বিনয় সেন মনিরাকে কক্ষে নিয়ে গিয়ে ওর হাতের এবং মুখের বাঁধন খুলে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে মনিরা সরে দাঁড়াল একপাশে। দু’চোখে তার ঝরে পড়ছে সর্পিনীর মত ক্রুদ্ধ দৃষ্টি, নিঃশ্বাস দ্রুত বইছে, দাঁতে অধর দংশন করে সে।
বিনয় সেন মনিরার দিকে এগুলো না বা তাকে পাকড়াও করলো না, নিস্পন্দ নয়নে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
মনিরা অবাক হল লোকটা তার দিকে অমনভাবে তাকিয়ে আছে কেন। রাগও হলো মনিরার, সে পেছন ফিরে দাঁড়াল।
বিনয় সেন তখনও স্থির দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে। মনিরার হৃৎপিণ্ড ঢিপ ঢিপ করছে, এই বুঝি তার ওপর হামলা করে বসল, বেশ কিছু সময় কেটে গেল এখনও তো লোকটা কিছু বলছে না বা তাকে কোন রকম বিরক্ত করছে না। ব্যাপার কি? মনে মনে কিছুটা সাহস হল মনিরার, আবার সে তাকাল বিনয় সেনের দিকে। একি এখন প্রৌঢ় ভদ্রলোক তার দিকে তেমনিভাবে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চয়ই লোকটা ভারছে কোন কথা। হয়ত অনুরোধ জানালে মায়া হতে পারে। হাজার হলেও বুড়ো মানুষ তো, পিতার বয়সী। কিন্তু এতগুলো টাকা সে আমার জন্য দিয়েছে, এত সহজে ছাড়বে? তবুও যার হৃদয় বলে কিছু আছে সে কোনদিন এ জঘন্য বা হৃদয়হীন হতে পারে না।
মনিরা নিজেকে রক্ষার জন্য ওর পায়ে ধরবে তবুও যদি সে পরিত্রাণ পায়। এবার মনিরা ছুটে গিয়ে বিনয় সেনের পা জড়িয়ে ধরল-আমাকে বাঁচান….
বিনয় সেন মনিরাকে দু’হাতে বাড়িয়ে তুলে নিল, গম্ভীর স্থিরকণ্ঠে বলল–ভয় নেই, আমি তোমাকে কোন দুষ্ট মতলবে নিয়ে আসিনি।
মনিরা কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাল বিনয় সেনের মুখের দিকে।
বিনয় সেন বলল আমি তোমাকে ঐ নর-পিশাচিনীর কবল থেকে উদ্ধার করার জন্যই এভাবে নিয়ে এলাম।
মনিরা এবার বলে উঠল—আপনি এত টাকা আমার জন্য নষ্ট করলেন
নষ্ট নয়, ও টাকা আমার সৎ উদ্দেশ্যে ব্যয় হয়েছে। তোমাকে দেখে আমার বড় মায়া হল তাই–বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এল বিনয় সেনের কণ্ঠ।
মনিরার দু’গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা অশ্রু। কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল তার মন, বলল সে-আপনার এ উপকারের কথা জীবনে ভুলব না। জানি না আপনি কে—আপনার পরিচয়ই বা কি, তবু আপনার মহৎ হৃদয়ের যে পরিচয় পেলাম কোনদিন তা আমার মন থেকে মুছে যাবে না।
বিনয় সেন এবার বলল—যদিও আমি ঝিন্দ শহরে বাস করি কিন্তু আমি ঝিন্দের অধিবাসী নই, আমি বিদেশী। আমার নাম বিনয় সেন। উপস্থিত আমি রাজকর্মচারী পদে নিযুক্ত রয়েছি। হাঁ, তুমি আমার এখানে নির্ভয়ে থাকতে পার। পাশের কামরায় তোমার মত আর একজন রয়েছে, সেও গৃহহারা, রিক্তা। আচ্ছা এবার বল তোমাকে কোথায় পৌঁছে দিলে তুমি নিশ্চিন্ত হতে পারবে?
মনিরা কিছুক্ষণ বিষণ্ণ বদনে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ব্যথিত কণ্ঠে বলব–কোথায় যাব জানি না।
কেন, তোমার বাবা-মা স্বামী?
বড় অপয়া আমি, আজ আমি সর্বহারা।
ছিঃ দুঃখ করতে নেই, তুমি বস, বসে স্থির হয়ে কথা বল।
বসলো মনিরা। কতদিন পর আজ মনিরা স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করল।
বিনয় সে জিজ্ঞাস করল—তোমার নাম কি?
আমার নাম মনিরা।
কোথায় বাড়ি তোমার?
কান্দাই শহরে।
সে তো এখান থেকে বহু দূরে।
হ্যাঁ
সেখানে তোমার কে আছেন?
আমার কেউ নেই, এক মামীমা আছেন।
বেশ, সেখানেই তোমাকে পৌঁছে দেব। কিন্তু দেখ মনিরা, আমার কাছে তুমি কিছু লুকাবে না, আমি তোমার মঙ্গল কামনা করি।
হ্যাঁ, তা আমি বুঝতে পেরেছি। আপনার মত হৃদয়বান এ বিশ্বে বুঝি কেউ নেই।
আচ্ছা মনিরা, তোমার একমাত্র মামীমা ছাড়া আর কি কেউ নেই?
সব ছিল, আজ নেই।
তোমার বাবা-মা?
মারা গেছেন।
তোমার ভাই-বোন?
ছিল না।
তোমার স্বামী?
মনিরা নিশ্চুপ হয়ে পড়ল, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো তার চোখ দিয়ে।
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলল—স্বামীর কাছে আমি অবিশ্বাসিনী হয়েছি।
অবিশ্বাসিনী!
হ্যাঁ, আমার স্বামীর মনে একটা মিথ্যা সন্দেহ প্রবেশ করেছিল তারপর থেকে তিনি আর আমার সন্ধান নেননি।
এত হৃদয়হীন তোমার স্বামী! মিথ্যা সন্দেহ করে তোমার মত স্ত্রীর প্রতি যে অবিচার করতে পারে
না না, আমার স্বামী হৃদয়হীন নন, তিনি অতি মহৎ, অতি মহান—
নারীমন অমনই হয়, নারীর কাছে স্বামী পরম গুরু তাই তার সকল দোষ স্ত্রীর নিকট মার্জনীয়। কিন্তু আমার কাছে তোমার স্বামী এক পাপীষ্ঠ–শুধু পাপীষ্ঠই নয়–নরপিশাচ–
না না, ওসব কথা বলবেন না। আমি সব সইতে পারি সব কষ্ট বুক পতে নিতে পারি কিন্তু আমার স্বামীর নামে কোন কথা সইতে পারি না–
মনিরা দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
বিনয় সেন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
অনেকক্ষণ কাঁদল মনিরা, তারপর বুকের তার কিছুটা যেন লাঘব হল, এবার সোজা হয়ে বসল আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে বলল—আমার স্বামীর কোন দোষ নেই, তিনি যে মুহূর্তে যেমন কথা শুনেছেন তাতে সন্দেহ হওয়াই স্বাভাবিক। আপনি আমার গুরুজন তাই আপনার নিকট আমি সব বলছি–আমার এক ছেলে জন্মেছিল। দুর্ভাগ্য, সন্তানটি যখন আমার পেটে আসে তার কয়েক দিন পরই আমার স্বামী নিরুদ্দেশ হন। তারপর আবার তার সঙ্গে আমার যখন সাক্ষাৎ ঘটে, তখন আমার কোলে নবজাত শিশু। এবং যে মুহূর্তে আমার সঙ্গে আমার স্বামীর প্রথম সাক্ষাৎ হল সে মুহূর্তে এক দুষ্ট ব্যক্তি আমার সন্তান সম্বন্ধে কুৎসিত ইংগিত করেছিল, কাজেই নি ভুল করেননি।
