পরক্ষণেই নরম পুরুষকণ্ঠ-দেখুন হেমাঙ্গিনী দিদি এই সামান্য ক’টা পিম সবুর করুন, কুমার বাহাদুর অনেক করে বলে দিয়েছেন….
রেখে দাও তোমার কুমার বাহাদুর, বেটা পুরুষ নয়–পুরুষের বাচ্চাও নয়। সামান্য পায়ের হাড়ে গুলি লেগেছে তাই মরণ শয্যা নিয়েছে। অমন দশটা গুলি আমার চামড়া কাটতে পারবে না।
দেখুন রাজার ছেলে, তাছাড়া তাদেরই রাজ্যে যখন আমরা বাস করি…..
বাস করি বলেই কি তারা আমাদের নাকে দড়ি লাগিয়ে নাচাবে, সে বান্দা হেমাঙ্গিনী নয়, মনে রেখ কেশব চাঁদ।
বনহুর বুঝতে পারল, এ হোটেলের ম্যানেজারের নাম কেশব চাঁদ।
ওদিকে রহমান পেছন ফিরে হতবাক, এত সতর্ক দৃষ্টির মধ্যেও সর্দার ভেগেছেন। গেলেন কোথায়, রহমান চারদিকে দেখতে লাগল!
এদিক ওদিক লক্ষ্য করতেই কখন যে আবার বনহুর নির্দিষ্ট আসনে এসে বসে নাচ দেখছে লক্ষ্যই করেনি রহমান। এবার অবাক হল, অস্ফুট কণ্ঠে বলল—সর্দার, কোথায় গিয়েছিলেন আপনি?
একটা নতুন কিছু আবিষ্কারে! চুপ, নাচ দেখ।
বনহুর এবার উঠে গিয়ে জুয়ার টেবিলে বসল।
চমকে উঠল রহমান, কিন্তু সে ভয় পেল না। কারণ সে জানে, তাদের সর্দার সবচেয়ে বড় জুয়াড়ী। রহমান গিয়ে দাঁড়াল তার পেছনে, দূর থেকে সতর্ক দৃষ্টি রাখল কেউ যেন তার সর্দারকে পেছন থেকে আক্রমণ করতে না পারে।
খেলা চলছে।
রাত বেড়ে আসছে।
একি! সর্দার বার বার হেরে যাচ্ছে। এক হাজার, দু’হাজার তিন হাজার—দশ হাজার।
রহমানের চোখে ধাঁধা লাগছে। এতবার হেরেও তার সর্দার হাসিমুখে খেলে যাচ্ছে-ব্যাপার কি? সর্দার তো কোন দিন পরাজিত হয় না, হলেও তা সে কোন সময় স্বীকার করেন না। জিততেই হবে তার। তারপর টাকা হাতে পেয়ে ছড়িয়ে ফেলে দেবে তাদেরই মধ্যে তবুও পরাজয়ের কালিমা মুখে মাখবে না। রহমান বুঝতে পারে, ইচ্ছা করেই সর্দার আজ পরাজয়ের কালিমা বরণ করে নিচ্ছে।
বনহুরের নিকটে হাজার হাজার টাকা জিতে নিয়ে দুষ্ট লোকগুলো খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল, সবাই বনহুরকে পিঠ চাপড়ে দিল।
নিজের ক্যাবিনে ফিরে আসতেই রহমান বলল–সর্দার, আজ আপনি এমনভাবে নিজেকে–কথা শেষ না করে মাথা চুলকাতে লাগল সে।
বনহুর বুঝতে পারল কি বলতে চায় রহমান। বনহুর এবার শয্যায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল উপস্থিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য টাকাগুলো ওদের হাতে তুলে দিলাম।
সর্দার!
জানি মৃত্যু সহজ নয়, তবু–যাক রহমান, সেজন্য তুমি ভেব না। ওনি আজ আমি একটা মস্তবড় সমাধান খুঁজে পেয়েছি। নাও শুয়ে পড় নিশ্চিন্তে। আর কেউ আমাদের আক্রমণ করবে না।
কিন্তু সর্দার, আমার যে চোখে ঘুম আসবে না।
কেন?
এখনও বাথরুমে লাশটা….
ভয় নেই, ও আর জাগবে না। নাও ঘুমাও।
গায়ে চাদর টেনে দিয়ে শুয়ে পড়ল বনহুর।
রহমানও শুয়ে পড়ল।
১৪.
এখানে তোমার কোন কষ্ট হচ্ছে না তো সুফিয়া? বলল বিনয় সেন।
সুফিয়া আজ ক’দিন হল এই বজরায় আশ্রয় পেয়েছে, তারপর থেকে সুফিয়া কোন সময়ের জন্য এতটুকু কষ্ট বা দুঃখ পায়নি। এত সুখ বুঝি তার নিজের বাড়িতেও পায়নি। বিনয় সেনের কথায় বলল সুফিয়াভাইজান, আপনার দয়ায় আমি যে কত সুখে আছি তা মুখে বলার ভাষা আমার নেই। অনেক ভাল আছি আমি।
বিনয় সেন এবার বলল-জানি, তোমার মনে একটা কষ্ট অহরহ যন্ত্রণা দিচ্ছে। সে হচ্ছে তোমার পিতামাতার নিকটে যাবার ইচ্ছা। বিনয় সেন হেসে বলল দুঃখ করনা বোন, জানত দুঃখের পর সুখ…..
সে আমি জানি, আপনার মত ভাইজান পেয়েই আমি বুঝতে পেরেছি, দুঃখ শেষ হয়ে এসেছে।
সুফিয়া, এবার শুয়ে পড়; রাত অনেক হল।
ভাইজান, আজ একটি কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, জবাব দেবেন তো?
আজ নয় বোন, অন্য দিন তুমি যা জিজ্ঞাসা করবে তার জবাব পাবে। আজ চলি, ঘুমাও বোন।
আচ্ছা যান আপনি। সুফিয়া বিনয় সেনকে বিদায় দিল।
বিনয় সেন সুফিয়ার কক্ষ থেকে নিজের কক্ষে চলে গেলেও সুফিয়া ঘুমাতে পারল না। আজ প্রায় দু’সপ্তাহ হয়ে এল এই বজরায় আশ্রয় নিয়েছে সে। কিন্তু বজরায় তার কক্ষেই এসে বিনয় সেন সাক্ষাৎ করে যায়। একটি চাকর আছে-সেই খাবার দিয়ে যায়, অন্যান্য যা প্রয়োজন সব সেই চাকরটাই এনে দেয়। এমন কি এখানে তার শাড়ি, জামা-কাপড়, প্রসাধন সামগ্রী সব সে পেয়েছে। কোন অভাবই সে অনুভব করেনি বজরায় বাস করে।
কিন্তু আশ্চর্য, বিনয় সেনকে আজও ভাল করে জানতে পারল না সে। অসৎ ব্যক্তির সঙ্গে ওঠাবসা করেও মানুষ এত সৎ, এত মহৎ হতে পারে।
নানা চিন্তায় সুফিয়া মগ্ন হয়ে পড়ে। ঘুম তার চোখে আসছে না।
রাত অনেক হয়েছে।
হঠাৎ একটা শিস দেবার শব্দ সুফিয়ার কানে এসে পৌঁছল, চমকে উঠল সুফিয়া-একবার, দু’বার তিনবার ঐ রকম শব্দ। তারপর তার ভাইজান বিনয় সেনের কক্ষের দরজা খোলার শব্দ শুনা গেল।
সুফিয়া আজ স্থির থাকতে পারল না, সে চুপি চুপি নিজের বজরার দঙা সামান্য ফাঁক করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
বিনয় সেন তখন বজরার সিঁড়ি বেয়ে নদীতীরে নেমে যাচ্ছে।
সুফিয়া চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখল বিনয় সেনকে।
নদীতীরে দুটি লোক তখনও দাঁড়িয়ে আছে, এটাও লক্ষ্য করল সুফিয়া।
বিনয় সেন নদীতীরে পৌঁছতেই লোক দুটি অভ্যর্থনা জানাল। বজরা থেকে নদীতীর মাত্র কয়েক হাত ব্যবধান। কথাবার্তা সব শোনা যাচ্ছে।
