বিনয় সেন বলল—কিন্তু লোকের কথা শুনেই ওভাবে তোমাকে তার করা উচিত হয়নি।
ত্যাগ তিনি করেননি, আমার অদৃষ্ট আমাকে এভাবে ঘুরপাক খাওয়া।
তোমার সন্তান এখন কোথায়?
পুনরায় মনিরার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, ধরা গলায় বলল—সে নেই, এক সন্ন্যাসী তাকে নিয়ে গেছে।
কে বলল এ কথা?
ঐ হেমাঙ্গিনী তাকে কাপালিক সন্ন্যাসীর নিকট বিক্রি করেছিল।
বিনয় সেনের মুখমণ্ডল ইস্পাতের মত কঠিন হয়ে উঠল। দু’চোখ দিয়ে নির্গত হতে লাগল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। দাঁতে দাঁত পিষে বলল, হেমাঙ্গিনী!
হাঁ, হেমাঙ্গিনী আমাকে আরও দুবার বিক্রি করেছিল কিন্তু খোদা আমার সহায়, তাই আজও আমি নিজের ইজ্জত রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছি। আমি ইজ্জত বাঁচাতে নরহত্যা করেছি নিশ্চয়ই একদিন আমার স্বামীর মনের ভুল ভেঙে যাবে। তিনি হয়তো আমার মনের কথা জানতে পারবেন, আমাকে বিশ্বাস করবেন, আমাকে গ্রহণ করবেন।
মনিরার কথায় বিনয় সেনের চোখ দিয়ে ফোটা ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
মনিরা বলল—আমার দুঃখে আপনি কাঁদছেন। সত্যি আমি বড় হতভাগী। নইলে অমন স্বামী, অমন সন্তান হারাব কেন?
মনিরা তুমি নিশ্চিন্ত থাক আমি তোমার স্বামীকে খুঁজে বের করব। তাকে সব খুলে বলব। তুমি নিশ্চিন্ত থাক মনিরা।
মনিরা কোন জবাব দিতে পারল না।
বিনয় সেন উঠে দাঁড়াল–আমি চললাম হেমাঙ্গিনীকে তার উচিত সাজা দিতে।
না না, আপনি যাবেন না, আপনি যাবেন না। ওর সঙ্গে পারবেন না। অনেক লোক ওর রয়েছে–
মনিরা তুমি দোয়া কর আমি সব বিপদ যেন হাসিমুখে জয় করতে পারি–কথা শেষ করেই বেরিয়ে গেল বিনয় সেন।
১৭.
ঝিন্দ পুলিশ অফিস।
পুলিশ অফিসারগণ এবং পুলিশবাহিনীর প্রায় সকলেই ঝিল অধিবাসী। সকলেরই চেহারা বলিষ্ঠ, মজবুত। ঝিন্দবাসীরা প্রায়ই কর্তব্যপরায়ণ এবং নিষ্ঠাবান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝিন্দাবাসী প্রাণ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না বা পিছপা হয় না।
এমন দেশেও রয়েছে অনাচার-অবিচার অত্যাচার-উৎপীড়ন। লোকচক্ষুর অন্তরালে সর্বদা যে কত দুষ্কর্ম সাধিত হচ্ছে তার ঠিক নেই। যেমন আলোর পেছনে অন্ধকারের ঘনঘটা।
ঝিন্দ শহর অতি সুন্দর এবং মনোরম। রাজা জয়সিন্ধের ন্যায়বিচারে এখানে প্রজাগণ সুখে বসবাস করত। কিন্তু সেই ন্যায়বান রাজার অন্যায়বান পুত্র মঙ্গলসিন্ধের দুষ্কর্মে নগরবাসী হাঁপিয়ে উঠল, কিন্তু ভয়ে কেউ কোন কথা বলতে পারত না বা সাহস হত না। রাজা বিচার করতেন রাজদরবারে, আর রাজকুমার নির্যাতন চালাত লোকচক্ষুর অন্তরালে, কাজেই নগরের যত অনাচার অত্যাচার গোপনেই চলতো, বাইরে তেমনভাবে কিছু প্রকাশ পেত না।
গভীর রাত।
পুলিশ ইন্সপেক্টার শ্রী ধনঞ্জয় রায় এবং বড় দারোগা শ্রী বাসুদেব পুলিশ অফিসে বসে কোন গোপন ডায়েরী নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। দু’জন জমাদার ও কয়েকজন পুলিশ থানা ইনচার্জে রয়েছেন। পুলিশগণের হাতে গুলিভরা রাইফেল।
এত রাতে একখানা ট্যাক্সি এসে থামল পুলিশ অফিসের সামনে। নেমে এল বিনয় সেন, এখন তার শরীরে প্রৌঢ় ভদ্রলোকের বেশ নেই! গাড়ি থেকে নেমে সোজা পুলিশ অফিসের দিকে এগুলো একদল পুলিশ জিজ্ঞাসা করল—আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
বিনয় সেন জবাব দিল-রাজবাড়ি থেকে?
রাইফেল নত করে দাঁড়াল পুলিশগণ।
বিনয় সেন পুলিশ অফিসের দরজায় গিয়ে কলিং বেলে চাপ দিল, সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এল–কে?
বিনয় সেন জবাব দিল-আমি রাজকর্মচারী।
আসুন!
বিনয় সেন পুলিশ অফিসে প্রবেশ করল।
রাজকর্মচারীর আগমনে ধনঞ্জয় রায় এবং বাসুদেব উঠে অভ্যর্থনা জানালেন।
তারপর সকলে আসন গ্রহণ করার পর ধনঞ্জয় রায় জিজ্ঞাসা করলেন-এত রাতে?
বিনয় সেন বলল অতি গুরুতর খবর, একটা নারীহরণকারী গোপন আস্তানার সন্ধান আমি পেয়েছি।
ধনঞ্জয় রায়, বাসুদের ও অন্যান্য পুলিশ অফিসার কিছুদিন যাবৎ নারীহরণকারী দল সম্বন্ধে বেশ সচেতন হয়ে পড়েছেন, কারণ ইতোমধ্যে ঝিল শহরের কয়েকজন সুন্দরী তরুণী নিখোঁজ হস্কেছে। আজও এই ব্যাপার নিয়েই এতক্ষণ ধনঞ্জয় রায় ও বাসুদেবের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল! বিনয় সেনের কথায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন ধনঞ্জয় রায়, বললেন কি করে আপনি ঐ আস্তানার সন্ধান পেলেন?
বিনয় সেন বলল আমার বোনকে ওরা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, তাকে উদ্ধার করতে গিয়েই আমি ওদের আস্তানার সন্ধান পেয়েছি। আপনারা আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করবেন না, এক্ষুণি প্রস্তুত হয়ে নিন। আরও একটা কথা, শুধু হেমাঙ্গিনীর বাড়িতে তার কারবার সীমাবদ্ধ নয়, তার দলকল অনেকেই জানবাগ হোটেলে রয়েছে। এ হোটেলটি হেমাঙ্গিনীর।
ধনঞ্জয় রায় আদেশ দিলেন পুলিশবাহিনীকে তৈরি হয়ে নেবার জন্যে।
অল্পক্ষণেই সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়ে নিল।
ধনঞ্জয় সশস্ত্র পুলিশবাহিনী নিয়ে চললেন হেমাঙ্গিনীর বাড়ি অভিমুখে, তাদের সঙ্গে রইল বিনয় সৈন।
আর বাসুদেব পুলিশবাহিনীর আর একটা দল নিয়ে চললেন জানবাগ হোটেল অভিমুখে।
নিশীথ রাতের জনহীন পথ বেয়ে সশস্ত্র বাহিনীসহ কয়েকটা মোটরকার দ্রুত ছুটে চলল।
ধনঞ্জয় রায় সেন দলবল নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন হেমাঙ্গিনীর বাড়ির সামনে। ধনঞ্জয় রায়ের ইঙ্গিতে পুলিশবাহিনী সঙ্গে সঙ্গে হেমাঙ্গিনীর গোটাবাড়ি ঘেরাও করে ফেলল।
