বিনয় সেন বলল—কি হলো, খবর কি!
লোক দু’টির একজন বলল-হুজুর, হেমাঙ্গিনী রাজী হতে চায় না বলে তার ওখানে নতুন মানুষ নিয়ে যাওয়া চলবে না। যেমন খুশি মেয়ে সে আপনাকে দিতে রাজী আছে, যত খুশি পাবেন।
সুফিয়া শিউরে উঠল, নদীতীরের লোকগুলোর কথাবার্তা সব সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। দেব সমতুল্য বিনয় সেনও হেমাঙ্গিনীর শরণাপন্ন। এমন লোকও চরিত্রহীন…. ঘৃণায় সুফিয়ার মন বিষিয়ে উঠল-ছিঃ ছিঃ মানুষ চেনা কঠিন!
এবার কানে ভেসে আসে বিনয় সেনের কণ্ঠ-আমাকে অবিশ্বাসের কিছু নেই। যত টাকা চায় তাই দেব কিন্তু আমার মনমত নারী চাই। ‘ সুফিয়া আর দাঁড়াতে পারল না, মাথাটা তার ঝিম ঝিম করে উঠল, এমন লোকের বজরায় সে বাস করছে। না না, এখানে থাকা আর চলবে না, এমন লোকের বিশ্বাস কি!
এক সময় লোকগুলো চলে গেল।
বজরায় ফিরে এল বিনয় সেন।
পাশের ক্যাবিনে বসে সব টের পেল সুফিয়া। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগল গত পনেরটা দিনের কথা। কই একটি দিনও তো বিনয় সেন তার সঙ্গে কোন অসৎ আচরণ করেনি! একা নিঃসঙ্গ পেয়েও কোনদিন এতটুকু কুৎসিত ইংগিত করেনি। আপন বোনের মতই স্নেহ করেছে, ভালবেসেছে সে তোকে!
অনেক ভেবেও সুফিয়ার মন স্বচ্ছ হল না, নিজ কানে সে বিনয় সেনের উক্তিগুলো শুনেছে। ঘৃণায় সুফিয়ার মন তিক্ত হয়ে উঠল।
পরদিন যখন বিনয় সেন সুফিয়ার কামরায় এল তার সঙ্গে দেখা করতে তখন সুফিয়া কিছুতেই বিনয় সেনের সঙ্গে কথা বলতে পারল না। কিছুতেই সে চোখ দুটো তুলে ধরতে পারল না বিনয় সেনের মুখে।
সুফিয়ার আচরণে বিস্মিত হল বিনয় সেন, ভেবে পেল না কি হয়েছে তার।
বিনয় সেন প্রশ্ন করলো—সুফিয়া, তোমার কি কিছু হয়েছে?
সুফিয়া নীরব রইলো, কোন জবাব দিল না।
বিনয় সেন আরও সরে এল সুফিয়ার পাশে, মাথায় হাত বুলিয়ে সন্দেহে বলল-আজ নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে তোমার। ছিঃ, অমন নিশ্চুপ রইলে কেন, বল কি হয়েছে?
সুফিয়া আরও জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল—কি বলবে সে! যা সে নিজ কানে শুনেছে, জেনেছে তা বলার নয়। তবু বলল সুফিয়া—কিছু হয়নি।
বিনয় সেন বলল-মিথ্যে কথা। আমায় লুকোচ্ছ তুমি। ছিঃ আমার কাছে লুকোতে নেই বোন, বল কি হয়েছে তোমার?
আমি এখানে আর থাকতে চাই না। কেন, কেন বল? ব্যস্তকণ্ঠে বলল বিনয় সেন!
সুফিয়া এবার মুখ তুলে তাকাল বিনয় সেনের দিকে। চট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলো না সুফিয়া, নীল উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ–কই, সে চোখ দুটিতে নেই কোন লালসাপূর্ণ চাহনি। পবিত্র নির্মল একটি বলিষ্ঠ মুখ–হেসে বলল বিনয় সেন-কি দেখছ সুফিয়া?
সুফিয়া অস্ফুট কন্ঠে বলে উঠল—ভাইজান, আমাকে মাফ করুন ভাইজান। দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল।
বিনয় যেন বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলল–কি হল বোন। নিশ্চয়ই তোমার এমন কিছু ঘটেছে যা তোমার মনে অসহ্য বেদনা দিচ্ছে। বল কি হয়েছে?
সুফিয়া দু’হাতের তালুতে মুখ ঢেকে বলে উঠল-আমাকে মাফ করে দিন ভাইজান, আমি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম।
সেকি সুফিয়া!
হ্যাঁ ভাইজান, আমি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম। আপনার ফেরেস্তার মত চরিত্র–না না, তা হতে পারে না। ভাইজান, আপনি মানুষ নন, ফেরেস্তা।
সুফিয়া, তোমার কথাগুলো আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। হঠাৎ তোমার মধ্যে এমন একটা কিছু ঘটেছে যার জন্য তুমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছ, আমাকে খুলে বল সুফিয়া?
না না, সে কথা বলতে পারব না ভাইজান। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাবে, আমি কিছুতেই বলতে পারব না।
কিন্তু বনহুর নিজের কামরায় গিয়ে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না, কি ঘটেছে, যার জন্য সুফিয়া তার সংগে প্রথমে কথাই বলল না। পরে কাঁদল, কি সব আবোল তাবোল বলল, ক্ষমা চাইল, লজ্জার কথা, বলা চলবে না। এসব হেঁয়ালি ভরা কথা—কিছুই বুঝতে পারে না বিনয় সেন।
এরপর থেকে বিনয় সেন সুফিয়ার কক্ষে যাওয়া বন্ধ করে দিল, দূরে থেকে সুফিয়ার সুবিধার দিকে লক্ষ্য করতে লাগল।
সুফিয়া ক’দিনের মধ্যেই বুঝতে পারল, সেদিনের ঘটনার পর বিনয় সেন তাকে যথেষ্ট এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে। যদিও এতে সুফিয়ার কোন অসুবিধা হচ্ছিল না তবু মনে শান্তি ছিল না তার। কারণ, আজ সে কোথায় থাকত, কেমন থাকত কে জানে। তার অপবিত্র দেহটা যে এতদিনে শিয়াল ককুরে খেত না, তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে! ছিঃ ছিঃ কেন সেদিন সুফিয়া তার সঙ্গে অমন আচরণ করেছিল, যার জন্য অমন ফেরেস্তার মত লোকের মনে একটা গভীর সন্দেহের রেখাপাত হয়েছে। সুফিয়া নিজেকে বড়ই লজ্জিত মনে করে।
১৫.
হেমাংগিনী দেবী তার বিশাল বপু নিয়ে কেবলমাত্র শয্যা গ্রহণ করতে যাচ্ছিল, এমন সময় গোপীনাথ তার কক্ষে প্রবেশ করে আদাব জানাল।
গোপীনাথকে লক্ষ্য করে বলল হেমাংগিনী—এসেছে নাকি লোকটা?
হাঁ দিদি—এসেছেন তিনি।
দেখ বুঝেসুঝে কাজ কর, আমার কারবার যেন নষ্ট হয়ে না যায়, তাহলে তোমার কাঁধে মাথা থাকবে না।
সে তো আমি জানি দিদি, আমি কি আর বুদ্ধিহীন। সব দিক ভেবেচিন্তে তবেই কাজ করি।
যাও, বকবক কর না, নিয়ে এস।
আচ্ছা দিদি, এক্ষুণি আনছি।
এই শোন, টাকা-পয়সা কিন্তু একসিকি কম নেব না।
আরে ছোঃ পয়সা কম দেবেন বিনয় সেন, উনি তাহলে রাজকর্মচারী হলেন কেন! বেরিয়ে গেল গোপীনাথ।
একটু পরেই কক্ষে প্রবেশ করলো গোপীনাথ–সংগে বিনয় সেন।
