হেমাংগিনী বিনয় সেনকে লক্ষ্য করেই আনন্দে আটখানা হল। বহু লোককে সে জীবনে দেখেছে, জেনেছে.–কত লোকই না আসে তার এখানে-কত রাজা মহারাজা, কত নবাব বাহাদুর, কত জমিদার, কত প্রজা, কিন্তু এমন সুন্দর চেহারার লোক তো সে কোনদিন দেখেনি। সবাই আসে হেঁইয়া গোঁফ, মাথায় পাগড়ী। কেমন উদ্ভট চেহারা। কেমন নেশায় ঢল ঢল, জড়িত কণ্ঠস্বর-আর এ যে একেবারে যুবরাজ।
হেমাংগিনী সকলের অজ্ঞাতে নিজের শরীরের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিল। আঁচলটা যুবতী মেয়েদের মত মাজায় খুঁজে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, বলল এবার-আপনার নামই বুঝি–
হাঁ, আমার নামই বিনয় সেন। আর আপনি বুঝি হেমাংগিনী দেবী?
কোন জবাব না দিয়ে আঁচলের ডগাটা দাঁতে কামড়ে যুবতীদের অনুকরণে মাথাটা দোলাল।
বিনয় সেন বলল—চলুন, যে কারণে এসেছি—
হেমাংগিনী বাঁকা চোখে একটু টিপ্পনী কেটে বলল-এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন। সব পাবেন, বসুন না একটু।
বিনয় সেন আসন গ্রহণ করল।
হেমাংগিনী এবার গোপীকে লক্ষ্য করে বলল–তুমি আবার অমন হা করে দাঁড়িয়ে আছ কেন, যাওনা বেরিয়ে। বখশিস যা দেবার পরে দেব, যাও।
হেমাংগিনী কথাগুলো মোলায়েম সুরেই বলে যেতে চেষ্টা করছিল কিন্তু হঠাৎ তার আসল কণ্ঠ বেরিয়ে আসে, সঙ্গে সঙ্গে চট করে গলার আওয়াজ মোলায়েম করে নিয়ে বলল—ওদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মেজাজ ঠিক থাকে না, আপনি কিছু মনে করবেন না তো?
না না, কিছু মনে করিনি।
গোপীনাথ ততক্ষণে কক্ষ ত্যাগ করেছিল।
বিনয় সেনের যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে একটা পর্বতের পাশে যেন বসে আছে সে। অস্বস্তি বোধ করলেও মুখোভাব স্বাভাবিক রেখে বলল বিনয় সেন—হেমাঙ্গিনী দেবী?
বলুন?
আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি।
সত্যি!
হাঁ সত্যি, আপনার মত মেয়ে আমি কোথাও দেখেছি কিনা সন্দেহ।
এ্যাঁ কি বললেন?
মানে আপনার মত সুন্দরী মেয়ে–
সত্যি!
সত্যি নয়তো কি মিছে বলব, তবে আপনার শরীরটা যদি একটু সরু হত তাহলে আপনাকে স্বর্গের অপ্সরী বললে ভুল হত! আহা, কি সুন্দর আপনার চোখ দুটো–
সত্যি!
হাঁ, আপনার ঠোঁট দু’খানা অতি সুন্দর। আপনার ভুরু যেন রামধনু। গোলাপের পাপড়ির মত আপনার চোখের পাতা–
বিনয় সেনের কথায় হেমাঙ্গিনী মোমের মত গলে যাবার উপক্রম হয়। সে পৃথিবীতে আছে না স্বর্গে গেছে ভাবতে পারে না। প্রেম গদগদ হেমাঙ্গিনী বিনয় সেনের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে।
বিনয় সেন ভেতরে ভেতরে বিপদ গুণলেও মুখে হাসি টেনে বলল–চলুন, মেয়েদের কোথায় রেখেছেন দেখাবেন চলুন। .
এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন বিনয় বাবু? আমার কাছে বসতে বুঝি মন চাইছে।?
ছিঃ ছিঃ ও কথা বলে লজ্জা দেবেন না হেমাঙ্গিনী দেবী। আপনাকে দেখা অবধি আমি–আমি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারছি না।
সত্যি বলছেন তো?
আমি মিথ্যা বলি না কোনদিন।
তবে এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন?
ব্যস্ত হইনি তবে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে কিনা, পরের চাকরি করি!
আচ্ছা বিনয় বাবু রাজবাড়িতে আপনাকে কত মাইনে দেয়। অবশ্য মনে যদি কিছু না করেন তবেই বলুন?
না না, এতে আবার মনে করার কি আছে? তা রাজবাড়িতে চাকরি করে মাসে পাঁচ শ টাকা পাই।
ছিঃ ছিঃ এই সামান্য মাইনেতে আপনি কাজ করেন সেখানে?
তাছাড়া আর যে আমার কোন উপায় নেই হেমাঙ্গিনী দেবী।
তবে যে গোপী আমাকে বলেছিল আপনি নাকি অনেক টাকার মালিক?
সে কথা অবশ্য মিথ্যা নয়, যদিও আমি চাকরি করি মাত্র সামান্য টাকায় কিন্তু আমার বাবার অনেক বিষয়-আসয় আছে কিনা। বছরে লাখ দেড় লাখের উপরে পাই।
হেমাঙ্গিনীর চোখ দুটো জ্বলে উঠল, হেসে বলল—তাহলে চাকরি করার কি দরকার?
ওটা আমার নেশা! বসে থেকে আমার সময় কাটতে চায় না।
তাই চাকরি করি।
আচ্ছা বিনয় বাবু?
বলুন হেমাঙ্গিনী দেবী?
একটা কথা বলব?
স্বচ্ছন্দে বলুন-একটা কেন, হাজারটা বলুন। আপনার কণ্ঠস্বর আমার কানে সুধা বর্ষণ করছে।
সত্যি তো?
একবারই বলেছি মিথ্যা বলা আমার অভ্যাস নয়।
আপনি বড় ভদ্র, আপনার মত লোক আমি কোনদিন দেখিনি।
দাঁতে দাঁত পিষে বলল বিনয় সেন-সেই কারণেই তো আপনি এমন ফেঁপে উঠেছেন….
কি বলেন বিনয় বাবু?
না না, ও কিছু নয়মানে আপনি বড় অমায়িক মেয়ে, বড় লক্ষ্মী মেয়ে।
হাঁ, আমি লক্ষ্মীই বটে, নইলে দেখছেন না কত বড় বাড়ি, গাড়ি হাজার হাজার কর্মচারী আমার কাজ করছে। শহরে মস্তবড় একটা হোটেল আছে, নাম শুনেছেন বুঝি জানবাগ হোটেলের?
হাঁ শুনেছি, কিন্তু এখনও সেখানে যেতে পারিনি, এটা আমার দুর্ভাগ্য!
ছিঃ ছিঃ, এজন্য দুঃখ করবেন না বিনয় বাবু। আপনাকে আমি সব দেখাব, সব দেখাব-আমার বাড়ির কোথায় কেমন পরিবেশ, সব দেখাব। ও, যে কথা বলতে চাচ্ছিলাম সেটা একেবারে ভুলেই গেছি। বলছিলাম কি জানেন?
বলুন?
মানে আপনি রাজবাড়িতে যখন মোটে পাঁচ শ’ পান, আমি যদি আপনাকে তার ডবল দেই মানে এক হাজার?
বিনয় সেন খুশিভরা কণ্ঠে বলে উঠল-এ অধমের প্রতি এত দয়া!
হেমাঙ্গিনী প্রেম গদগদ কণ্ঠে বলল অধম নন আপনি। আপনি অতি ভাগ্যবান। এক হাজার কেন, আমি আপনাকে আমার যথাসর্বস্ব দেবঅনেক দেবরাজপুত্রের মত করে রাখব।
বিনয় সেন বিপদ গুণল, হেমাঙ্গিনী তার প্রেম ভিখারিণী। এখন উপায়? যে কাজে সে এখানে এসেছে সব বুঝিপণ্ড হল!
বিনয় সেন উঠে দাঁড়াল—চলুন!
