কোথায় যাবেন বিনয় বাবু?
আমি যে কারণে এসেছি।
ও, এখনও আপনি ঐ কথাই ভাবছেন? বেশ চলুন, কিন্তু একটা কথা আমার রাখতে হবে।
বলুন।
আপনাকে সেখানে ছদ্মবেশে যেতে হবে।–কেন? অবাক কণ্ঠে বলল বিনয় সেন।
হেমাঙ্গিনী মৃদু হেসে বলল-আপনার ঐ সুন্দর রাজপুত্রের মত চেহারা দেখলে আমার সবগুলো মেয়েই….।
ও, বেশ তো আমি ছদ্মবেশেই যাব।
আসুন আমার সঙ্গে।
হেমাঙ্গিনী বিনয় সেনকে নিয়ে একটা কক্ষে প্রবেশ করল। বিনয় সেন বেশ ঘাবড়ে উঠছিল, হেমাঙ্গিনী আবার তাকে এখানে নিয়ে এল কেন।
হেমাঙ্গিনী বলে উঠল-এটা আমার ছদ্মবেশ কক্ষ। এখানে আপনি ইচ্ছামত চেহারা পালটে নিতে পারেন। চলে যাচ্ছিলো হেমাঙ্গিনী, পুনরায় ফিরে এসে বলল-শুনুন, আপনি কিন্তু বেশ বুড়োর ড্রেস পরে নেবেন।
আচ্ছা। হেসে বিনয় সেন দরজা বন্ধ করল।
ড্রেসিং কক্ষ থেকে যখন বিনয় সেন বের হলো তখন সে সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষ। যদিও তার চেহারায় প্রৌঢ়ত্বের ছাপ ফুটে উঠেছে, তবু তাকে দেখলে মনে হচ্ছে যেন কোন সম্ভ্রান্ত ধনবান ব্যক্তি। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, গোঁফ-দাড়ি রুচিসম্মত। শরীরে পাজামা আর পাঞ্জাবী। হাতে রূপোর বাটওয়ালা ছড়ি।
হেমাঙ্গিনীর সামনে এসে দাঁড়াল প্রৌঢ় ভদ্রলোকের বেশে বিনয় সেন।
খুশি হলো হেমাঙ্গিনী, আনন্দভরা কণ্ঠে বলল, হয়েছে, খুব সুন্দর হয়েছে। আসুন আমার সঙ্গে।
বিনয় সেন হেমাঙ্গিনীকে অনুসরণ করল।
হেমাঙ্গিনী তার বিশাল বপু নিয়ে হাতির মত দুলতে দুলতে এগিয়ে চলল আর বিনয় সেন চারদিকে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার পেছনে পেছনে এগুতে লাগল।
নারীহরুণকারীদের গোপন আস্তানাই বটে। বাড়িটা বহুকালের পুরান হলেও এখনও কোথাও ভেঙ্গে খসে পড়েনি বা ধ্বসে যায়নি।
অনেকগুলো কক্ষ পেরিয়ে হেমাঙ্গিনী একটা ছোট্ট কক্ষের মধ্যে এসে দাঁড়াল। দিনের বেলাও বেশ অন্ধকার। হেমাঙ্গিনী সুইচ টিপে আলো জ্বালল। এবার বিনয় সেন দেখল কক্ষটা সিঁড়িঘর।
বেশ সরু ধরনের একটা সিঁড়ি সোজা নেমে গেছে নিচের দিকে। হেমাঙ্গিনী আর বিনয় সেন সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল।
সিঁড়িটা বেশ ঘুরে ঘুরে নিচের দিকে নেমে গেছে। সিড়িতেও আলো ছিল। কাজেই নামতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না বিনয় সেনের।
সিঁড়িমুখে পৌঁছে হেমাঙ্গিনী দেবী থমকে দাঁড়াল। সিঁড়ির শেষে একটা পরজা রয়েছে। দরজায় মস্তবড় একটা তালা আটকান। হেমাঙ্গিনী কোমর থেকে একগোছ চাবি বেছে নিল, তারপর তালাটা খুলে ফেলল। বিনয় সেন সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল কিন্তু কক্ষটা জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন, কিছুই দেখতে পেল না সে। হেমাঙ্গিনী এবার বিনয় সেনকে তার সঙ্গে আসার জন্য ইংগিত করল।
বিনয় সেন বলল-ঐ অন্ধকারে কোথায় যাব হেমাঙ্গিনী দেরী?
আসুন, আলো জ্বেলে দিচ্ছি। হেমাঙ্গিনী অন্ধকারে প্রবেশ করে দরজার পাশেই দেয়ালে হাত রেখে সুইচ টিপল, সঙ্গে সঙ্গে কক্ষ আলোময় হলো।
বিনয় সেন কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পেল, কক্ষের ওপাশে আর একটা লোহার দরজা, সেই দরজাতেও মস্তবড় একটা তালা লাগান।
হেমাঙ্গিনী এ তালাটাও পূর্বের ন্যায় অতি স্বচ্ছন্দে খুলে ফেলল।
হেমাঙ্গিনীর সংগে বিনয় সেন কক্ষে প্রবেশ করতেই বিস্ময়ে আড়ষ্ট হল কয়েকটা যুবতীকে সেই কক্ষে দেখতে পেল। কেউ বা বসে কেউ বা বিছানায় শুয়ে রয়েছে। সকলেরই মুখমণ্ডল বিষণ্ণ, মলিন। চোখ বসে গেছে। কেউ কেউ নীরবে কাঁদছে।
হেমাঙ্গিনীর পাশে গিয়ে দাঁড়াল বিনয় সেন। হেসে বলল হেমাঙ্গিনী-এখন এই কটা মাত্র আছে বিনয় বাবু। বাকীগুলো চালান হয়ে গেছে।
হেমাঙ্গিনীর সঙ্গে বিনয় সেন কক্ষে প্রবেশ করতেই যে যুবতীগুলো বিছানায় শুয়েছিল তারা উঠে দাঁড়াল। সকলের মুখেই ফুটে উঠল একটা আতঙ্কের ছাপ। ভয়ে আড়ষ্ট হয় সবাই। বিনয় সেন হেমাঙ্গিনীর পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল! বিনয় সেন বেশ বুঝতে পারল যুবতীগণ তাদের আগমনে ভীত হয়ে পড়েছে-না জানি কার এবার বিপদ আসবে!
বিনয় সেনকে লক্ষ্য করে বলল হেমাঙ্গিনী….পছন্দ হয়?
বিনয় সেন ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়ল—উঁ হুঁ।
এ কথায় হেমাঙ্গিনী যেন খুশি হয়েছে বলে মনে হল, বলল সে–একটিও না?
বিনয় সেন কোন জবাব না দিয়ে প্রতিটি মেয়ের মুখে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগল। একটি মেয়ে তখনও ওদিকে মুখ ফিরিয়ে বসেছিল।
বিনয় সেন তার দিকে এগুলো।
হেমাঙ্গিনী অমনি বিনয় সেনের পথ রোধ করে দাঁড়াল। দেখা তো হল, কোটা চাই বলুন বিনয় বাবু? ‘
ঠিক সেই মুহূর্তে ফিরে তাকাল ঐ যুবতী, যে এতক্ষণ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসেছিল। যুবতী অন্য কেউ নয়, দস্যু বনহুরের প্রিয়তমা-মনিরা।
যুবতী মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই বিনয় সেন ওকে লক্ষ্য করল—চমকে উঠল সে-মুগ্ধ হল, এত সুন্দরী যুবতী রয়েছে এখানে।
হেমাঙ্গিনী বুঝতে পারল, বিনয় সেনের দৃষ্টি মনিরার ওপর পড়েছে। হেসে বলল—ওকে বুঝি পছন্দ হল?
বিনয় সেনের দাড়িভরা মুখে হাসি ফুটে উঠল, মাথা দুলিয়ে বলল—খুন। পছন্দ হয়েছে!
হেমাঙ্গিনী বিনয় সেনের কানে মুখ নিয়ে বললনাগরাণী!
তার মনে?
মানে ওকে কেউ বাগে আনতে পারে না। সুন্দরী বলে সবাই ওকে পছন্দ করে কিন্তু পরে জান বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়ে। একজনকে সে খুন করেছে, দু’জনকে করেছে আহত।
