকে আমি যেখানেই পাব, চিনতে পার তাতে কোন সন্দেহ নেই। রহমান, তুমি ছদ্মবেশে ঝিন্দ শহরে দীন-দুঃখীদের মধ্যে সন্ধান মাও সত্যিকার দুঃখী লোক কারা এবং তাদের কি সাহায্য প্রয়োজন, সেই মত তাদেরকে অর্থ সাহায্য করবে।
আচ্ছা সর্দার।
এবার বনহুর তার অশ্বের গতি বাড়িয়ে দিল।
রহমানও সর্দারকে অনুসরণ করল।
ঝিন্দ নদীর বালুকাময় তীর বেয়ে দ্রুত এগিয়ে চললো দস্যু বনহুর আর হমানের অশ্ব।
বিনয় সেন এক সময় মনিরার সঙ্গে সুফিয়ার দেখা করার সুযোগ করে দিল।
মনিরাকে দেখামাত্রই সুফিয়া চিনতে পারল। কারণ ওরা একই সঙ্গে হেমাঙ্গিনীর বন্দীখানায় ছিল। মনিরাকে দেখতে পেয়ে সুফিয়া জড়িয়ে ধরল, আনন্দে অধীর হয়ে বলল–তুমি এখানে কি করে এলে?
মনিরা বলল—যিনি তোমাকে এখানে এনেছেন তিনি আমাকেও এনেছেন, তার দয়াতেই আমি হেমাঙ্গিনীর অভিশপ্ত নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পেরেছি। সত্যি বোন, আমরা উভয়েই আজ তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
মনিরা আর সুফিয়ার মধ্যে অনেক দুঃখের বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা হল। সুফিয়া কি করে দুষ্ট শয়তানদের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে; কিভারে রাজকর্মচারী বিনয় সেন তাকে উদ্ধার করলেন এবং তাকে বোনের আসনে প্রতিষ্ঠা করেছেন সব খুলে বলল সুফিয়া মনিরার কাছে।
একেই মনিরা বিনয় সেনের ব্যবহারে অত্যন্ত মুগ্ধ ছিল, সুফিয়ার মুখে তার আরও প্রশংসা শুনে অনেক খুশি হল।
বিনয় সেন এই দুই যুবতীর মধ্যে দেখা দিত দুই আকারে। সুফিয়া জানে, বিনয় সেন সুন্দর সুপুরুষ যুবক। আর মনিরা জানে, বিনয় সেন প্রৌঢ় অমায়িক মহৎ হৃদয় এক ভদ্রলোক।
কিন্তু আসল পরিচয় তার কেউ জানে না-কে এই বিনয় সেন।
১.১১ ঝিন্দের রাণী
০১.
মঙ্গলসিন্ধ কারাগারে বাস করলেও বাইরের সব খবর তার নিকটে পৌঁছত। রাজার কয়েকজন দুষ্ট অনুচর ছিল, তারা গোপনে সব কথা জানাত কুমার বাহাদুরের নিকটে। একদিন কয়েকজন দুষ্ট অনুচরের সহায়তায় কারাগারের পাহারাদারকে হত্যা করে কারাগার থেকে বেরিয়ে এল মঙ্গলসিন্ধ। এখন মঙ্গলসিন্ধের পায়ের জখম সম্পূর্ণ সেরে গেছে। কারণ, রাজকুমার কারাগারে বাস করলেও তার চিকিৎসার কোন ত্রুটি হয়নি।
মঙ্গলসিন্ধের প্রধান সহচর কঙ্কর সিং যেমন নির্দয় তেমনি নীচুমনা।
মঙ্গলসিন্ধ বন্ধুর কাছে এমন এক পরামর্শ পেল যা তার মনে এনে দিল প্রতিহিংসার বহ্নিজ্বালা।
সেদিন রাজা জয়সিন্ধ নিজের কক্ষে নিদ্রিত ছিলেন। সারাটা দিন তিনি প্রজাদের মঙ্গল-চিন্তায় মগ্ন থাকতেন এবং প্রজাদের যতটুকু উপকার করতে পারেন তার কোন ত্রুটি করতেন না। তার ন্যায়বিচারে প্রজাগণ সব সময় তুষ্ট ছিল।
গভীর রাতে মঙ্গলসিন্ধ কারাগার থেকে বেরিয়ে এল। হস্তে তার সুতীক্ষ্ণধার ছোরা, অতি গোপনে পিতার কক্ষে প্রবেশ করল সে। কঙ্কর সিং দাঁড়িয়ে রইল বাইরে।
মঙ্গলসিন্ধ পিতার শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দু’চোখে তার অগ্নিশিখা নির্গত হচ্ছে। কি ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করেছে মঙ্গলসিন্ধ দক্ষিণ হাতে তার সুতীক্ষ্ণধার ছোরা।
মঙ্গলসিন্ধ একবার তীব্র কটাক্ষে পিতার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, তারপর অতি দ্রুতহস্তে ছোরাখানা আমূল বসিয়ে দিল রাজা জয়সিন্ধের বুকে।
তীব্র একটা আর্তনাদ করে উঠলেন রাজা জয়সিন্ধ, তারপর নীরব হয়ে গেল সব।
কেউ জানল না, কেউ দেখল না, কে রাজাকে হত্যা করল পরদিন রাজ্যময় কথাটা ছড়িয়ে পড়ল পত্রিকায় পত্রিকায় প্রকাশ পেল ন্যায়বিচারক রাজা জয়সিন্ধের নির্মম হত্যা রহস্যের কথা।
সমস্ত রাজ্যে একটা গভীর শোকের ছায়া ঘনিয়ে এল। প্রজাগণ এবং দেশবাসী হাহাকার করে উঠল, আজ থেকে তাদের ন্যায়দণ্ড ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
কথাটা নিজের বজরায় বসে শুনল দস্যু বনহুর।
দক্ষিণ হাত তার মুষ্ঠিবদ্ধ হল, চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠল দাঁতে দাঁত পিষে বলল–রাজা জয়সিন্ধের খুন আমার মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে রহমান।
বনহুরের সামনে দণ্ডায়মান ছিল রহমান, বলল সে –এমন মহৎ সদাশয় রাজাকে কে হত্যা করল?
সে প্রশ্ন আমাকেও উত্তেজিত করে তুলছে রহমান। ভেবেছিলাম অচিরেই আমরা ঝিন্দা শহর ত্যাগ করে চলে যাব কিন্তু তা হল না।
সর্দার, আবার এখানে–
