তাই নাকি?
হ্যাঁ, সেই কারণেই তো আজও পড়ে আছে। ওর পরে কত এলো কত গল, তবু সে রয়েছে। এখন যে আসে তার কাছে মূল্য বেশি চাই, কাজেই নিতে পারে না, আমিও খুনের হাত থেকে বেঁচে যাই!
তাহলে তো অমন মেয়েই আমার দরকার। নিরীহ মেয়ে আমার ভাল লাগে না, যেমন আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়। আচ্ছা হেমাঙ্গিনী, ওর এন্য আপনাকে কত দিতে হবে?
তা আপনাকে… মানে আপনার যা খুশি দেবেন।
বিনয় সেন মৃদু হেসে বলল—বিশ হাজার।
এত বেশি!
তার চেয়েও বেশি দিতে রাজী আছি হেমাঙ্গিনী দেবী।
বেশ, কিন্তু দেখবেন খুন-জখম না হয়ে বসেন!
মরতে যখন একদিন হবেই তখন ওসবে আমার ভয় নেই। তা টাকাটা কখন দিতে হবে?
যখন আপনার খুশী।
এই নিন টাকা, আমি সঙ্গেই এনেছি। পকেট থেকে হাজার টাকার কয়েক খানা নোট বের করে হেমাঙ্গিনীর সামনে বাড়িয়ে ধরল।
হেমাঙ্গিনীর চোখ দুটো জ্বলে ওঠে জ্বলজ্বল করে—একসঙ্গে বিশ হাজার টাকা! হেমাঙ্গিনীর মুখ দিয়ে কোন কথা বের হল না। হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে জামার ফাঁকে বুকের কাছে রাখল।
মনিরা তখন সব বুঝতে পেরেছে, এবার তারই পালা। চোখে মুখে ফুটে উঠল তার একটা প্রতিহিংসার হিংস্র ভাব।
হেমাঙ্গিনী এবার মনিরার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, গলার স্বর যতদূর সম্ভব মোলায়েম করে বলল-উনি মস্ত বড়লোক; তোমাকে রাজরাণী করে গাখবেন, যাও-যাও তুমি!
না, যাব না। কেন বাছা আমাকে বারবার জ্বলচ্ছে? উনি ভদ্র সন্তান, উনি মস্ত ধনবান, উনি অনেক জ্ঞানবান।
তবু আমি যাব না।
দেখ মেয়ে, তুমি আমাকে হাড়ে হাড়ে জ্বালিয়েছ, তোমার জন্য আমার অনেক টাকা লোকসানও গেছে। এবার আমি তোমাকে রেহাই দেব না।
আমি যাব না।
তিলে তিলে তোমাকে শুকিয়ে মারব।
মরতেই চাই আমি।
মরতে চাইলেই মরতে দেব? আমার টাকাগুলো জলে ভেসে যাবে, তা হচ্ছে না বাছাধন… এবার বিনয় সেনকে লক্ষ্য করে বলল হেমাঙ্গিনী-আপনার গাড়ি?
বিনয় সেন বলল-বাইরে অপেক্ষা করছে।
হেমাঙ্গিনী হাতে তিনটা তালি দিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনটা যমদূতের মত ভীষণ আকার লোক এসে দাঁড়াল। মনে হলো যেন পাতালপুরী রাজ্য থেকে এল ওরা। হেমাঙ্গিনী বললো–বাইরে অন্ধকারে যে গাড়িটা অপেক্ষা করছে সেইগাড়িতে তুলে দিয়ে এসো।
ভয়ঙ্কর লোক তিনজন এগুলো মনিরার দিকে।
মনিরার মুখমণ্ডল ভয়ার্ত বিবর্ণ হয়ে উঠল, জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল সে।
ভয়ঙ্কর লোক তিনটা যেমনি মনিরাকে ধরতে গেল, অমনি মনিরা আর্তকণ্ঠে বলে উঠল-না, না, আমি যাব না, আমি যাব না, আমাকে তোমরা স্পর্শ কর না।
লোক তিনটা তবু পাকড়াও করার জন্য হাত বাড়াল মনিরার দিকে।
হেমাঙ্গিনী বলে উঠল-দড়ি দিয়ে হাত-পা বেঁধে গাড়িতে উঠিয়ে দাও।
বিনয় সেন বলে উঠল-থাক, দড়ি দিয়ে বাঁধতে হবে না। আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি। এই, তোমরা সরে দাঁড়াও। বিনয় সেনের কথায় লোক তিনটি থমকে দাঁড়াল।
বিনয় সেন এবার মনিরার দিকে এগুলো।
মনিরা তাকাল বিনয় সেনের দিকে। দু’চোখে ওর ঝরে পড়ছে ক্ৰদ্ধ হিংস্র ভাব।
বিনয় সেন মুহূর্ত বিলম্ব না করে খ করে মনিরার হাত মুষ্ঠিতে চেপে ধরল।
মনিরা অমনি হাতখানা ছাড়িয়ে নেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু একচুলও হাত নড়াতে পারল না। বিনয় সেন অতি সহজেই মনিরাকে নাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল।
হেমাঙ্গিনী হতবাক হল, যে যুবতীকে একসঙ্গে তিন-চার জন বলিষ্ঠ লোক এতটুকু নড়াতে পারে না, আর কিনা একজন লোক তাকে এভাবে নিয়ে যেতে পারল।
বিনয় সেন মনিরাকে গাড়িতে তুলে নিতেই ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিল। মনিরা তখনও নিজেকে বিনয় সেনের কবল থেকে বাঁচিয়ে নেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। গাড়িতে বসেই বিনয় সেন মনিরার মুখে একটা রুমাল বেঁধে দিল যেন সে চিৎকার করতে না পারে। তবু মনিরা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ধস্তাধস্তি করছে দেখে ৱিনয় সেন তার হাত পিছমোড়া করে বাঁধল।
গাড়ি চালাচ্ছিল গোপীনাথ।
গাড়ি ছাড়ার পূর্বে গোপীনাথ বিনয় সেনকে জিজ্ঞাসা করল–কোথায় যাবেন হুজুর? রাজবাড়িতে আপনার বাসায়, না আপনার বজরায়।
বিনয় সেন বলল—আমার বজরায়।
গাড়ি শহর ছেড়ে বাইরের পথ ধরে ছুটে চলল।
বিনয় সেন মনিরাকে নিয়ে বিদায় হতেই হেমাঙ্গিনী অন্যান্য মেয়ের দিকে একবার সতৃষ্ণ নজরে তাকাল—এদের বিক্রি করে আর কত হাজার পাওয়া যেতে পারে, এটাই বুঝে ভেবে নিল সে। তারপর কক্ষের দরজায় তালা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে নিজের কক্ষে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। টাকাটা অন্য সময় সুযোগ বুঝি গুণে দেখবে, এখনকার মত রেখে দিল লোহার সিন্দুকে।
হেমাঙ্গিনীর আনন্দ আজ আর ধরে না, আজ তার বাঈজী জীবন সার্থক হয়েছে। বিনয় বাবুর মত একজন সুপুরুষ যুবক তার রূপের প্রশংসা করেছে। আর একটু হলেই তারই প্রেমে পড়ে যেত বিনয় বাবু, কিন্তু ঐ ছুড়ীটাই আর বাধার কারণ হয়ে দাঁড়াল। যাক, তবু তো একসঙ্গে এতগুলো টাকা! হেমাঙ্গিনী আজ নাচতে শুরু করে, জোয়ান থাকতে অনেক নেচেছে, কিন্তু সে আজ প্রায় বিশ বছর আগের কথা। এখনও সে বেশ নাচতে পারত, শুধু শরীরটায় যা মেদ হয়েছে, পা দু’খানা যেন আর নড়তে চায় না এই যা!
১৬.
প্রৌঢ় ভদ্রলোকের বেশে বিনয় সেন মনিরাকে নিয়ে নিজের বজরায় প্রবেশ করল। মনিরার হাত দু’খানা পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। মুখেও রুমাল বাঁধা। কাজেই মনিরা চিঙ্কার বা নড়াচড়া করতে পারছিল না। অসহায় মনিরার বুকের মধ্যে ঝড় বইছে। ভয়ঙ্কর একটা কিছুর জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল সে। এই দুষ্ট শয়তানের কবল থেকে কি করে নিজেকে রক্ষা করবে সেই চিন্তা করতে লাগল। ভাবছে মনিরা—এবার আর অর রক্ষা নেই, এই বুঝি তার জীবনের শেষ পরিণতি। সে নীড়হারা কপোতীর ন্যায় থর থর করে কাঁপছে।
