কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশসহ অন্তঃপুরে প্ররেশ করলেন ধনঞ্জয় রায়।
বিনয় সেন সেই অবসরে পথে অদৃশ্য হল।
১৮.
হেমাঙ্গিনী গভীর রাতে সিন্দুক খুলে টাকার অংক মিলিয়ে দেখছে। আজ তার কত টাকা সিন্দুকের টাকার সঙ্গে যোগ ইল। হেমাঙ্গিনীর চোখেমুখে আনন্দের দ্যুতি খেলে যাচ্ছে। এতগুলো টাকার মোহ তাকে আনন্দে আত্মহারা করে তুলছে। বার বার টাকার মাণ্ডিলগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে সে।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়াল হেমাঙ্গিনীর সামনে। তার দক্ষিণ হস্তে উদ্যত রিভলবার।
হেমাঙ্গিনী চমকে চোখ তুলে তাকাল, সঙ্গে সঙ্গে অস্কুট ধ্বনি করে উঠল-কে তুমি?
কঠিন অথচ চাপাকণ্ঠে বলল ছায়ামূর্তি-আমি তোমার মৃত্যুদূত।
ছায়ামূর্তির হাতের রিভলবারের দিকে তাকিয়ে হেমাঙ্গিনীর কণ্ঠনালী শুকিয়ে গেল, ঢোক গিলে বলল-কি চাও?
সমস্ত টাকা!
না, তা হবে না, প্রাণ দেব তবুও টাকা দেব না—কে তুমি, আমি এখনই পুলিশ ডাকব।
পুলিশ তোমাকে ডাকতে হবে না, এখনই আসবে। শিগগির টাকাগুলো আমায় দিয়ে দাও।
না না, দেব না আমি টাকা।
দেখ, চিঙ্কার করলে এখনই তোমাকে হত্যা করব।
হত্যা!
হাঁ।
হেমাঙ্গিনী অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকলি দরজার দিকে।
ছায়ামূর্তি বললো—কেউ আসবে না। পুলিশ তোমার বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে।
পুলিশ! ভয়ার্ত কণ্ঠে কথাটা উচ্চারণ করল হেমাঙ্গিনী।
ছায়ামূর্তি বলে উঠল-আমি তোমাকে পুলিশের হাতে দেব না। একটানে হেমাঙ্গিনীকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে রিভলবার চেপে ধরল, তারপর দাঁতে দাঁত পিষে বলল শয়তানী, নারীহরণ করে যে পাপ তুমি করেছ তার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে আমার হাতেই ভোগ করতে হবে–সঙ্গে সঙ্গে ছায়ামূর্তির হাতের রিভলবার গর্জে উঠল।
একটা তীব্র আর্তনাদ করে মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে গেল হেমাঙ্গিনী।
ছায়ামূর্তি এবার দ্রুতহস্তে সিন্দুকের তালা খুলে টাকার বাণ্ডিলগুলো জামার চোরা পকেটে লুকিয়ে ফেলল। তারপর বিন্দুকের তালা বন্ধ করে চাবিগোছা ছুঁড়ে ফেলে দিল পাশের জানালা দিয়ে দোতলার নিচে বাগানে। এবার ছায়ামূর্তি রিভলবারখানা খুঁজে দিল প্রাণহীন হেমাঙ্গিনীর হাতের মুঠায়।
তারপর যে পথে ছায়ামূর্তি প্রবেশ করেছিল সেই পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ততক্ষণে পুলিশবাহিনীসহ ধনঞ্জয় রায় অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছে।
ইতোমধ্যে বিনয় সেন এসে দাঁড়াল ধনঞ্জয় রায়ের পাশে।
ধনঞ্জয় রায় বলে উঠল-বাড়ির ভেতর থেকে একটা গুলির শব্দ এল-ব্যাপার কি?
আমিও সেই শব্দ শুনে এদিকে ছুটে এলাম ইন্সপেক্টার সাহেব। চলুনত দেখি।
বিনয় সেন আগে আগে, পুলিশবাহিনী তাকে অনুসরণ করলো।
হেমাঙ্গিনীর কক্ষে প্রবেশ করে স্তম্ভিত হলেন পুলিশ ইন্সপেক্টার ধনঞ্জয় রায় ও বিনয় সেন। হেমাঙ্গিনীর রক্তাক্ত দেহটা একটা পাহাড়ের মতো মেঝেতে পড়ে আছে। দক্ষিণ হাতে তার রিভলবার এখনও ধরা রয়েছে।
বিনয় সেন বলে উঠল—হেমাঙ্গিনী পুলিশের আগমন জানতে পেরে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত নিজেই করেছে। কিন্তু এখানে আর বিলম্ব নয়, এই মুহূর্তে তার দলবল যারা এ বাড়িতে আছে তাদের পাকড়াও করতে হবে, চলুন।
ধনঞ্জয় রায় হেমাঙ্গিনীর লাশের নিকটে একজন পুলিশ পাহারা রেখে বিনয় সেনের সঙ্গে এগিয়ে চললেন।
যে কক্ষে হেমাঙ্গিনীর দল নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল প্রথমে সে কক্ষে প্রবেশ করল পুলিশবাহিনী।
পুলিশের দল কাউকে রাইফেলের তো আর কাউকে বুটের লাথি দিয়ে জাগিয়ে তুলল।
ভীষণ আকার লোকগুলো জেগে উঠে হাবা বনে গেল। প্রত্যেকটা লোকের বুকের কাছে পুলিশবাহিনী রাইফেল উঁচিয়ে ধরেছে। সবাইকে। গ্রেফতার করতে আদেশ দিলেন ধনঞ্জয় রায়। কিন্তু সেই অবসরে গুণ্ডাদের নেতা যে পাশের কামরায় ঘুমাচ্ছিল জেগে উঠেই ব্যাপারটা আঁচ করে নিল, তারপর সকলের অলক্ষ্যে সরে পড়ল। লোকটার নাম ছিল গহর আলী।
বিনয় সেন কিন্তু গহর আলীকে দেখে ফেলল। এই মুহূর্তে তার পেছনে ধাওয়া করা উচিত মনে করল না সে, কারণ এখন তাকে এখানে বন্দী ঐ মেয়েদের উদ্ধার কার্যে নিযুক্ত হতে হবে।
পুলিশবাহিনী ততক্ষণে গুণ্ডাদলকে গ্রেফতার করে ফেলেছে!
বিনয় সেন এবার সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে চলল, ‘তার সঙ্গে ধনঞ্জয় রায় ও কয়েকজন পুলিশ।
যুবতীদের বন্দীকক্ষে প্রবেশ করে তাদের উদ্ধার করে নেয়া হল। একটি প্রাণীও এল না আজ পুলিশবাহিনীকে বাধা দিতে। যুবতীগণকে উদ্ধার করে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন ধনঞ্জয় রায়, বিনয় সেনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে ললেন-আপনার সহায়তায় এত বড় একটা জঘন্য নারীহরণ কারী দলকে অতি সহজে গ্রেফতারে সক্ষম তুলাম, সেজন্য অশেষ ধন্যবাদ বিনয় বাবু!
বিনয় সেন হেসে বলল-আপনার সাহায্য না পেলে আজ আমি কিছুই করতে পারতাম না ইন্সপেক্টার সাহেব, এজন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ধনঞ্জয় রায় এবং বিনয় সেন যখন নারীহরণকারী গুণ্ডাদলকে গ্রেফতার ও যুবতীগণকে উদ্ধার করে নিয়ে পুলিশ অফিস অভিমুখে ফিরে চললেন, ঠিক তখন জনবাগ হোটেলে ভীষণ লড়াই চলছে। পুলিশবাহিনী আর হেমাঙ্গিনীর গুণ্ডাদল মিলে চলেছে ধস্তাধস্তি-মারামারি।
কয়েকজন গুণ্ড নিহত আঁর আহত হল। পুলিশদের মধ্যেও নিহত হল দু’তিনজন। তারপর গুণ্ডাদের পাকড়াও করতে সক্ষম হলো পুলিশবাহিনী। বাসুদেবও আহত হলেন জানবাগ হোটেলের ম্যানেজারের হাতে। ম্যানেজার বাসুদেবকে আহত করে পালাতে যাচ্ছিল কিন্তু সে পালাতে সক্ষম হল না, অজ্ঞাত গুলির আঘাতে নিহত হল।
